রাখি পরিয়ে শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বোঝাচ্ছেন বিডিও। ছবি: সোমনাথ মুস্তাফি।
সবে ভোরের আলো ফুটছে। ছামনা বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া কাঁদরের ধারে বসার উপক্রম করতেই কে যেন এসে খপাৎ করে তাঁর হাত ধরলেন। ঘাড় ঘোরাতেই চক্ষু চড়কগাছ ওই ব্যক্তির। হাত ধরে রয়েছেন টি-শার্ট জিনস্ পরা চশমা চোখে সৌম্যদর্শন এক যুবক।
অদূরেই একটি গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আরও কয়েক জন। এ নির্ঘাত সাদা পোশাকের পুলিশ না হয়ে যায় না। কিন্তু, তাঁকেই ধরা কেন। তিনি তো কোনও দুষ্কর্ম করেননি! তাই ভেবে কিছুতেই কুলকিনারা পাচ্ছিলেন না বছর চল্লিশের দিনমজুর কালোমানিক বাগদি। তত ক্ষণে সকালের প্রাতঃকর্ম তাঁর মাথায় উঠেছে। শেষ পর্যন্ত চশমা চোখের ভদ্রলোকই তাঁকে আশ্বস্ত করলেন। পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি বিডিও।’’ তবু ভয় যায় না কালোমানিকের। হাত কচলে বলেন, ‘‘কিন্তু, হুজুর আমি তো কোনও অপরাধ করিনি। তবু এই ভোর বেলায় আমাকে ধরা কেন!’’ বিডিও বলেন, ‘‘আমাদের কাছে খবর আছে বাড়িতে শৌচাগার থাকা সত্ত্বেও আপনি মাঠে শৌচকর্ম করেন। এটাও এক ধরনের অপরাধ।’’ কালোমানিকের সাফাই, ‘‘কী করব হুজুর, দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। বাড়ির সকলে শৌচাগার ব্যবহার করলেও আমি মাঠেই যাই।’’ বিডিও তাঁকে বোঝান, ‘‘যে কুঅভ্যাস সমাজের ক্ষতি করে, তা কিছুতেই বরাদাস্ত করা যায় না। চলুন আপনার বাড়িতে। ব্যবস্থা হবে।’’
অগ্যতা কার্যত কাঁপতে কাঁপতে বিডিও-কে নিয়ে নিজের বাড়িতে হাজির হন কালোমানিক। সেখানে তখন তাঁর স্ত্রী যোগমায়াদেবী শৌচাগার থেকে বালতি হাতে বেরোচ্ছেন। সাত সকালে সপার্ষদ ধোপদুরস্ত এক ভদ্রলোকের সঙ্গে স্বামীকে দেখে হকচকিয়ে যান তিনিও। কিন্তু বিডিও কালোমানিক এবং তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের রাখিয়ে পরিয়ে দেন। বিদায় নেওয়ার আগে বিডিও যোগমায়াদেবীকে বলেন, ‘‘বহু ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রচেষ্টায় স্বামীর বহু বদগুণ দূর হয়েছে। আপনাকেও স্বামীর মাঠে যাওয়ার কুঅভ্যাস দূর করার দায়িত্ব দিয়ে গেলাম।’’ ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ে কালোমানিকের। তিনি বলেন, ‘‘আর মাঠমুখো হচ্ছি না।’’ ‘‘হতে দিলেই তো!’’— পাশ থেকে গলা তুলে বলে ওঠেন যোগমায়াদেবী।
এর পরেই বিডিও একে একে পৌঁছন কলেশ্বর, কনুটিয়া, তেঁতুলডিহি প্রভৃতি গ্রামে। তেঁতুলডিহি গ্রামেও প্রশান্ত মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি একই অবস্থায় পাকড়াও করেন। তাঁকে রাখি পরানোর পরে বিডিও জানতে পারেন প্রয়োজনীয় জায়গার অভাবে তাঁর বাড়িতে এখনও শৌচাগার তৈরি হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে বিডিও-র গাড়ি ছোটে লাগোয়া ছামনা গ্রামে সংশ্লিষ্ট কলেশ্বর পঞ্চায়েতের প্রধান ছবি বাগদির বাড়ি। তাঁকে ঘুম থেকে তুলে রাখি পরানোর পরেই জায়গার অভাবে যাঁদের শৌচাগার হয়নি, তাঁদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
ঘটনা হল, চলতি বছর ‘নির্মল পঞ্চায়েত’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে কলেশ্বর। কিন্তু বিডিও-র কাছে খবর ছিল, অধিকাংশ বাড়িতে শৌচাগার তৈরি হওয়া সত্ত্বেও অনেকে আজও মাঠেই প্রাতঃকৃত্য সারেন। বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেখে বাসিন্দাদের শৌচাগারমুখী করতে রাখিবন্ধনের দিনটিকেই বেছে নেন ময়ূরেশ্বর ২ বিডিও সৈয়দ মাসুদুর রহমান। সেই মতো শনিবার রাত থেকেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় ব্লক অফিসে। বিডিও একে একে ডেকে তোলেন নাইট গার্ড পার্থ ভাণ্ডারী, চতুর্থ শ্রেণির কর্মী শিশির মণ্ডল এবং চালক জয় দাসকে। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে তাঁরাও অভিযানের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে যান। কবর থেকে লাশ উদ্ধার, অবরোধ, বিক্ষোভ-সহ নানা অভিযানে বিডিও-র সঙ্গী হয়েছেন তাঁরা। কিন্তু, প্রাতঃকৃত্য শিকারির ভূমিকায় এই প্রথম।
অভিযান শেষে তাঁরাও জানিয়েছেন, বিডিও-র হাতে রাখি পরার পরে মাঠে প্রাতঃকৃত্য করার আগে অন্তত দু’বার ভাবতে হবে অনেককে। একই বক্তব্য পঞ্চায়েত প্রধান ছবি বাগদিরও। তিনি জানান, পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে বহু চেষ্টা করে অনেকের মাঠে প্রাতঃকৃত্য করার কুঅভ্যাস দূর করা যায়নি। বিডিও-র রাখি অভিযানের পরে গ্রামের অনেকেই বলাবলি করছেন, এ বার মাঠে যাওয়ার অভ্যাসটা দেখছি ছাড়তেই হবে। অন্য দিকে, বিডিও বলছেন, ‘‘সভা, সমিতি, বিজ্ঞাপনের থেকেও অনেক ক্ষেত্রেই ভাল ফল দেয় সরাসরি জনসংযোগ। কাছে গিয়ে বোঝাতে পারলে অনেক কাজ সহজ হয়ে যায়। সেই জন্য রাখিবন্ধনের মাধ্যমে সেই জনসংযোগ গড়ে তোলার প্রয়াসেই এই উদ্যোগ। পরবর্তী কালে আরও নানা বিষয়কে সামনে রেখে ব্লক জুড়ে ওই অভিযান চালানো হবে।’’