হাতে হাতে। পুরুলিয়া মফস্সল থানার মুটরুডিতে সুজিত মাহাতোর তোলা ছবি।
খরার ছোবল যে কত মারাত্মক পুরুলিয়ার মানুষের মতো ভাল কেউ জানে না। কিন্তু শীতেও খরা— শেষ কবে এমন পরিস্থিতি হয়েছিল স্মরণ করতে পারেন না এই জেলার প্রবীণরাও। এ বার সেটাই হয়েছে। অগস্টের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে এই জেলা ভারী বৃষ্টির স্বাদ পায়নি। ছিঁটেফোটা বৃষ্টি হয়েছে। মার খেয়েছে আমন চাষ।
এখন শীতেই পুকুর, খালবিল শুকিয়ে গিয়েছে। চাষ তো দূর, নিত্য ব্যবহারের জলও কয়েকমাস পরে কোথা থেকে মিলবে তা নিয়েই সংশয় পুরুলিয়ার গাঁয়ে-গঞ্জে। এ বার তাই এ বার ঠেকে শিখে কংসাবতীর বয়ে যাওয়া জল বাঁধতে নেমে পড়েছেন পুরুলিয়া মফস্সল থানার মুটরুডি, নাড়ুরডি, মহুলবনা প্রভৃতি গ্রামের বাসিন্দারা।
আগস্টের গোড়ার পর থেকে বৃষ্টি হয়নি এই জেলায়। জ্বলে খাক হয়ে যায় আমনের খেত। শেষে নভেম্বরের মাঝামাঝি জেলার ২০টি ব্লকের ২৬৭১টি মৌজাকেই খরা বলে ঘোষণা করে রাজ্য সরকার। কৃষি দফতর জানায়, পুরুলিয়ায় ১,৮২,৮৭৮ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে।
বাঁকুড়া জেলার একটা বড় অংশেও সেচের সুব্যবস্থা নেই। যে এলাকা কংসাবতী জলাধারের উপর নির্ভরশীল, সেখানেও সেচখালে সে ভাবে জল মেলেনি। ফলে ধানের ক্ষতি বাঁকুড়াতেও হয়েছে। তার উপরে এখন থেকেই বাঁকুড়া শহরে পানীয় জল সরবরাহেও টান পড়েছে। তা নিয়েও ক্ষোভ ছড়িয়েছে পুরবাসীর মধ্যে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টি যে খুব কম হয় তা নয়। কিন্তু প্রচুর বৃষ্টি হলেও সেই জল ধরে রাখা যায় না। কারণ পুরুলিয়ার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩৪ মিটার। ফলে গোটা জেলা জুড়ে থাকা ছোটবড় অসংখ্য জোড় ও নদীর জল গড়িয়ে যায় নীচের দিকে। এ বারও তেমনটাই হয়েছে।
কিন্তু নদী বা জোড়ের জল চেক ড্যাম তৈরি করে বাঁধার কাজে অনেকখানি পিছিয়ে রয়েছে পুরুলিয়া। ফলে বর্ষার জল সঞ্চয় করে শুখা সময়ে তা চাষের কাজে তা ব্যবহার করার সুবিধা পান না বাসিন্দারা। একই ছবি বাঁকুড়ার। এর প্রেক্ষিতেই দুই জেলায় ‘জল ধরো জল ভরো’ কর্মসূচি কতটা সফল হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন বিরোধীরা।
তবে প্রশাসন যা পারেনি, সেটাই করার চেষ্টা চালাচ্ছেন পুরুলিয়ার কিছু মানুষ। গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু জলধারা বাঁধার চেষ্টায় নেমে পড়েছেন তাঁরা। তাঁদের কথায়, ষেটুকু জল বয়ে যাচ্ছে, ধরে রাখতে পারলে সেটাই আমাদের অনেক কাজে দেবে।
পুরুলিয়া শহরের চৌহদ্দি ছাড়ালেই কংসাবতী নদীর অদূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মুটরুডি, নাড়ুরডি, ফুলডি, মহুলবনা, উচালি-সহ বিভিন্ন গ্রাম রয়েছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শীতের গোড়াতেই এখন তীব্র জলাভাব দেখা দিতে শুরু করেছে এলাকায়।
যেমন মুটরুডিতে নতুনবাঁধ, কুলুরবাঁধ বা শঙ্করবাঁধের জল অত্যন্ত কমে গিয়েছে। মহুলবনার বড়বাঁধ বা ফুলডির পূর্ণাপানিবাঁধ কিংবা নাড়ুরডির বাবুরবাঁধের ছবিটাও এক। ফলে স্নান, কাপড় কাচা কিংবা গবাদি পশুর ব্যবহারের জন্য নদীর জলই এখন তাঁদের ভরসা। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, অকালে জলের এমন আকাল অনেকদিন তাঁরা দেখেননি। গ্রীষ্মে কী হবে, এখন থেকেই তাঁদের চোখে-মুখে সেই আতঙ্ক।
মুটরুডি গ্রামের বাসিন্দা রসরাজ মাহাতো, সুনির্মল মাহাতোদের কথায়, ‘‘এখনই যা অবস্থা, গরমে যে কী হবে ভাবতেই আতঙ্কে হাত-পা যেন সেঁধিয়ে যাচ্ছে। তাই আমরাই বিভিন্ন গ্রামের লোকজনই চাঁদা তুলে নদীর জল বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করেছি।’’ মুটরুডি এলাকার বাসিন্দা তথা এলাকার তৃণমূল নেতা সহদেব মাহাতো জানান, গ্রামগুলির জলের অবস্থা কেমন সকলেই জানেন। তাঁর দাবি, গ্রাম পঞ্চায়েতের কাছেও বলা হয়েছিল জল ধরে রাখার কিছু ব্যবস্থা করতে। কিন্তু কিছুই হয়নি।
এই গ্রামেরই বাসিন্দা প্রফুল্ল মাহাতো আইএনটিটিইউসির জেলা সভাপতি। ক’দিন আগে ওই গ্রামের কাছে নদী তীরে গিয়ে দেখা যায় বাঁধ দেওয়ার কাজে তিনিও গ্রামবাসীর সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘নদী তীরের এই গ্রামগুলিতে ইতিমধ্যেই জলাভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। বিভিন্ন গ্রামের মানুষজনই আমাকে বললেন চাঁদা তুলে বালি দিয়ে বাঁধ তুলে নদীর একপাশ দিয়ে যেটুকু জল বইছে সেটুকুই অন্তত ধরে রাখতে হবে। না হলে ব্যবহার করারও জল পরে মিলবে না।’’
ঘরকন্নার কাজ ছেড়ে পুরুষদের সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন বাড়ির মেয়ে-বৌয়েরাও। যেমন বাসন্তী মাহাতো, রেবতী মাহাতোদের মতো বধূরা বলছেন, ‘‘সবাই কাজ করছেন। আমরাও আমাদের সাধ্যমতো কাজ করেছি।’’ নিজেরা হাত লাগিয়ে কাজ করার পাশাপাশি একটি বালি তোলার মেশিনও ভাড়া করে নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা। তাতে কাজে গতি এসেছে।
স্থানীয় পিঁড়রা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান তৃণমূলের মৃত্তিকা মাহাতো বলেন, ‘‘পঞ্চায়েত নির্দিষ্ট ধরা বাঁধা প্রকল্পেই কাজ করতে পারে। হঠাৎ করে যে কোনও কাজে পঞ্চায়েত নামতে পারে না।’’ তাঁর দাবি, এ ভাবে পৃথক দু’-চারটি গ্রামের জন্য প্রকল্প নেওয়া যায় না। করতে হলে সমগ্র পঞ্চায়েত এলাকার জন্যই করতে হয়। আর সে ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও অনুমোদনের প্রয়োজন থাকে।
তবে এই অবস্থা সামনে এনে দিয়েছে পুরুলিয়ার বাকি গ্রামগুলোর জল নিয়ে দুরাবস্থার চিত্র। পুরুলিয়ার বিধায়ক কে পি সিংহ দেও পুরুলিয়া শহরেরও পুরপ্রধান। তিনি বলেন, ‘‘খরার জন্য জল নিয়ে অবস্থা খারাপ হতে শুরু করেছে বলে বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে শুরু করেছে। মানুষজন নিজেদের উদ্যোগেই জলের সংস্থানের ব্যবস্থা করছেন।’’ তিনি জানান, মুটরুডি, নাড়ুরডি, মহুলবনা প্রভৃতি এলাকায় নদী জল উত্তলন প্রকল্প করার ব্যাপারে তিনি সংশ্লিষ্ট দফতরে বলবেন।
কিন্তু প্রশাসন কী করছে? জেলাশাসক তন্ময় চক্রবর্তী স্বীকার করেছেন, ‘‘সেচের একটা বড় সমস্যা রয়েছে। তবে সরকার বিশেষ উদ্যোগী হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বান্দোয়ানের সভা থেকে ২৫৫টি চেকড্যামের কাজের সূচনা করেছেন।’’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৫৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই জলাধারগুলি গড়ে তোলা হবে। জেলাশাসক আরও জানিয়েছেন, ‘জলতীর্থ’ প্রকল্প থেকেই সিংহভাগ জলাধার গড়ে তোলা হবে। জানা গিয়েছে, আগামী বর্ষার আগেই যাতে এই জলাধারগুলি গড়ে তোলা যায় সে জন্য জলসম্পদ উন্নয়ন দফতর, বন দফতর, পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ, পূর্ত দফতর ও সেচ-জলপথ দফতর এই জলাধারগুলি গড়ার কাজে হাত দিয়েছে।
জলতীর্থ প্রকল্প থেকে ২২৮টি, কেন্দ্রীয় প্রকল্প আদমি থেকে ১২টি ও গত আর্থিক (২০১৪-১৫) বছরের ১৫টি (মোট ২৫৫টি) জলাধারের কাজ শুরু হচ্ছে। বান্দোয়ানের সভামঞ্চ থেকে ১৪টি জলাধারের (এই জলাধারগুলি গত আর্থিক বছরে তৈরি হওয়া) উদ্বোধনও করে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।