সারদার বন্ধ হয়ে যাওয়া সিমেন্ট কারখানার সামনে লুঠপাটের ছবি তুলছেন ইডি-র তদন্তকারী অফিসার। বুধবারের নিজস্ব চিত্র।
তদন্ত যেমন চলছে চলুক। কিন্তু, কারখানা খোলার বন্দোবস্ত হোক। এমনই দাবি করছেন বেলিয়াতোড় থানার ধবনী গ্রামে থাকা ‘ল্যান্ডমার্ক সিমেন্ট’ কারখানার কাজ হারানো কর্মী-শ্রমিক। দিনমজুরি ছেড়ে তাঁরা কাজ নিয়েছিলেন ওই কারখানায়। এখন সংসার চালানোই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁদের পক্ষে। ওই কর্মী-শ্রমিকদের ক্ষোভ, সারদা-কেলেঙ্কারির সঙ্গে তাঁদের কোনও যোগ নেই। কিন্তু, কারখানা বন্ধ হয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁরাই।
বেলিয়াতোড় যে ব্লকের অন্তর্গত, সেই বড়জোড়ার শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিতি রয়েছে যথেষ্টই। পড়শি ব্লক গঙ্গাজলঘাটি, মেজিয়াতেও ছিটেফোঁটা শিল্প রয়েছে। কিন্তু, বেলিয়াতোড় এলাকা একেবারেই গড়ের মাঠ। নামমাত্র শিল্পও নেই এখানে। এই পরিস্থিতিতে ধবনী গ্রামে রাজ্যের বস্ত্রমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের গড়া ওই সিমেন্ট কারখানার উপরেই নির্ভর করে দিনমজুরি ছেড়ে মাসিক বেতনভুক্ত কর্মী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন প্রায় ৫০ জন দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক। সারদাকে সেই কারখানা শ্যামবাবু বিক্রি করে দেওয়ার পরেও কারখানার কাজে ভাটা পড়েনি।
কিন্তু, ২০১২ সালের শেষ লগ্নে বন্ধ হয়ে গেল সিমেন্ট কারখানা। সেই থেকে কারখানার ঝাঁপ আজও খোলেনি। সম্প্রতি সারদা-কাণ্ডে ইডি এবং সিবিআইয়ের তদন্তে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রের উঠে এসেছে এই কারখানা। বুধবার সেই কারখানার হাল সরেজমিন দেখেও গিয়েছেন ইডি-র তদন্তকারী দল। কিন্তু, সব আলোচনার আড়ালেই থেকে গিয়েছে এই কারখানার শ্রমিকদের দুরবস্থার চিত্র।
ইডি-র অফিসারেরা কারখানা পরিদর্শনে এসেছেন, বুধবার সকালে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ধবনী গ্রামের হরিমেলায় জটলা পাকিয়ে ছিলেন কারখানার শ্রমিকদের একাংশ। তাঁদের মধ্যে অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক চট্টোপাধ্যায়, চণ্ডী বাউরি, রঞ্জিত বাউরিদের একটাই দাবি, রাজ্য সরকারই দায়িত্ব নিয়ে ফের চালু করুক এই কারখানা। তাঁরা জানান, সিমেন্ট কারখানাটি গড়ার আগে গ্রামের লোকজনেরা বিভিন্ন জায়গায় দিনমজুরি খাটতে যেতেন। অনেককেই জেলার বাইরে কৃষি জমিতে কাজ করতে ছুটতে হত। মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থাকতে হত দু’পয়সা রোজগারের জন্য। ২০০৭ সাল থেকে ধবনী গ্রাম থেকে কয়েকশো মিটার দূরে চালু হয় এই কারখানা। গ্রামবাসীরা এতে রোজগারের একটি নতুন দিশা খুঁজে পেয়েছিলেন। দিন-রাত তখন উৎপাদনের কাজ চলত কারখানায়। মাঝে ২০০৯ সালে কারখানার মালিক হন সুদীপ্ত সেন। বার তিনেক এই কারখানায় এসেছেন তিনি। কর্মীদের মনোবল বাড়াতে তাঁদের উৎসাহিতও করতেন সুদীপ্ত।
শ্রমিকেরা জানাচ্ছেন, সারদার হাতে কারখানার দায়িত্ব আসার পরে একবার প্রায় ছ’মাস বেতন পাননি তাঁরা। সেই সময় কারখানার উৎপাদনও কম হচ্ছিল। এতে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছিল কারখানায়। আশিসবাবু, মানিকবাবুদের কথায়, “ওই সময় এক দিন অনেক রাতে সুদীপ্ত সেন কারখানায় ঢোকেন। তখন আমরা কাজ করছিলাম। তিনি আমাদের তিনি মন দিয়ে কাজ করতে বলেছিলেন। আর আশ্বাস দিয়েছিলেন, তিনি থাকতে এই কারখানার কর্মীদের কোনও ক্ষতি হবে না।” এর কিছু দিনের মধ্যেই কর্মীদের বকেয়া টাকা মেটানো হয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকে কয়েক বছর কারখানা পুরোদমে চলেছিল। শ্রমিক অসন্তোষও ছিল না। তবে ফের শ্রমিকদের বেতন বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে ২০১২ সালের শেষ দিকে। প্রায় চার মাস টাকা পাননি শ্রমিকেরা। শেষে ওই বছরই ডিসেম্বর মাস থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় কারখানার উৎপাদন। ২০১৩ সালে পাততাড়ি গোটায় সারদা। কাজ হারানো শ্রমিকদের মাথায় হাত পড়ে।
ধবনীর বাসিন্দা অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় ওই কারখানার জন্মলগ্ন থেকেই সুপারভাইজার পদে কাজ করতেন। হরিমেলায় বসে তিনি বলছিলেন, “এখন আর স্থায়ী রোজগার বলে কিছু নেই। মাঝে মাঝে লোকের ফাইফরমাস খেটে কোনও রকমে সংসার ঠেলে নিয়ে যাচ্ছি।” শ্রমিক চণ্ডী বাউরি, রঞ্জিত বাউরিরা বলেন, “দিনমজুরির কাজ ছেড়ে দিয়ে কারখানায় যোগ দিয়েছিলাম। জীবনটাও পাল্টাতে শুরু করেছিল। কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়ে ফের যে অন্ধকার নেমে আসবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি। আশিসবাবু, মানিকবাবুদের কথায়, “কারখানায় শুধু ধবনী গ্রামের লোকেরাই নয়, আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেকে কাজ করতে আসতেন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সকলের সংসারেই অনটন।” এই অবস্থায় শ্রমিকদের আবেদন, সারদায় লগ্নিকারীদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল রাজ্য সরকার। সারদার টিভি চ্যানেলটিও এখন রাজ্য সরকার চালাচ্ছে। কিন্তু এই কারখানাটার সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে সরকার ভাবল কই? প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
বড়জোড়ার বিধায়ক আশুতোষ মুখোপাধ্যায় অবশ্য ওই কারখানার দায় চাপিয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, তিনি বলেন, সারদা কান্ডের তদন্তের ভার এখন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে, তাই সারদার কারখানার দায়িত্বও কেন্দ্রকেই নিতে হবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের এখানে তেমন কিছু করার নেই, ওই কারখানায় কাজ হারানো শ্রমিকদের সংসারে অনটনের কথা শুনে তিনি বলেন, শ্রমিকেরা যদি আমার কাছে কারখানা চালু করার দাবি জানায় তাহলে সেই দাবি আমি রাজ্য সরকারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারকে জানাবো।