নারায়ণ স্বরূপ নিগম। গ্রাফিক— শৌভিক দেবনাথ।
শুধু সঞ্জয় রায় নয়। আর জি কর কাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে আরও একাধিক জন অভিযুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে আন্দোলনের সময় থেকেই। সম্প্রতি তিন শীর্ষ পুলিশ কর্তাকে নিলম্বিত করেছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু স্বাস্থ্য দফতরের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছে, আর জি কর আন্দোলনের সময় থেকে বারবার অভিযোগের আঙুল উঠেছিল যে স্বাস্থ্যসচিবের বিরুদ্ধে, তাঁর বিরুদ্ধে কেনই বা তদন্তের ইঙ্গিত এখনও নেই?
সূত্রের খবর, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে সন্দেহভাজনদের যে তালিকা নির্যাতিতার মা তথা পানিহাটির বিধায়ক জমা দিয়েছেন, তাতে স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি নির্যাতিতার বাবা-মা। তবে তাঁরা বলছেন, ‘‘স্বাস্থ্যসচিবের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন আছে। দীর্ঘ দিন ধরে স্বাস্থ্য দফতরে যে দুর্নীতি চলেছে তা স্বাস্থ্যসচিব জানতেন না, এমনটা তো হতে পারে না।’’ এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজিহননি স্বাস্থ্যসচিবও।
চিকিৎসক-পড়ুয়ার খুন এবং ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন থেকে দাবি উঠেছিল, কলকাতার নগরপাল-সহ অন্যান্য কর্তা ও স্বাস্থ্যসচিবকে অপসারণ করতে হবে। ১৬ সেপ্টেম্বর জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনার পরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নগরপাল বিনীত গোয়েল, ডেপুটি কমিশনার (উত্তর) অভিষেক গুপ্ত, স্বাস্থ্য অধিকর্তা দেবাশিস হালদার, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা কৌস্তভ নায়েককে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। এর পরে ধর্মতলায় জুনিয়র চিকিৎসকদের অনশনের সময়ে স্বাস্থ্যসচিবের অপসারণের দাবি উঠলেও কিছু হয়নি। নতুন সরকারও কোনও পদক্ষেপ করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন চিকিৎসকেরাই।
সরকারি সূত্রে ব্যাখ্যা, এখনও পর্যন্ত শুধু মুখ্যসচিব বদল হয়েছে। কোনও দফতরের প্রিন্সিপাল সচিব বদল হননি। সিএমও ছাড়া প্রশাসনেও কোনও বড় রদবদল হয়নি। যে হেতু পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা হয়নি এবং সরকার একেবারেই নতুন, আপাতত আমলারা যে যাঁর জায়গায় কাজ সামলাচ্ছেন। চোখ-কান হিসেবে কিছু বিধায়ককে কয়েকটি দফতরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রশাসনও সেভাবেই চলছে।
আর জি কর আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকা জুনিয়র চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো বলেন, ‘‘স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘ দিন ধরে দুর্নীতি, হুমকি প্রথা, স্বজনপোষণের অভিযোগ রয়েছে। যা পরোক্ষ ভাবে আর জি করের ঘটনার নেপথ্যের কারণ। তাই সেই দায় স্বাস্থ্যসচিবও এড়াতে পারেন না। সেই কারণেই আমরা প্রথম থেকেই স্বাস্থ্যসচিবকে অপসারিত করার দাবি তুলেছিলাম। তবে শুধু পুলিশ কর্তারা নয়, স্বাস্থ্যসচিব-সহ খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় তথ্যপ্রমাণ লোপাটে যুক্ত সকলকেই তদন্তের আওতায় আনা উচিত।’’
আর জি করের জরুরি বিভাগের সেমিনার রুম সংলগ্ন শৌচাগার তড়িঘড়ি ভেঙে ফেলা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সেই কাজ স্বাস্থ্যসচিবের নির্দেশে হয়েছিল বলে এখনও অভিযোগ করছেন নির্যাতিতার বাবা। তিনি বলেন, ‘‘বিভাগীয় প্রধান আবেদন করার সঙ্গে-সঙ্গেই স্বাস্থ্যসচিব তাতে অনুমোদন দিয়েছিলেন। তড়িঘড়ি এই অনুমোদনের নেপথ্যে তদন্তে বিভ্রান্তি তৈরি, না কি তথ্য প্রমাণ লোপাটের ব্যবস্থা করা তা আজও স্পষ্ট হয়নি।’’ ঘটনার পরবর্তী সময়ে বাড়িতে গিয়ে খোদ স্বাস্থ্যসচিব এবং আর জি করের উপাধ্যক্ষ ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে এসেছিলেন বলে দাবি নির্যাতিতার বাবা-মায়ের। তাঁদের কথায়, ‘‘ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার আবেদনের চিঠি আজও আমাদের বাড়িতেই পড়ে রয়েছে। আমরা আবেদন না করা সত্ত্বেও হাতে লেখা শংসাপত্র কী ভাবে দেওয়া হল?’’
আবার, আর জি করের ঘটনার পরে ৯ অগস্ট ভোরে ওই হাসপাতাল থেকে চার জন জুনিয়র চিকিৎসকের রেড রোডের প্যারেডের অনুশীলনে যাওয়ার জন্য জারি হওয়া নির্দেশিকা প্রকাশ্যে এসেছিল। তা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। নির্যাতিতার বাবা বলেন, ‘‘৬ অগস্ট স্বাস্থ্যসচিব ওই নির্দেশিকা জারি করে, ৮ অগস্ট আবার বদল করেন। আর, সরকারি নির্দেশিকা হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য দফতরের ওয়েবসাইটে নথিভুক্ত ছিল না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকারি নির্দেশিকায় কোনও রেফারেন্স নম্বর ছিল না। অধিকাংশ জায়গায় হাতে লেখা। নকল ওই নির্দেশিকা কার স্বার্থে, কেন জারি করা হয়েছিল সেটা স্বাস্থ্যসচিবই বলতে পারবেন।’’ এমনই বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে স্বাস্থ্যসচিবের বিরুদ্ধেও প্রথম থেকেই তাঁদের প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি নির্যাতিতার মায়েরও।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে