লুঠপাটের পরে।(১) গাড়ির শো-রুমে তখনও পড়ে রক্তের ছাপ।(২) গুলিবিদ্ধ শিশির ঘোষ। (৩) বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। নিজস্ব চিত্র।
এক রাতে পরপর এটিএমে লুঠ হয়েছিল সপ্তাহ দুয়েক আগে। এ বার গাড়ির শো রুম, পেট্রোল পাম্প, বিয়েবাড়িতে লুঠপাট চালিয়ে পালিয়ে গেল দুষ্কৃতীরা। রবিবার রাতে ঘণ্টা দুয়েক ধরে জনা সাতেক যুবক এই দুষ্কর্ম করে। তাদের ছোড়া গুলিতে জখম হন দু’জন। নিরাপত্তা রক্ষী, কর্মীদের মারধর করা হয়। মাথাও ফাটে কয়েকজনের।
সপ্তাহ দুয়েক আগেই জিটি রোডের উপর পরপর দুটি এটিএম কেটে লুঠপাট চালায় দুষ্কৃতীরা। পানাগড় বাজারের কাছেও একই ভঙ্গিতে একটি এটিএম কাটা হয়। কিন্তু ক্লোজ্ড সার্কিট ক্যামেরা বা নিরাপত্তা রক্ষী না থাকায় অপরাধীদের হদিস পায়নি পুলিশ। পুলিশের টহল, নজরদারিতে গাফিলতির অভিযোগও ওঠে। এ দিন ফের জিটি রোডের উপর খাগড়াগড় এলাকায় লুঠপাটে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটার পরেও পুলিশের তরফে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনও ব্যবস্থা করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করছেন শহরের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। জেলা ব্যবসায়ী সুরক্ষা সমিতির সম্পাদক চন্দ্রবিজয় যাদবের ক্ষোভ, “কয়েক দিন আগে এটিএম ভেঙে লুঠ চালায় দুষ্কৃতীরা। তারপর এই লুঠপাটের ঘটনা স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্ক তৈরি করেছে আমাদের মনে।”
যদিও জেলা পুলিশের এক কর্তার দাবি, “ঘটনার ঠিক আগে ওই পেট্রোল পাম্পে পুলিশ গিয়েছিল। টহলদারিও যথেষ্ট ছিল।” কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে ঘণ্টা দুয়েক ধরা চলা ‘অপারেশন’, গুলির আওয়াজ কিছুই টের পেল না পুলিশ, সে প্রশ্নও রয়েই যায়। জেলা পুলিশ সুপার কুণাল অগ্রবালের অবশ্য দাবি, ‘‘ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। খুব শীঘ্র দলটিকে ধরা হবে।’’ এই দুষ্কৃতী দলটিই হুগলির গুড়াপ, সিঙ্গুর, হরিপালে লুঠপাট চালিয়েছে বলেও জেলা পুলিশের দাবি। পুলিশ সুপার বলেন, ‘‘হুগলি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।’’ এ দিন আইসি প্রিয়ব্রত বক্সি-সহ পুলিশের একাধিক কর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেন। ঘটনাস্থল খুঁটিয়ে দেখে প্রত্যক্ষদর্শী ও পেট্রোল পাম্পের কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলা হয়। গুলির খোল পেয়েছে পুলিশ। দেখা হচ্ছে সিসিটিভি ফুটেজও। জানা গিয়েছে, দুষ্কৃতীদের গাড়ির নম্বর দেখার চেষ্টা করতেই গুলি করা হয় পাম্পের রক্ষীকে। পরে পাম্পের পিছনের ঝোপজঙ্গল থেকে একটি বন্দুকও মেলে বলে পুলিশের দাবি। ওই রাতেই জামালপুরের একটি পেট্রোল পাম্পেও দুষ্কতীরা হামলা চালায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই রাতের প্রথম শিকার খাগড়গড় মোড় থেকে কয়েক হাত দূরের একটি গাড়ির শো রুম। সেখানকার তিন নিরাপত্তা রক্ষীর এক জন, মিঠাপুকুরের বাসিন্দা অসীম তায়ের পায়ে গুলি লেগেছে। বাকি দু’জন কাজি সামসুর আলম ও সুকুমার দাসও আহত। তাঁদের অভিযোগ, “আমরা বসেছিলাম। আচমকা গেট টপকে হুড়মুড় করে জনা সাতেক ভিতরে ঢুকে পড়ে। প্রত্যেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, লোহার রড ছিল। কিছু বোঝার আগেই মারধর করতে থাকে। তারপর মাথায় পিস্তল ধরে শো রুমের দোতলায় নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের আটকে রেখে পুরো ঘর তছনছ করে দেয়।’’ তখনই দুষ্কৃতীরা বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। অসীমবাবু বাধা দিতে গেলে তাঁর পায়েও গুলি করা হয়। দোকানের এক কর্মী গেটের কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে শুরু করলে স্থানীয় লোকজনও টের পেয়ে যান। চম্পট দেয় দলটি।
এর কয়েক পা দূরেই একটি বিয়েবাড়ি ও তার উপর গাড়িতে লগ্নিকারী সংস্থার অফিস রয়েছে। দুষ্কৃতীরা সেখানেও ঢুকে বিয়েবাড়ির দুই কর্মীকে মারধর করে। লগ্নিকারী সংস্থার দফতরে ঢুকেও তছনছ চালায়। তবে কোনও জায়গা থেকেই তেমন ‘সুবিধা’ করতে পারেনি দুষ্কৃতীরা। এ বার তারা হানা দেয় পেট্রোল পাম্পে। পাম্পের কর্মীরা জানান, দুষ্কৃতীদের কয়েকজনের মুখ বাধা ছিল, কয়েকজন খোলা মুখেই এসেছিল। ছ’জন হাতে পিস্তল আর এক জনের হাতে দো’নলা বন্দুক ছিল বলেও তাঁদের দাবি। কর্মীদের অভিযোগ, ‘‘ওরা ভিতরেই ঢুকে মাথায় পিস্তল তাক করে সিন্দুক খুলিয়ে টাকা লুঠ করে।’’ লক্ষাধিক টাকা খোওয়া গিয়েছে বলেও তাঁদের দাবি। পাম্পের আহত নৈশপ্রহরী, লোকোর বাসিন্দা শিশির ঘোষ জানান, দুষ্কৃতীদের পিছনে ধাওয়া করে গাড়ির নম্বর দেখার চেষ্টা করছিলেন তিনি। তখনই তাঁকে গুলি করা হয়। পেটে গুলি লাগায় রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে বর্ধমান মেডিক্যাল, সেখান থেকে একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সোমবার দুপরে ওই হাসপাতালে শিশিরবাবুর অস্ত্রোপচার হয়েছে। সেখানকার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশিরবাবুর শরীর ভেদ করে গুলি বেরিয়ে গিয়েছিল।
উল্লাস মোড় থেকে নবাবহাট পর্যন্ত যে পেট্রোল পাম্পগুলি রয়েছে, সেখানকার কর্মীরাও রবিবারের রাতের পরে ভীত। তাঁরা বলেন, ‘‘রাতে গাড়ি নিয়ে কত রকম লোক তেল নিতে আসেন। অনেকে রাতে পাম্পের আচ্ছাদনে আশ্রয়ও নিতে আসেন। এ বার সবেই ভয় লাগবে।’’ রাতের দিতে পুলিশের টহলও সেভাবে থাকে না বলে তাঁদের দাবি। ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। ওই সমিতির সম্পাদক চন্দ্রবিজয় যাদব বলেন, ‘‘বিসি রোডে রাতভর ফল, পেঁয়াজ নামে। তা না হলে রানিগঞ্জ বাজারেও ডাকাতির ঘটনা ঘটত।” কিছুদিন আগে নিরাপত্তার দাবিতে বিসি রোড ধরে মিছিল করেন ব্যবসায়ীরা। তারপরেও পুলিশের টহল নিয়মিত হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। যদিও জেলা পুলিশের শীর্ষকর্তা বলেন, “পরপর বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এটিএম-সহ কিছু ঘটনার কিনারাও করা গিয়েছে। আর টহল রাতভরই থাকে।”