TMC

দল দখলের জাদু-সংখ্যা প্রায় নাগালে ঋতব্রতদের! আরও নিঃসঙ্গ মমতা, ধর্নামঞ্চে তাঁর পাশে মাত্র ৮ জন বিধায়ক

মঙ্গলবার ধর্মতলায় মমতার ধর্নায় তৃণমূল বিধায়দের মধ্যে ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ (ববি) হাকিম, মদন মিত্র, অশোক দেব, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীমা পাত্র এবং কুণাল ঘোষ।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ ২২:২২
Share:

ধর্নাস্থলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছবি: পিটিআই।

বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির ২৮ দিন পর প্রথম বার রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিলেন তিনি। সংবিধান হাতে নিয়ে বিজেপিকে হারানোর পণ করলেন ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলের ধর্নামঞ্চ থেকে। কিন্তু মঙ্গলবার দুপুরে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাশে পেলেন দলের মাত্র ৮ জন বিধায়ক এবং ৬ জন সাংসদকে! দলের দুই বহিষ্কৃত বিধায়ক, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহার ‘নেতৃত্বে’ তৃণমূল পরিষদীয় দলে ভাঙনের জল্পনার মধ্যেই মমতার কর্মসূচিতে জোড়াফুলের জনপ্রতিনিধিদের এই ‘গণ অনুপস্থিতি’তে বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

Advertisement

মঙ্গলবার ধর্মতলায় মমতার ধর্নায় তৃণমূল বিধায়দের মধ্যে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ (ববি) হাকিম, মদন মিত্র, অশোক দেব, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীমা পাত্র এবং কুণাল ঘোষ। দুই লোকসভা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মালা রায় এবং চার রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, সামিরুল ইসলাম এবং নাদিমুল হক ছিলেন মঙ্গলবারের ধর্না কর্মসূচিতে। ফলে শুধু পরিষদীয় দল নয়, শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের সংসদীয় দল অটুট থাকবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বহিষ্কৃত ঋতব্রত মঙ্গলবার ঘোষণা করে দিয়েছেন, বুধবার হাওড়া গ্রামীণ জেলায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে সেখানকার তৃণমূল বিধায়কেরা হাজির থাকবেন!

গত শনিবার সোনারপুরে মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পরেই ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার ধর্মতলার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে ধর্নার কর্মসূচির ঘোষণা করেছিলেন মমতা। কিন্তু কলকাতা পুলিশের তরফে অনুমতি মেলেনি। পরিবর্তে লালবাজারের তরফে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে ‘মঞ্চ না বেঁধে দু’ঘণ্টার জন্য ধর্না’র বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তৃণমূলক। পুলিশের সঙ্গে মৌখিক কথাবার্তার পর বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ ঘোষণা করেছিলেন, ওয়াই চ্যানেলে মঙ্গলবার দুপুর ২টো থেকে ৪টে পর্যন্ত তৃণমূলের কর্মসূচি হবে। সেই মতোই পালিত হয় কর্মসূচি।

Advertisement

কী বললেন মমতা

মঙ্গলবার দুপুর ২টো নাগাদ মমতা কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই পৌঁছে যান রেড রোডে। সেখানে বিআর অম্বেডকরের মূর্তিতে মালা দিয়ে ওয়াই চ্যানেলের উদ্দেশে রওনা হন। ধর্নাস্থল থেকে অভিষেকের উপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে মমতা বলেন, ‘‘ওটা গলির মধ্যে ছিল। হেলমেট না-দিলে পাথরটা ওর মাথায় লাগত।’’ তার পরেই হাসপাতালের ‘অসহযোগিতা’ নিয়ে সরব হন মমতা। তাঁর দাবি, ‘‘যখন সিরিয়াস অবস্থায় রোগী নিয়ে গেলাম তখন সিইও-র থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা বলছে। পুলিশ নার্সিং হোমকে থ্রেট করছে। পরে ট্রমা কেয়ারে ভর্তি করল। তখন হাসপাতালের সিইও আমার কাছে এলেন। শোভন চট্টোপাধ্যায়ও ছিল আমার সঙ্গে। আমাদের বললেন, মাফ করবেন। আর চাপ নিতে পারছি না। ভয় দেখানো হচ্ছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বিজেপি বাদে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। তবে বিজেপির যাঁরা বলেছেন, তাঁদের পাশেও ছিলাম... জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হটাকে যায়েঙ্গে (যদি বেঁচে থাকি বিজেপি-কে সরিয়েই যাব)।’’

রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে ধর্নার অনুমতি না-পাওয়ায় পুলিশকে নিশানা করে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘‘আমাদের এখানে ধর্নায় মাইকের অনুমতি দেওয়া হয়নি। হ্যান্ড মাইক নিয়ে বলতে হচ্ছে। এ ভাবে আমাকে আটকাতে পারবে না। যেখানে পারব বসে পড়ব। বাবা সাহেব অম্বেডকরের মূর্তিতে মালা দিতে কি আমাকে আটকাতে পেরেছে না জানতে পেরেছে? সংবিধান নিয়ে গিয়েছিলাম। মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে মালা দিয়ে শপথ নিলাম— এই অত্যাচার যত দিন চলছে, তত দিন মোকাবিলা করব। করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে (করব নয়তো মরব)।’’ মমতার অভিযোগ, ‘‘আমাকে মারা হয়েছে। ভোট লুট হয়েছে।’’ পুলিশের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘‘যাঁরা আসছেন, তাঁদের ঢুকতে দিন। না হলে লালবাজার ঘেরাও হবে। নবান্ন ঘেরাও হবে। সব থানা ঘেরাও হবে।’’

তবে তার পরেই মমতা বলেন, ‘‘আমি পুলিশকে দোষ দিচ্ছি না। ওদের কোনও ভুল নেই। আমিও প্রশাসনে ছিলাম। ওরা চেয়ারের কথা শোনে। চেয়ার যা বলে তা করে।’’ মমতার অভিযোগ, দলীয় বিধায়কদের বাড়ি থেকে বার হতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ গিয়ে তৃণমূল ছাড়ার কথা বলছে। নতুন তৃণমূল তৈরি করতে বলছে। তার পরেই মমতার প্রশ্ন, ‘‘কারা নতুন তৃণমূল তৈরি করবে? যাঁরা প্রথম থেকে দলের সঙ্গে আছেন তাঁরা নাকি যাঁরা দলের প্রতীকে জিতেছে তাঁরা?’’ মমতার অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে ‘বুলডোজ়ার’ রাজনীতি চলছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে সকলকে। ইডি, সিবিআই দিয়ে ‘ভয়’ দেখিয়ে বিজেপি-কে সমর্থন করার কথা বলা হচ্ছে। গণতন্ত্রের উপর বুলডোজ়ার চালাবেন না। তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘‘আমাদের বিধায়ক-সাংসদের ভয় দেখাবেন না। আমাদের লোকদের গ্রেফতার করবে না। আপনাদের অত্যাচারে আত্মহত্যা করছেন। সব জায়গায় চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।’’

দলে ভাঙনের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মমতা মঙ্গলবার বলেন, ‘‘২০০৬ সালে আমরা ২৯টা আসন জিতেছিলাম। অন্তত ৩০টা জিততে হত, না হলে বিরোধী দলনেতার তকমা মেলে না। সেই কারণে তৎকালীন সরকার তখন স্বীকৃতি দেয়নি। যখন ৩০ হয়, তখন স্বীকৃতি দিয়েছিল। এ ব্যাপারে দলকে বলতে হয়। কোনও বিধায়ক বলেন না। আমরা যখন সরকারে আসি তখন সিপিএমের তরফে সূর্যকান্ত মিশ্রের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। আমরা মেনে নিয়েছিলাম। এখন কেন আমাদের দেওয়া হচ্ছে না।’’

তার পরেই সই-বিতর্ক নিয়ে মুখ খোলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘আজ যাঁরা বলছেন, সই আমাদের নয়। আমার কাছে ভিডিয়ো রেকর্ড আছে। কেউ বড় অক্ষরে লেখেন, কেউ আবার সই করেন। তবে হাতের লেখা ওদের কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষা করিয়ে নিন। যদি কোনও বিভ্রান্তি থাকে তো ফরেনসিক করাতেই পারেন। কিন্তু তার জন্য বিরোধী দলনেতা বাছাই আটকায় না।’’ এফআইআর প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘আমরা আমাদের দল থেকে চিঠি দিয়েছিলাম। যখন স্পিকার নির্বাচন হল তখন তো বিরোধী দলনেতা হিসাবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার অর্থ কী? যদি তিনি বিরোধী দলনেতা না-ই হবেন, তবে তাঁকে হাত ধরে নিয়ে এসেছিলেন কেন? স্পিকারের স্বাগত ভাষণেও বিরোধী দলনেতা হিসাবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বক্তৃতা করতে বলেছিলেন। এখন সই-বিভ্রান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এই সব করার দরকার নেই। এটা দল সিদ্ধান্ত নেয়।’’

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘দেখুন কার উপর আপনি দায়িত্ব দিয়েছেন। কী হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। এ সব কিছু তো আপনাকে দেখতে হবে।’’ মমতার অভিযোগ, ইচ্ছা করে রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে কর্মসূচি করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘ওই রাস্তা দিয়ে গদ্দার যায়। ওখানে লাটসাহেব থাকেন। আমিও দেখব ভবিষ্যতে রানি রাসমণিতে কোনও কর্মসূচি হচ্ছে কি না। যদি সেখানে কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়, তখন কোর্টে যাব। বলব, আমাদের ওখানে কর্মসূচি করতে দেওয়া হয়নি।’’ মমতার দাবি, যাঁদের ঘর-দোকান ভেঙেছ, তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাঁর কথায়, ‘‘অভিষেক দু’জায়গায় গিয়েছিল, তাতেই ভয় পেয়ে গিয়েছে। ওকে মারতে গিয়েছিল। আমি তো সব জায়গায় যাব। আমি তো জানিয়ে যাব না।’’ মমতার চ্যালেঞ্জ, ‘‘মারলে মারো। কিন্তু যত দিন কণ্ঠ রয়েছে, তত দিন মাথা নত করাতে পারবে না।’’ ওয়াই চ্যানেলে মমতা এবং তৃণমূল নেতৃত্বকে ঘিরে ছিলেন দলীয় কর্মী-সমর্থকেরা। মমতার বক্তৃতার সঙ্গে সঙ্গে উঠছে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। প্রথমে তৃণমূল সমর্থকদের চিৎকারে বক্তৃতার মাঝে বার বার থামতে হয় মমতাকে। পরে তৃণমূল কর্মীদের শান্ত করিয়ে আবার বক্তৃতা করেন তিনি।

তাপসের ঘোষণা, ঋতব্রতের সাফাই

মঙ্গলবার সকালে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বিজেপি বিধায়ক তথা মন্ত্রী তাপস রায় লেখেন, ‘‘তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতো অবস্থা হল তৃণমূলের। বিধানসভার স্পিকারের কাছে প্রায় ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গিয়েছেন ঋতব্রত। খেলা হবে।’’

যদিও ঋতব্রত বিজেপি বিধায়কের এই পোস্টের বিষয়বস্তু অস্বীকার করেন। তিনি বিধানসভায় প্রবেশের সময় বলেন, ‘‘বিধানসভায় কাজে এসেছি। সবই জল্পনা।’’ তিনি এ-ও দাবি করেন, এর আগে যে বিধানসভায় গিয়েছিলেন, তা নেহাতই আড্ডা দিতে। ৫০ জন বিধায়ক কি তাঁর পাশে রয়েছেন? সেই প্রশ্নের জবাবে ঋতব্রত বলেন, ‘‘আমি আমার এবং সন্দীপন ছাড়া কারও দায়িত্ব নিতে পারব না।’’ ঋতব্রত বিধানসভায় পৌঁছোনোর পরেই সেখানে যান তাপসও।

সোমবারই ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল। নবাগত দুই বিধায়কের দাবি, গত ৬ মে-র বৈঠকে বিরোধী দলনেতা বাছার কোনও রেজ়োলিউশন (প্রস্তাব) হয়নি। স্রেফ একটি উপস্থিতির খাতায় করানো সইকে জালিয়াতি করে সেটা রেজ়োলিউশনে বদলে দিয়েছেন নেতৃত্ব। বিধানসভার সই জাল-কাণ্ডে সোমবার দুপুরে নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তখন তিনি জানান, তৃণমূলের দুই বিধায়ক ঋতব্রত এবং সন্দীপনই লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন স্পিকারের কাছে। এখানে বিজেপির কোনও ভূমিকা নেই। তৃণমূলের দুই বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতেই বিধানসভার সচিবালয় হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে। আর পুলিশমন্ত্রী হিসাবে বিষয়টি তাঁর কানে যাওয়ার পর সিআইডি-কে তদন্তে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। শুভেন্দুর এই ঘোষণার পরেই জানা যায়, দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল।

মঙ্গলবার বিধানসভায় প্রবেশের সময় ঋতব্রত স্পষ্ট জানান, দল বহিষ্কার করলেও মমতার প্রতি তাঁর সম্মান একই রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘মমতা সকলের নেত্রী। পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হতে পারি। মমতার প্রতি যে সম্মান ছিল, তাই থাকবে। তিনিই আমার নেত্রী।’’ এর পরেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল তোলেন ঋতব্রত। তিনি বলেন, ‘‘মমতা যে পার্টি করেছিলেন, ঘটনাচক্রে কর্পোরেট রীতিতে চলতে গিয়ে সেই তৃণমূল বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। (ভোটের ফলঘোষণার) ২৬ দিন পরে বেরিয়ে গণপিটুনি বা চোরপিটুনি অভিষেক খেলেন। গতকাল থেকে আমি গদ্দার, বেইমান শুনছি, কিন্তু চোর-চোর শুনছি না। রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে নিরাপত্তাও চাইনি।’’

এর পরেই ঋতব্রত বলেন, ‘‘ভোটের আগে থেকেই উলুবেড়িয়ার সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হই। আই-প্যাককে বলেছি। এজেন্টরা বসতে পারছে না। ভোটের দিন সাবোতাজ (অন্তর্ঘাত) হয়। প্রশাসনের কাছে এক ধরনের সই জমা পড়েছে। পোল প্যাকেটে আর এক রকম।’’ ঋতব্রতের দাবি, তিনি উলুবেড়িয়ায় ভোটের দিন দুপুরে সাংবাদিক বৈঠক করতে চেয়েছিলেন। দলের তরফে তা করতে দেওয়া হয়নি। ‘উলুবেড়িয়ার সরকার’ বলতে তিনি কাদের বুঝিয়েছেন, তা-ও জানান। ঋতব্রত বলেন, ‘‘উলুবেড়িয়া পুরসভার চেয়ারম্যান অভয় দাস দুর্নীতির শিরোমণি। বলা হয়েছিল, তাঁর এবং আকবর শেখের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আমাকে বলা হয়, ‘পুলক রায়কে (রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী) নিয়ে কিছু বলবেন না।’ আমরা বাকিটা দেখব।’’ পুলকের দিকে আঙুল তুলে তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে। ঋতব্রতের কথায়, ‘‘সরকারকে অনুরোধ করব, পুলকের দফতরের অধীনে যে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ছিল, তার এমডি ক্যামাক স্ট্রিটে (অভিষেকের দফতরে) কখন, কবে যেতেন, সুমিত রায়ের সঙ্গে কী যোগাযোগ ছিল, সব জানানো হোক। চক্র ছিল।’’

কুণালের নিশানায় স্পিকার

ঋতব্রত যখন তাঁর পুরনো দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলছেন, তখন বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল। তিনি জানান, বিধানসভায় একটি চিঠি দিতে গিয়ে তাঁর মজাদার অভিজ্ঞতা হয়েছে। কী অভিজ্ঞতা, তা-ও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘‘স্পিকার সাহেব নেই। অধ্যক্ষের সচিবালয়ে গিয়েছিলাম তাঁর সচিবের কাছে। তিনি যা জানালেন, তাতে হাসব না কাঁদব জানি না। সোমবার একটি চিঠি এখানে জমা করা হয়েছে। তারা সেটি গ্রহণ করেছেন। চিঠি গ্রহণের পরে স্পিকার (সচিবকে) নির্দেশ দিয়েছেন, বিরোধীদের কোনও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না। তিনি অনুমতি না দিলে কারও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না।’’

কুণাল জানান, স্পিকারের সচিব চিঠি গ্রহণ করেননি। তিনি বিধানসভার প্রিন্সিপাল সচিবকে ফোন করেন। তিনি নির্দেশ দেন, কারও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না। ফোনও ধরা হবে না। কুণাল বলেন, ‘‘আমরা চিঠিটি স্পিকারের সচিবের টেবিলে পেপারওয়েট চাপা দিয়ে রেখে ভিডিয়ো করে বেরিয়ে এলাম।’’ কুণাল আরও বলেন, ‘‘চিঠি স্পিকারের দফতর গ্রহণ করে, এটাই দস্তুর। আজ নির্দেশনামা জারি হয়েছে। সচিবের অধিকার খর্ব করা হয়েছে।’’ কুণালের আরও দাবি, ‘‘সোমবার নিয়েছিলেন চিঠি, সত্যি কি না জানি না, বুধবার থেকে অন্য দফতরে বদলি হয়েছেন (সচিব)। সেটা চিঠি গ্রহণ করার পরে হয়েছে কি না, বলতে পারব না।’’ এর পরেই কুণালের প্রশ্ন, ‘‘বিরোধীরা একটা চিঠি জমা দেব। স্পিকার নেই বলে কি চিঠি জমা পড়বে না? দেখা করবেন না, চিঠিও জমা পড়বে না? এটা কি ছেলেখেলা! আমরা হাসিম আবদুল হালিম, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেছি।’’

বিধানসভায় কুণালের সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের আর এক বিধায়ক অসীমা। তাঁর দাবি, স্পিকারের সচিব জানিয়েছেন, স্পিকারের অনুমতি ছাড়া বিরোধীদের কোনও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না। তাঁরা স্পিকারের টেবিলে চিঠি রেখে চলে আসেন বলে জানান কুণাল। তবে চিঠি কী বিষয়ে লেখা, তা জানাননি তিনি। এই বিষয়ে তাপস বলেন, ‘‘যেহেতু তদন্ত চলছে, তাই হয়তো চিঠি নেওয়া হয়নি।’’ দলের বিধায়কদের একাংশের বিদ্রোহ প্রসঙ্গে কুণাল ঘোষ বলেন, “যাঁরা এটা করছেন, তাঁরা বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। একমাসও হয়নি তাঁরা মমতাদির নাম, ছবি ব্যবহার করে জিতেছেন। দল আজ বিরোধী আসনে। এখন মনে হচ্ছে দল খারাপ ছিল?” রবিবার কালীঘাটের বৈঠকেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, তৃণমূলের পরিষদীয় দলে ফাটল ধরেছে। ওই দিন দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই অনুপস্থিত ছিলেন। তার পর সই জাল-কাণ্ড নিয়েও বিড়ম্বনা বাড়ে রাজ্যের পূর্বতন শাসকদলের। তার মধ্যেই মঙ্গলবার তৃণমূলের কর্মসূচিতে মাত্র ১৪ জন সাংসদ-বিধায়কের উপস্থিতি দলে ভাঙনের ইঙ্গিতবাহী বলেই রাজনীতির কারবারিদের একাংশ মনে করছেন।

মমতাকে খোঁচা শুভেন্দুর

ধর্মতলায় তৃণমূলের কর্মসূচির ছন্নছাড়া দশা দেখে মঙ্গলবার তারকেশ্বর থেকে কটাক্ষ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দল হিসাবে তৃণমূলের অবস্থার সঙ্গে তুলনা টানলেন সদ্যসমাপ্ত ফলতা পুনর্নির্বাচনে তৃণমূলের ফলাফলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‘একজন ছবি পাঠিয়েছিল... এত দুরবস্থা আমি জানতাম না! একঝুড়ি লোক... দেড়শোটা লোকও আসেনি। সাংবাদিকরাই ছিলেন দু’শো জন মতো। সাংবাদিকেরা না থাকলে তো আরও করুণ অবস্থা হত।’’

পাশাপাশি, তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের সিংহভাগের ওই কর্মসূচিতে অনুপস্থিতি নিয়েও তৃণমূলকে বিঁধেছেন শুভেন্দু। কটাক্ষের হাসি হেসে বলেন, ‘‘রাজ্যসভা, লোকসভা মিলিয়ে এতগুলো এমপি (সাংসদ)। শুনলাম, তিন জন এমপি আর ছ’জন এমএলএ (বিধায়ক) গিয়েছেন। ওই দলটার অবস্থা ফলতার মতো হয়ে গিয়েছে।’’ প্রসঙ্গত, সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বিধানসভার সই-কাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে তৃণমূলকে ‘ভেটেরান চোর’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘এদের যে হেরে যাওয়ার পরেও চুরির অভ্যাস কাটেনি, ‘ভেটেরান’ চোর এরা। এত প্রতিষ্ঠিত চোর দেখা যায় না। নিজের দলের বিধায়কদের সই জাল করেন এবং তিন জন এমএলএ সেটা স্বীকার করেছেন সিআইডির সামনে।’’

তারকেশ্বর মন্দিরে পুজো দিয়ে দলীয় বিধায়ক থেকে জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে বেরিয়ে জানান, তারকেশ্বর উন্নয়ন পরিষদে প্রশাসক নিযুক্ত করা হচ্ছে। তারকেশ্বর ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে। মঙ্গলবারই মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং প্রধান সচিবকে নির্দেশ দেবেন এ নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এডিএম অনুজ প্রতাপ সিংহকে আমরা প্রশাসক করছি। সামনে শ্রাবণী মেলা। এই মেলাকে কেন্দ্র করে এ বার সরকার থেকে বাবা তারকনাথের পবিত্রভূমি তারকেশ্বরে শ্রাবণ মাসে যত পুণ্যার্থী আসবেন, তাঁদের জন্য বড় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’ শুভেন্দু জানিয়ে দেন, মন্দিরের আশপাশে আর নীল-সাদা রং থাকবে না। তাঁর কথায়, ‘‘পবিত্র দুধপুকুর পাড়ে কী সব রং করে রেখেছে! রঙ পরিবর্তন আগে করা দরকার। আধ্যাত্মিকতা এবং আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই রং প্রয়োজন। সেটা আগে করতে হবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement