কলকাতার মেট্রোপলিটনের দলীয় কার্যালয়ে তৃণমূলের দুই শিবিরের প্ল্যাকার্ড। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
এ বার কলকাতার মেট্রোপলিটনের দলীয় কার্যালয় ‘দখল’ করল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। ঋতব্রতের সঙ্গে ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান, আখরুজ্জামান-সহ একঝাঁক বিধায়ক। ওই কার্যালয়ে গিয়ে বসেন সকলে। আখরুজ্জামান জানান, এই কার্যালয়ের সঙ্গে তৃণমূলের আবেগ জড়িয়ে আছে। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার দিল্লিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের ফুলবেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করেন ঋতব্রতেরা।
‘আসল’ তৃণমূল কারা, বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ঋতব্রতের নেতৃত্বে একদল বিধায়ক দলের অন্দরে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তার পর থেকেই দলে ভাঙন শুরু হয়। ঋতব্রতের তৃণমূল বনাম কালীঘাটপন্থী তৃণমূল তরজা এখনও চলছে। ‘আসল’ তৃণমূলের দাবি জানায় দু’পক্ষই। সেই আবহে শুক্রবার দলীয় কার্যালয় ‘দখল’ করেন ঋতব্রতেরা। ভবনের বাইরের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন তাঁরা। খবর পেয়েই ওই কার্যালয়ে পৌঁছে যান কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের কুণাল ঘোষ। এই পার্টি অফিসটি কুণালের বিধানসভা এলাকাতেই।
গত ২১ জুন নিউ টাউনের হোটেলে বৈঠক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে ‘তৃণমূলের’ জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করে ফেলেছিলেন ঋতব্রত এবং তাঁর সহযোগীরা। সেই বৈঠকে তৃণমূলের চেয়ারম্যান হিসাবে হাওড়া মধ্য বিধানসভার বিধায়ক অরূপ রায়কে বেছে নেওয়া হয়। শুক্রবার ঋতব্রতেরা সঙ্গে করে একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে আসেন। সেই প্ল্যাকার্ডে জ্বলজ্বল করছে তৃণমূল চেয়ারম্যান হিসাবে অরূপের নাম। মেট্রোপলিটনে তৃণমূল কার্যালয়ের বাইরে সেই প্ল্যাকার্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ ঘিরে টানাপড়েন দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের দুই শিবিরে। কালীঘাটপন্থী তৃণমূল এবং ঋতব্রতের তৃণমূল বাগ্যুদ্ধে জড়িয়েছিল। দু’দলই চেয়েছিল ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সমাবেশ করবে। কিন্তু কলকাতা পুলিশ কোনও পক্ষকেই অনুমতি দেয়নি। সেই নিয়ে জটিলতা রয়েছে। তার মধ্যে নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল বলে দাবি করে বৃহস্পতিবারই দিল্লিযাত্রা করেছিল ঋতব্রত শিবির। ঋতব্রত জানান, নতুন কর্মসমিতির বিষয়ে অবহিত করতে তাঁরা কমিশনের কাছে সময় চেয়েছিলেন। দলের প্রতীক এবং তহবিল কোন শিবিরের হাতে যাবে, এই প্রশ্নের উত্তরে ঋতব্রত বলেন, “কোনও রকম বিতর্কের কোনও প্রশ্নই নেই। দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক আমাদের সঙ্গে। প্রাক্তন মন্ত্রীরা আমাদের সঙ্গে। কাউন্সিলররা আমাদের সঙ্গে, জেলা পরিষদের সদস্যরাও আমাদের সঙ্গে।”
প্রসঙ্গত, তৃণমূল কার দখলে থাকবে? তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রতের শিবিরের দাবি এবং পাল্টা দাবির ভিত্তিতে তাঁদের চিঠি দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। আগামী ৬ জুলাই, সোমবারের মধ্যে দু’জনের জবাব চেয়েছে তারা। বলা হয়েছে, সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে নথিপত্র-সহ তাঁদের বক্তব্য জানাতে হবে।
প্রতীক, নাম, দলের তহবিল— এই নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যেই তৃণমূলের কার্যালয় ‘দখল’ নিয়ে চাপানউতর শুরু হয়ে গেল। আখরুজ্জামান বলেন, ‘‘আমরাই তৃণমূল। এটা আমাদের কার্যালয়। এই কার্যালয়ের সঙ্গে তৃণমূলের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে।’’ এ-ও জানান, তাঁরা মালিকের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভাড়া-সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এই ‘দখলদারির’ নেপথ্যে রাজ্য সরকার এবং পুলিশের মদত রয়েছে বলে অভিযোগ কালীঘাট তৃণমূলের। মমতার শিবিরের বিধায়ক কুণাল এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘দখলদারির সংস্কৃতি চলছে। সরকার এবং পুলিশের প্রত্যক্ষ মদতে একজন বহিষ্কৃত বিজেপির বি টিম হয়ে নেমেছে।’’
মেট্রোপলিটনের পার্টি অফিস জুড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি, কাটআউট রয়েছে। ঋতব্রতেরা যদিও সেই সব ছবিতে হাত দেননি। তাঁরা স্পষ্ট জানান, মমতাকে পরামর্শদাতা হিসাবে চান। বুঝিয়ে দেন, মমতাকে সামনে রেখেই এগোতে চান তাঁরা। যদিও কালীঘাটপন্থী তৃণমূল এ ধরনের ‘দখলদারির’ বিরোধিতা শুরু করেছে।
কলকাতার মেট্রোপলিটনের এই কার্যালয় ঘিরে বিগত কয়েক দিন ধরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। যে ভবনে তৃণমূলের এই প্রধান কার্যালয়টি ছিল, তাঁর মালিক মনোতোষ সাহা, যিনি মন্টু সাহা নামেই পরিচিত। মন্টুর মালিকানাধীন ‘মডার্ন ডেকরেটিং’ ভোটের আগে পর্যন্ত তৃণমূলের সমস্ত কর্মসূচিতে মঞ্চ বাঁধার বরাত পেত। এমনকি ধর্মতলায় ২১ জুলাইয়ের প্রশস্ত মঞ্চটিও তৈরি করত মডার্ন ডেকরেটিং। ভোটের ফল বেরোনোর পর অবশ্য মন্টু আর তৃণমূলের সম্পর্কের রসায়ন বদলে যায়। তৃণমূলকে ওই ভবন ছাড়তে বলেন মন্টু। তিনি দাবি করেন যে, বার বার বলার পরেও ওই ভবন খালি করছে না তৃণমূল। শুক্রবার সেই মন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করেই প্রধান কার্যালয়ের ‘দখল’ নিল ঋতব্রত শিবির।