— প্রতীকী চিত্র।
দমদম স্টেশন থেকে দমদম ঘুঘুডাঙা ভারতী বিদ্যামন্দির মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। দূর থেকে দেখা গেল স্কুলের গেটের সামনে ভিড়। মনে হল, স্কুল শুরু হওয়ার আগে হয়তো অভিভাবকেরা পৌঁছতে এসেছেন সন্তানদের।
ভুল ভাঙল স্কুলের গেটের সামনে গিয়ে। এঁরা স্কুলপড়ুয়াদের অভিভাবক নন। স্কুলে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর শুনানি চলছে। শুনানির ডাক পেয়ে স্কুলে এসেছেন অনেকে। এ ভিড় তাঁদেরই।
যে সব স্কুলে এসআইআরের শুনানি হয়, সেখানে তো পাশাপাশি ক্লাসও হয়। এখানে কি তা হলে স্কুলের ভিতরে অন্য কোথাও ক্লাস হচ্ছে? কৌতূহলে স্কুলের ভিতরে পা রাখতেই অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। কোনও ঘরে তো ছাত্রছাত্রীই নেই। কতগুলো বেঞ্চ ডাঁই করে এক জায়গায় রাখা। একটি ঘরে বসে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ক্লাস কোথায় হচ্ছে? পড়ুয়ারা কোথায়? খুব বেশি পড়ুয়া কি স্কুলে আসেনি আজ?
স্কুলের প্রধান শিক্ষক সমীরকুমার বিশ্বাস বললেন, “আমাদের স্কুলে গত এক বছর ধরে পড়ুয়ার সংখ্যা শূন্য।”
কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সমীক্ষা সম্প্রতি জানিয়েছিল, রাজ্যে হাজারেরও বেশি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা তলানিতে ঠেকেছে। কিছু স্কুলে কোনও পড়ুয়াই নেই। তা বলে খাস কলকাতার স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা শূন্য! সমীর বললেন, “শুধু এই স্কুলই নয়, এই এলাকায় আরও বেশ কয়েকটি স্কুলেও পড়ুয়ার সংখ্যা তলানিতে।”
পড়ুয়া না থাকলেও স্কুল কিন্তু প্রায়শই জমজমাট থাকে, জানালেন সমীর। এখন যেমন এই স্কুলে এসআইআরের কাজ চলছে, কখনও স্কুল হয়ে যায় ‘কমিউনিটি হল’। সেখানে তখন নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়। খোদ প্রধান শিক্ষক বলছেন, “স্থানীয় নেতারা স্কুলকে কোনও কাজে ব্যবহার করতে চাইলে বারণ করব, এমন বুকের পাটা আমার নেই।”
স্কুল যে একটা সময়ে গমগম করত, তার ছাপ অবশ্য এখনও রয়েছে। স্কুলের গেটের সামনে ভাঙাচোরা পানীয় জলের মেশিন। বিদ্যুতের বিল দিতে না পারায় স্কুলের বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে। ফলে পরিস্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। দোতলায় স্কুলের গ্রন্থাগার। ভাঙা আলমারির তাকে নষ্ট হচ্ছে বইয়ের সারি। ভাঙা বেঞ্চ, ভাঙা চেয়ার-টেবিল, সব মিলিয়ে ক্লাসরুম যেন ভগ্নস্তূপ। সরকারি সম্পত্তি এ ভাবে নষ্ট হওয়ার অভিযোগ শিক্ষা দফতরে জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি, বললেন সমীর। সেই সঙ্গে জানালেন, পড়ুয়া না-থাকলেও স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা কিন্তু দশ। দেখা গেল, স্কুলের কমন রুমে সেই শিক্ষক-শিক্ষিকারা বসে রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক জানালেন, সারা দিনে কিছুই করার নেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। নিয়ম মেনে স্কুল শুরুর সময়ে আসেন। আবার ছুটির সময় হলে বাড়ি চলে যান।
দমদম এলাকারই আর একটি স্কুল দমদম জওহর নগর নেহরু বিদ্যাপীঠ। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির এই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সোমা হেমব্রম জানালেন, স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা খাতায়-কলমে ৬৫, তবে এ দিন এসেছে ১০ থেকে ১২ জন। এই স্কুলেও পড়ুয়ার সংখ্যা তলানিতে, শিক্ষকের সংখ্যা সাত।
কলকাতার এই স্কুলগুলো ঘুরতে ঘুরতে সুন্দরবন এলাকার কুমিরমারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রণয় মণ্ডলের কথাটা মনে পড়ছিল। প্রণয় বলছিলেন, “আমাদের স্কুলে দু’শোর উপরে পড়ুয়া। কিন্তু শিক্ষক চার জন। অঙ্ক- ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের এক জনও শিক্ষক নেই। আমাদের স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ খুলে দিয়েছে শিক্ষা দফতর। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের এক জন শিক্ষকও নেই। শিক্ষা দফতর কবে শিক্ষক পাঠাবে, সে জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকি। তা-ও এই আকালের মধ্যে মধুমিতা সাউ নামে এক ছাত্রী উচ্চ মাধ্যমিকে ৯২ শতাংশ নম্বর পেয়েছে।” প্রণয় জানান, তাঁদের এলাকার আর একটি স্কুলে স্থায়ী শিক্ষক ৯ জন। তাঁদের মধ্যে ৮ জনই ২০১৬ সালের এসএসসি-র চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষক। এই শিক্ষকেরা ফের নিয়োগ পেয়ে অন্যত্র চলে গেলে ওই স্কুল কী ভাবে চলবে, কেউ জানে না।
কিন্তু কলকাতা শহর বা শহরাঞ্চলে সরকারি স্কুলগুলোতে পড়ুয়া কেন কমে যাচ্ছে? শিক্ষকদের একাংশ জানাচ্ছেন, কলকাতা শহরে যেহেতু সরকারি স্কুলের পাশাপাশি প্রচুর বেসরকারি স্কুল রয়েছে, তাই কিছুটা সামর্থ্য থাকলেই অভিভাবকেরা ছেলেমেয়েদের বেসরকারি স্কুলেই ভর্তি করাচ্ছেন। প্রধান শিক্ষকদের মতে, শহরেও কিন্তু বহু সরকারি এবং সরকার-পোষিত স্কুলে পড়ুয়া ও শিক্ষকের অনুপাত ঠিক নেই। হিন্দু স্কুল, হেয়ার স্কুল, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল, বেথুন কলেজিয়েট স্কুলের মতো ঐতিহ্যশালী সরকারি স্কুলেও পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে।
হিন্দু স্কুলের প্রধান শিক্ষক শুভ্রজিৎ দত্ত বললেন, “রাজ্যে মোট ৩৯টি ঐতিহ্যশালী সরকারি স্কুল রয়েছে। তার মধ্যে হিন্দু, হেয়ার, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট, বেথুন-সহ মোট ৯টি সরকারি স্কুল কলকাতা শহরেই। সেগুলির মধ্যে একমাত্র হিন্দু স্কুলেই প্রধান শিক্ষক রয়েছেন। বাকি কোনও সরকারি স্কুলে প্রধান শিক্ষকই নেই। কলকাতার অধিকাংশ সরকারি স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষকও নেই। আমাদের স্কুলেও অঙ্ক, বিজ্ঞান ইংরেজির মতো বিষয়গুলোতে শিক্ষকের অভাব রয়েছে। এর মধ্যে আবার শিক্ষকদের বদলির ফলে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।” পশ্চিমবঙ্গ সরকারি বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৌগত বসু বলছেন, “সরকারি স্কুলে নিয়োগ হয় পিএসসি-র মাধ্যমে। ২০১৪ সালে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কিছু নিয়োগ হয়েছিল। তার পর থেকে নিয়োগ বন্ধ। এই অবস্থায় শহরের স্কুলগুলোর থেকেও অভিভাবকদের ভরসা উঠে যাচ্ছে।”
প্রধান শিক্ষকদের একাংশের মতে, গত কয়েক বছরে শিক্ষক ও পড়ুয়ার অনুপাতের দফরফা হয়েছে সরকারি স্কুলগুলিতে। এর অন্যতম প্রধান কারণ, ‘উৎসশ্রী’ পোর্টালের মাধ্যমে হওয়া বদলি। ওই পোর্টালে আবেদন করে গ্রাম থেকে বহু শিক্ষক শহরে চলে এসেছেন। অথচ গ্রামেই সরকারি স্কুলে পড়ুয়া বেশি। তাই সেখানেই শিক্ষকের বেশি প্রয়োজন। এই সমস্যাটা আরও তীব্র হচ্ছে বছরের পর বছর শিক্ষক নিয়োগ না-হওয়ায়। এ দিকে নিয়োগ আটকে রয়েছে দুর্নীতির জালে। নিয়োগে যত দেরি হচ্ছে, স্কুলগুলোর ক্লাসঘরের চিত্র ততই বিবর্ণ হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের প্রশ্ন, কোন ভরসায় ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাবেন তাঁরা? অথচ স্কুলগুলোতে পড়ুয়াদের জন্য রয়েছে হরেক সরকারি প্রকল্প। সেই সব প্রকল্পের তালিকা শোনাচ্ছেন শিক্ষা দফতরের কর্তারা। অভিভাবকদের প্রশ্ন, সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে চাই নিয়মিত ক্লাসও। সেটা হচ্ছে কি?
(চলবে)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে