(বাঁ দিকে) অনন্ত মহারাজ, রাহুল সিংহ (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
দলীয় দফতরে তাঁর জন্য একটি বসার জায়গা বরাদ্দ ছিল। একটি গাড়ির ব্যবস্থাও দলই করে রেখেছিল। বহাল ছিল কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাও। কিন্তু বিজেপিতে রাহুল সিংহের কোনও দায়িত্ব বা ক্ষমতা ছিল না। কারণ, গত সাড়ে পাঁচ বছর ধরে তিনি দলের কোনও পদে নেই। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তিনি টিকিট পাবেন, এমন নিশ্চয়তাও ছিল না। সেই রাহুল সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছেন রাজ্যসভায়। এই প্রাপ্তির জন্য তিনি যে বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের প্রতি কৃতজ্ঞ, সে কথা ঠারেঠোরে বোঝানোর চেষ্টা রাহুল করছেন। কিন্তু ‘ধন্যবাদ’ বা ‘কৃতজ্ঞতা’ কি শুধু শমীকের প্রাপ্য? না কি প্রাপ্য রাজ্যসভার আর এক সাংসদ অনন্ত মহারাজেরও?
রাজ্যসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসাবে রাহুলের নাম মঙ্গলবার ঘোষিত হয়েছে। বিধানসভায় এই মুহূর্তে বিজেপির যা আসনসংখ্যা, তাতে নাটকীয় কোনও মোচড় না তৈরি হলে রাহুলের সাংসদ হওয়া পাকা। জীবনে কখনও কোনও নির্বাচনে যিনি জেতেননি, তিনি সরাসরি দেশের আইনসভার উচ্চকক্ষে যাচ্ছেন। বিজেপির একাংশের মতে, রাহুল যে সময় থেকে বিজেপি করেন, তখন এ রাজ্যে লোকসভা বা বিধানসভা আসন জেতার ক্ষমতা বিজেপির ছিল না। তাই সে সময়ের নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তিতে রাহুলের বিচার হওয়া উচিত নয়। কিন্তু গোটা দেশে বিজেপির সুদিন আসার পরেও রাহুল একাধিক বার টিকিট পেয়েছেন। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে উত্তর কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে তিনি লড়েছিলেন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জোড়াসাঁকো এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হাবড়া আসন থেকে তিনি লড়েছিলেন। প্রত্যেক বারই ওই আসনগুলি বিজেপির জন্য ‘সম্ভাবনাময়’ ছিল। কিন্তু রাহুল একবারও জিততে পারেননি।
এ বার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে প্রথম বারের জন্য সাংসদ হতে চলেছেন। দলের একাংশের বক্তব্য, রাহুলের নাম এ বার বিবেচিত হচ্ছিল ঠিকই। কিন্তু তাতে সিলমোহর পড়েছে বিজেপির আর এক সাংসদের কাজকর্মে। তিনি অনন্ত মহারাজ।
২০২৩ সালে প্রথম বার পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাউকে নির্বাচনে জিতিয়ে রাজ্যসভায় পাঠানোর সুযোগ আসে বিজেপির সামনে। রাজ্য নেতৃত্বকে চমকে দিয়ে রাজবংশী সংগঠনের নেতা নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজকে বিজেপি টিকিট দেয়। অনন্ত মসৃণ পথেই রাজ্যসভায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তার পর থেকে বার বারই বিজেপির পথ ‘অমসৃণ’ করে তুলেছেন। পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে কোচবিহার বা উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করার দাবিতে কখনও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন। তাঁর ‘অনুগামী’ হিসাবে পরিচিত বিজেপি বিধায়ক (কালিয়াগঞ্জ) সৌমেন রায় তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। অনেকের দাবি, তা অনন্তের অঙ্গুলিহেলনেই হয়েছিল। পরে দলে সৌমেনের প্রত্যাবর্তনও একই কারণে বলে অনেকে মনে করেন। কখনও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের প্রাসাদে সাদরে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু দলের জন্য সাম্প্রতিকতম অস্বস্তিটি অনন্ত তৈরি করেছেন মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান গ্রহণ করে।
অনন্তের এ হেন কার্যকলাপে রাজ্য বিজেপির চেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে। কারণ, অনন্ত ‘দিল্লির পছন্দ’ হিসাবেই টিকিট পেয়েছিলেন। টিকিট দেওয়ার আগে রাজ্য নেতৃত্বের মতামত ঠিকমতো নিলে এমন ‘অপ্রস্তুত’ অবস্থা তৈরি হত না-বলে দলের অন্দরে অনেকে মুখ খুলতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তী রাজ্যসভা নির্বাচনেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন। সক্রিয় হয়েছিল আরএসএস-ও। তাই ২০২৫ সালে টিকিট দেওয়া হয়েছিল শমীককে। তৃতীয় বারের প্রার্থী নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, প্রথম বারের প্রার্থী বাছাইয়ের জেরে পাওয়া অনন্ত-শিক্ষা এখনও ভোলেনি দিল্লি। তাই এ বারও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজ্য নেতৃত্বের মতামতেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হল।
টিকিট পাওয়ার পরে রাহুল বলেছেন, ‘‘দলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন, হয়তো দায়িত্ব পাচ্ছেন না, তাঁদের কাছে বার্তা গেল যে, দল সকলের দিকেই নজর রাখছে।’’ তাঁর টিকিট পাওয়ার নেপথ্যে রাজ্য সভাপতি শমীকের ভূমিকাই যে মুখ্য ছিল, সে কথাও রাহুল বোঝানোর চেষ্টা করেছেন প্রকাশ্য মন্তব্যেই। বলেছেন, ‘‘এর আগের বার যখন শমীক ভট্টাচার্য রাজ্যসভার টিকিট পেলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, তিনি না-পেয়ে রাহুল সিংহ টিকিট পেলে তিনি বেশি খুশি হতেন। এটাই বিজেপি। শমীক ভট্টাচার্যের পাওয়া আর রাহুল সিংহের পাওয়া একই ব্যাপার।’’
এর পরের মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের নানা বিষয় রাজ্যসভায় তুলে ধরার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অনন্তের নাম এড়িয়ে গিয়েছেন রাহুল। বলেছেন, ‘‘আমি একা নই। আমার সঙ্গে শমীকও রয়েছেন। আমার সঙ্গে অন্যান্য সাংসদও রয়েছেন। সকলে মিলেই পশ্চিমবঙ্গের কথা তুলে ধরতে পারব।’’ উত্তরবঙ্গের এক বিজেপি নেতা সে কথা শুনে রসিকতার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করছেন, ‘‘অনন্ত মহারাজের নামটা রাহুল’দা উচ্চারণ করলেই বরং ভাল করতেন। মহারাজ যে খেল্ দেখিয়েছেন, তা না-দেখলে কি দিল্লি শমীক’দা-রাহুল’দার মতো আদি নেতাদের এতটা গুরুত্ব দিত?’’