বাঁ দিকে, পড়ুয়া ও কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছেন জেলাশাসক। ডান দিকে, হস্টেল ছাড়ছেন অনেকে। ছবি: বিকাশ মশান।
কলেজে কিছু নিয়মনীতি চালু করার প্রতিবাদে অধ্যক্ষ-সহ বেশ কিছু শিক্ষককে রাতভর ক্যাম্পাসে আটকে রাখলেন পড়ুয়ারা। দুর্গাপুরের এক বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শনিবার শেষমেশ জেলাশাসক সৌমিত্র মোহনের হস্তক্ষেপে ঘেরাওমুক্ত হন তাঁরা। পড়ুয়াদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনার জন্য প্রশাসনের মধ্যস্থতায় কমিটি গড়া হবে বলে জানান জেলাশাসক।
শিক্ষাঙ্গনে দাবি আদায়ের নামে লাগাতার ঘেরাও অনুচিত, সম্প্রতি বারবারই বার্তা দিয়েছেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। শনিবার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এই ঘটনা নিয়েও তিনি বলেন, ‘‘এ ধরনের আন্দোলন থেকে ছাত্রদের বিরত থাকা উচিত। তাদের কোনও রকম অসুবিধে হলে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারে। কিন্তু কলেজের নিয়ম ভাঙবে কেন?’’ কলেজ কর্তৃপক্ষকে তাঁর পরামর্শ, ‘‘এই ধরনের আন্দোলনের কাছে কোনও ভাবে মাথা নত করবেন না।’’
ফুলঝোড়ের ওই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রশ্নে কিছু কড়াকড়ি করা হয়েছে। যেমন, সকাল ১০টার মধ্যে ক্যাম্পাসে ঢুকতে হবে। কলেজে নির্দিষ্ট পোশাক পরে আসা বাধ্যতামূলক। ন্যূনতম ৭৫ শতাংশ হাজিরা থাকতে হবে। কিন্তু এ সব নিয়ে পড়ুয়াদের অনেকেরই আপত্তি রয়েছে। ১০ অগস্ট কলেজ কর্তৃপক্ষ নোটিস দেন। পর দিন জনা পাঁচেক ছাত্র দেরি করে কলেজে ঢুকতে গেলে গেটে আটকে দেন কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষীরা। তা নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে বচসা থেকে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। রক্ষীদের অভিযোগ, ওই পড়ুয়ারা তাঁদের মারধর করেন। পড়ুয়াদের পাল্টা অভিযোগ, রক্ষীরাই তাঁদের গায়ে হাত তোলেন।
এই ঘটনা নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পড়ুয়াদের টানাপড়েন শুরু হয়। পড়ুয়ারা দাবি করেন, সকাল ১০টার মধ্যে সবার পক্ষে কলেজে আসা সম্ভব নয়। অনেকেই বাইরে থেকে বাসে, ট্রেনে চড়ে আসেন। তাই দেরি হয়ে যেতেই পারে। সেক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নিয়ম নিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। এর সঙ্গে হস্টেলে উপযুক্ত পরিষেবা না মেলার অভিযোগ যোগ করে ক্লাস বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন পড়ুয়ারা। শুক্রবার কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেন, ক্লাস না করলে হস্টেল ফাঁকা করে দিতে হবে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা হস্টেল ছাড়তেও নারাজ।
শুক্রবার দুপুর থেকে কলেজে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন পড়ুয়ারা। তাঁদের অভিযোগ, হস্টেলে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে দফায়-দফায়। হস্টেলের আবাসিকদের দাবি, মোট পড়ুয়ার সামান্য অংশই হস্টেলে থাকেন। তাই ক্লাস বয়কটের দায় শুধু তাঁদের ঘাড়ে চাপিয়ে হস্টেল ফাঁকা করার নির্দেশ ও পরিষেবা বন্ধ করা অনৈতিক। বিকেলে শিক্ষকেরা ক্যাম্পাস থেকে বেরোতে গেলে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুলিশ-প্রশাসনকে জানান। সন্ধ্যায় মহকুমাশাসক (দুর্গাপুর) শঙ্খ সাঁতরা কলেজে গিয়ে পড়ুয়া ও কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দফায়-দফায় বৈঠক করেন। কিন্তু শেষমেশ আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় মহকুমাশাসক ফিরে যান। কিন্তু পড়ুয়াদের বাধায় কলেজেই আটকে থাকেন অধ্যক্ষ অমিতাভ সিংহ ও বেশ কিছু শিক্ষক।
অধ্যক্ষ জানান, তাঁদের বের করে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তা করতে গিয়ে যাতে পড়ুয়াদের সঙ্গে পুলিশ কোনও রকম গোলমালে না জড়ায়, সেই আর্জিও জানানো হয়। পড়ুয়াদের বাধায় সারা রাতই শিক্ষকদের আটকে থাকতে হয় কলেজে। অভিযোগ, রাতে শিক্ষকদের কোনও খাবার পাঠাতে দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় ওষুধ পাঠানোর চেষ্টা হলেও গেটে আটকে দেওয়া হয়। অধ্যক্ষ বলেন, ‘‘রাতে খাবার পাইনি। ওষুধও পাইনি।’’
শনিবার সকালে ফের কলেজে যান মহকুমাশাসক। দুপুরে পৌঁছন জেলাশাসক। তিনি খোলা জায়গায় সবার উপস্থিতিতে আলোচনার পরামর্শ দেন। সেই মতো বৈঠক শুরু হয়। সবার বক্তব্য শোনার পরে জেলাশাসক জানান, সব পক্ষের বক্তব্য খতিয়ে দেখতে কলেজ কর্তৃপক্ষ, পড়ুয়া ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গড়া হবে। বুধবার সেই কমিটি আলোচনায় বসবে। ঘেরাওমুক্ত হওয়ার পরে অধ্যক্ষ অমিতাভবাবু বলেন, ‘‘মঙ্গলবার থেকে পড়ুয়াদের কলেজে আসতে বলা হয়েছে। ক্লাস বন্ধ করে কোনও রকম আন্দোলন বরদাস্ত করা হবে না।’’ কলেজের চেয়ারম্যান দুলাল মিত্র বলেন, ‘‘শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনও আপস করা যাবে না। যে নিয়ম করা হয়েছে তা পালন করতে হবে।’’