সুরঞ্জন দাস ও অভীক মজুমদার
১৬ অগস্ট, ‘আখর বেঙ্গল’-এর সাম্প্রতিকতম অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়ে গেল ‘দ্য কনক্লেভে’। আয়োজক ছিল প্রভা খৈতান ফাউন্ডেশন এবং পূর্ব ও পশ্চিম। সহযোগির ভূমিকায় ছিল শ্রী সিমেন্ট লিমিটেড। এবং ডিজিট্যাল পার্টনার হিসেবে ছিল আনন্দবাজার অনলাইন। এই অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ও অ্যাডামাস ইউনিভার্সিটির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক সুরঞ্জন দাস। তাঁর সঙ্গে কথা বলেন অধ্যাপক অভীক মজুমদার। আলোচিত হয় ভারতের স্বাধীনতা, দেশ ভাগ, শিক্ষা ব্যবস্থা-সহ আরও বিভিন্ন বিষয়।
‘ইনক্লুসিভ নাগরিক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা’
বিদেশ ও ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য কি? এবং ভারতের শিক্ষা প্রণালীতে কি কোনও ঘাটতি রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে, সুরঞ্জন দাস বলেন, পশ্চিমের দেশগুলিতে মৌলিক চিন্তার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিগুলি সম্পর্কে উনি বলেন,
“পিএইচডি করার পর আমি কিছু দিন অক্সফোর্ডে পড়াই। এখনও আমি এক্সেটার ইউনিভার্সিটির এক জন অনারারি প্রফেসর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসরও আমি। আমার মনে হয়, বিদেশের ইউনিভার্সিটিগুলিতে – যার মধ্যে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটিগুলি বিশেষভাবে উল্লেখ্য — মৌলিক চিন্তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এখানে সেটা হয় না। এখানে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের চামচে করে খাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের লেক্চারের নোট দিয়ে থাকি। সেগুলি তারা মুখস্ত করে। এবং যে সেগুলিকে সবচেয়ে নির্ভুল ভাবে উপস্থাপন করতে পারে, পরীক্ষায় সেই সবচেয়ে ভাল করে।”
আরও একটা বিষয় হল, শৃঙ্খলা। এখানে সময়সীমা অনির্দিষ্ট কালের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। সেখানে, অ্যাকাডেমিক বা শিক্ষা সংক্রান্ত সময়সূচি, সেমেস্টার শুরু হওয়ার সময়ই দিয়ে দেওয়া হয়। পড়ুয়া অথবা শিক্ষক, কেউই সেটিকে অবজ্ঞা বা লঙ্ঘন করতে পারেন না। ছাত্রছাত্রী ও প্রফেসরদের মধ্যে সম্পর্কও খুব অন্য রকম। তাতে যে শুধু সম্মান দেখানো হয় তাই নয়, সেই সম্পর্ক বেশ ঘরোয়া বা বন্ধুত্বপূর্ণ বলা চলে। ছাত্ররা প্রশ্ন করলে, প্রফেসরদের ভাল লাগে। সেখানে লাইব্রেরির চাহিদা বেশি। এখানে পড়ুয়া ও প্রফেসর, উভয়ের মধ্যেই লাইব্রেরিতে যাওয়ার রেওয়াজটা কমে গেছে।”
“শিক্ষা প্রদানের প্রক্রিয়াটা শিক্ষক-কেন্দ্রিক নয়, সেটি পড়ুয়া-কেন্দ্রিক। আমরা কি তার জন্য প্রস্তুত আছি? প্রযুক্তির দাস না হয়েও আমরা জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি। যেমনটা বিদেশে ইতিমধ্যেই হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হল ইনক্লুসিভ নাগরিক তৈরি করা। তাদেরকে শুধু কাজের জন্য প্রস্তত করা নয়,” বলেন প্রফেসর দাশ।
‘স্বাধীনতা দিবস এখন অনেক বেশি কার্যক্রম সমৃদ্ধ’
“বড় হওয়ার সময় আমরা যেমনটা দেখে ছিলাম, তার তুলনায় এখন স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনেক বেশি কার্যক্রম সমৃদ্ধ। স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্য অটুট আছে, কিন্তু আমাদের প্রকাশভঙ্গি বদলে গেছে। এখন উদযাপনের পদ্ধতিটা যান্ত্রিক হয়েছে। আগে, প্রতিটি স্বাধীনতা দিবসে, স্বাধীনতার ধারণা সম্পর্কে সুচিন্তিত মূল্যায়ন করা হত। কিন্তু তার জন্য আমি যুব সমাজকে দোষ দিই না। এটা হয়েছে ধনতন্ত্র আর ভোগবাদের কারণে। এর পেছনে আছে বিশ্বায়ন। যার দৃষ্টি বাজার-চালিত অর্থনীতি ও ব্যক্তি সত্তার ওপর নিবিষ্ট,” বলেন সুরঞ্জন দাশ।
আগে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গল্প শোনানো হত বাচ্চাদের। সাম্প্রতিক কালে তা কমে এসেছে, বলেন অভীক মজুমদার। এই বিষয়ে দাশ বলেন, অন্যান্য দেশে, গুরুত্বপূর্ণ দিন উদযাপনের সময়, বিষয়টির ফিল্ম অবশ্যই দেখানো হয়। যুব সমাজকে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে আরও আগ্রহী ও সচেতন করে তোলার জন্য আমাদের দেশেও এই প্রথা চালু করা যেতে পারে।
‘দেশ ভাগ অপরিহার্য ছিল না, কিন্তু বাস্তবে পরিণত হয়’
অভীক মজুমদার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ১৫ই অগস্টকে একই সঙ্গে উৎসবের ও বেদনার দিন হিসেবে বর্ণনা করা যায়। বিষয়টিকে আরও বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করেন সুরঞ্জন দাস। উনি বলেন, দেশ ভাগ অনিবার্য ছিল না, কিন্তু তা বাস্তবে পরিণত হয়। “দেশ ভাগের ফলে, বাংলা ও পঞ্জাব বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হয়। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, অনেকগুলি সম্ভাবনা ছিল। দেশ ভাগের ঠিক আগে, ‘গ্রেটার বেঙ্গল মুভমেন্ট’ বা বৃহত্তর বাংলা আন্দোলন সংগঠিত হয়। সেই কারণে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন দেশ ভাগ অনিবার্য ছিল না। আমাদের বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার যে, এক সাম্প্রদায়িক সত্তা কেন আমাদের জাতীয় সত্তার ওপর আধিপত্য কায়েম করতে সক্ষম হল। সেটা যদি আমরা বুঝতে পারি, তাহলে দেশ ভাগ কেন হল, আমরা তা বুঝতে পারব। পার্টিশন বা দেশ ভাগ বাদ দিয়ে আমরা ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার কথা ভাবতে পারি না।
‘যে সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও আধুনিক মানুষ নেহরু হতে চেয়ে ছিলেন, তিনি তা হতে পারেন নি’
তাঁর বই ‘দ্য নেহরু ইয়ার্স ইন ইন্ডিয়ান পলিটিক্স’ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে, দাশ বলেন, নেহেরু ছিলেন একজন “আইট-অ্যান্ড-আউট” বা আদ্যপান্ত সমাজতন্ত্রী। “যখন প্রথম শিল্পনীতি রচনা করা হয়, তখন বলা হয়, ভারতের অর্থনীতি হবে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের। সেটি হবে বেসরকারি ও রাষ্ট্রচালিত অর্থনীতির সংমিশ্রণ। কিন্তু দেখা গেল, দেশের জিডিপি-তে প্রাইভেট সেক্টরের অবদানই সব চেয়ে বেশি। উনি বলেছিলেন, একই ব্যক্তি একই সঙ্গে কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। কিন্তু তিনিই দু’বার একাধারে কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকেন। তাঁরই আমলে ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন অ্যাক্ট’ চালু করা হয়। পরে তিনি স্বীকার করেন, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এমনটা হওয়ার আরও একটা কারণ হল, পশ্চিমের চিন্তাভাবনা তিনি বেশি পছন্দ করতেন। যদিও তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা। কিন্তু তাঁর জমানাতেই ধর্মীয় দিনগুলিকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এবং তাঁর সংসদের অনেক সদস্যই মন্দির উদ্বোধন করতে যেতেন। এবং আমরা যে স্বাধীনতা পেলাম, আন্তোনিও গ্রামসি’র ভাষায় তা হল, “প্যাসিভ রেভোলিউশন”। রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে ঠিকই, কিন্তু কোনও অর্থনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বদল ঘটে না। কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। এবং তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারাই নেহরুর ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়,” বলেন অধ্যাপক দাস।
“প্রফেসর সুরঞ্জন দাসের মতো একজন খ্যাতি সম্পন্ন ইতিহাসবিদকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে আমরা নিজেদের সৌভগ্যবান মনে করছি। তাছাড়া, প্রফেসর অভীক মজুমদারের মতো একজন সুপরিচিত কবি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের উপস্থিতির কারণেও আমরা চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা আমাদের সমৃদ্ধ করেছে।”
সৌমিত্র মিত্র, নাট্য ব্যক্তিত্ব
“দেশ ভাগের পরবর্তী সময়টা আমরা দেখিনি। কিন্তু পঞ্জাব ও বাংলার মানুষ সম্পর্কে উনি যা আলোচনা করলেন তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শরণার্থী শিবিরে থাকার সময় আমার বাবার দলিলগুলি আমি দেখেছি। আমি এও দেখেছি যে, তিনি আজীবন নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়ে ছিলেন। স্বাধীনতা উদযাপনের মধ্যে দিয়ে দেশ ভাগের যন্ত্রণার কথাও স্মরণ করা উচিত।
স্বাতী দাশ, নৃত্য শিল্পী ও অভিনেত্রী