ফের পিছোল সাক্ষ্য, কাঠগড়ায় পুলিশই

দিন নির্দিষ্ট ছিল। হাজির ছিলেন সাক্ষীও। তার পরেও ফের পিছিয়ে গেল সাব-ইনস্পেক্টর অমিত চক্রবর্তী হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া। উল্টে সাক্ষীদের তালিকায় দেখা গেল নিহতেরও নাম!

Advertisement

দয়াল সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:৫৭
Share:

তপন গোস্বামী। —নিজস্ব চিত্র

দিন নির্দিষ্ট ছিল। হাজির ছিলেন সাক্ষীও। তার পরেও ফের পিছিয়ে গেল সাব-ইনস্পেক্টর অমিত চক্রবর্তী হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া। উল্টে সাক্ষীদের তালিকায় দেখা গেল নিহতেরও নাম!

Advertisement

গোটা ঘটনায় আরও একবার কাঠগড়ায় বীরভূম জেলা পুলিশ। নিশানায় পুলিশ এবং সরকারি আইনজীবীর সমন্বয়ের অভাবও। সোমবার সিউড়ি আদালতে মামলার শুনানিতে হঠাৎ-ই ধরা পড়ল, সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারিত হয়ে গেলেও ধৃত এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এখনও চার্জই গঠিত হয়নি! তাই মামলা শুরুই করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিলেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য। মামলার সরকারি আইনজীবী তপন গোস্বামীর কথায়, ‘‘এই মামলার চার্জ গঠিত হওয়ার পরে পুলিশ শেখ দুলাল নামে আরও এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। কিন্তু, তাঁর বিরুদ্ধে চার্জ গঠিত হয়নি। সকলের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন না হলে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা সম্ভব নয়। তাই বিচারক এই সিদ্ধান্ত নেন।’’

ঘটনা হল, দেড় বছর হয়ে গেল সাব-ইনস্পেক্টর পদ মর্যাদার এক জন পুলিশ অফিসার খুন হয়েছেন। কিন্তু তাঁর খুনে বিচার পাওয়া নিয়ে প্রথম থেকেই নানা ‘সমস্যা’ ও ‘টালবাহানা’র যেন অন্ত নেই। তা অভিযুক্তদের গ্রেফতার করার ক্ষেত্রেই হোক বা সরকারি আইজীবীর তরফে অভিযুক্তদের নাম প্রত্যাহারের আবেদন জানানোই হোক কিংবা এমন অসম্পূর্ণ চার্জ গঠন— প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই মামলায় পুলিশ-সরকারি আইনজীবীরা ঠিক দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষিতেই খোদ সরকারি আইনজীবী রণজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেই অনাস্থা জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন নিহতের স্ত্রী। যার জেরে চাপের মুখে নিজেকে সরিয়েও নিতে হয়েছে ওই আইনজীবীকে। এ দিন আবার সাক্ষীদের যে তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশ, সেখানে নিহত অমিতের নাম রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন অভিযুক্তপক্ষের আইনজীবীরা। অমিতের পরিবার এবং আইনজীবীদের একাংশের প্রশ্ন, এমন সংবেদনশীল একটি মামলা বারবার হোঁচট কেন খাচ্ছে? পুলিশ এবং সরকারি আইনজীবী কোনও ভাবেই তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না বলেই তাঁরা মনে করছেন।

Advertisement

২০১৪ সালের ৩ জুন দুবরাজপুরের যশপুর পঞ্চায়েতের আউলিয়া গোপালপুর গ্রামে তৃণমূল-সিপিএম সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে দুষ্কৃতীদের ছোড়া বোমা/ মারাত্মক জখম হয়ে পরে মৃত্যু হয় দুবরাজপুর থানার টাউনবাবু অমিত চক্রবর্তীর। ৫০ জনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা করে পুলিশ। অভিযুক্তদের তালিকায় নাম ছিল শাসকদলের যশপুরের অঞ্চল সভাপতি তথা দুবরাজপুর পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ আলিম শেখ-সহ এলাকার প্রায় ৩০ জন শাসকদলের কর্মী-সমর্থকের। নাম ছিল সিপিএমের জোনাল নেতা সৈয়দ মকতুল হোসেন-সহ বেশ কিছু সিপিএম কর্মী-সমর্থকেরও। সম্প্রতি চার্জশিটে নাম থাকা আলিম-সহ ৩৬ জনকে ‘নিরপরাধ’ বলে দাবি করে তাদের নাম ওই মামলা থেকে বাদ দেওয়ার আর্জি আদালতে জানান রণজিৎবাবু। প্রবল সমালোচনার পরে সেই আবেদন প্রত্যাহার করে নিলেও তখন থেকেই রণজিৎবাবুর উপর অনাস্থা জন্ম নেয় নিহতের পরিবারের মধ্যে। জেলাশাসকের কাছে তাঁর বদলি চাওয়ার পরেই নিজেই মামলা থেকে সরে দাঁড়ান রণজিৎ।

ইতিমধ্যেই ১৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠিত হয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণ হওয়ার কথা ছিল গত ১৫-১৭ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু, সরকারি আইনজীবী ছাড়া মামলা চালানো সম্ভব নয়। তাই ওই দু’দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ বাতিল করে বিচারক ফের ২২-২৪ ফেব্রুয়ারির তারিখ দিয়েছিলেন। সেই মতো এ দিন মূল অভিযোগকারী (দুবারজপুর থানার তৎকালীন ওসি) ত্রিদীপ প্রামাণিক সাক্ষ্য দিতে হাজিরও হয়েছিলেন। জেলাশাসকের নির্দেশে রণজিৎবাবুর পরিবর্তে এই মামলার বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি হিসাবে তপন গোস্বামীও হাজির ছিলেন। কিন্তু এ দিনের শুনানিতেই প্রথম ধরা পড়ে শেখ দুলাল নামে এক ধৃতের বিরুদ্ধে এখনও চার্জই গঠিত হয়নি। তপনবাবু এ দিন বলেন, ‘‘চার্জগঠনের পরপরই গত ২২ জানুয়ারি ওই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে দুবরাজপুর থানার পুলিশ। কিন্তু তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়নি। বিচারক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আজ মঙ্গলবারই চার্জ গঠন করা হবে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের জামিন নিয়েও শুনানি হবে।’’ আর তার পরেই সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন নির্ধারিত করা হবে তিনি জানিয়েছেন। যদিও ধৃত দুলালের বিরুদ্ধে কেন এত দিনেও চার্জ গঠন করা হয়নি, তার সদুত্তর কেউ-ই দিতে পারেননি।

এ দিকে, এ দিনও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু না হওয়ায় ক্ষুব্ধ অমিতের পরিবার। তাঁর স্ত্রী পুতুল সরকার চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘কেন যে এমনটা হচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি না। কখনও চার্জ গঠন হচ্ছে না, কখনও সাক্ষীদের তালিকায় আমার স্বামীর নাম রেখে দেওয়া হচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি। অভিযুক্তদের ধরার ব্যাপারেও একই রকম গাফিলতি দেখিয়েছে পুলিশ। কবে যে বিচার পাব, তা ঈশ্বরই জানেন!’’ এমন টালবাহানা চলতে থাকলে অভিযুক্তেরা যে কোনও দিন জামিন পেয়ে যেতে পারেন বলেও অমিতের পরিবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। গোটা ঘটনায় অখুশি অভিুক্তদের পরিজনেরাও। উদ্বিগ্ন অভিযুক্তদের জামিনের আবেদনের আর্জি জমা দিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা আইনজীবীরাও।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement