শিল্পে খরা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা। এ বার তাই রাজস্ব আদায়ে মন্দভাগ্য অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের।
নবান্নের খবর, ২০১৫-’১৬ আর্থিক বছরের প্রথম ন’মাসে (ডিসেম্বর পর্যন্ত) রাজস্ব আদায়ে মূল্যযুক্ত কর (ভ্যাট), আবগারি শুল্ক কিংবা স্ট্যাম্প ডিউটির মতো কোনও ক্ষেত্রেই লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি অর্থ দফতর। ফলে দেনার দায়ে ডুবে থাকা অমিতের অভাবের সংসারে এ বারও নুন আনতে ভাত ফুরনোর দশা। কর্তাদের আশঙ্কা, ‘‘আর্থিক ঘাটতি এ বার আগেকার সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ, হাতে তিন মাস সময় থাকলেও রাজ্য জুড়ে ভোটের বাদ্যি বেজে গিয়েছে। নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগে নবান্নের কর্তারা এখন নিত্য-নতুন প্রকল্প ঘোষণায় ব্যস্ত। ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে নেওয়ার তাগিদটাই নেই।’’
অর্থমন্ত্রীর বরাবরের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর গত চার বছরে রাজ্যের রাজস্ব সংগ্রহ দ্বিগুণ হয়েছে। রেকর্ড হারে বেড়েছে নিজস্ব আয়। কিন্তু চলতি আর্থিক বছরের ছবিটা একেবারে উল্টো। হাজার চেষ্টা করেও কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া সম্ভব হয়নি। বাকি তিন মাসে অবস্থার বিরাট বদল হবে— এমনটা মনে করছেন না কেউই।
গত বাজেটে ১৬.৫% হারে কর আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বাণিজ্য কর (অর্থাৎ ভ্যাট, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বিক্রয় কর, পণ্য প্রবেশ কর, বৃত্তি কর এবং কয়লা ও পেট্রোল-ডিজেলের উপরে সেস) আদায় বেড়েছে মাত্র ১১%। গোটা বছরে ২৯ হাজার কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ডিসেম্বর পর্যন্ত আদায় আটকে রয়েছে ১৯ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকায়। বাকি তিন মাসে ১০ হাজার কোটি আদায় বেশ কঠিন কাজ বলেই মনে করছেন কর কর্তারা। বাণিজ্য কর কমিশনার বিনোদ কুমার অবশ্য এখনও আশাবাদী। তিনি বলেন,‘‘অক্টোবর-নভেম্বরে আদায় আরও কম ছিল। জানুয়ারি মাসে ২৫% বৃদ্ধি হয়েছে। আশা করছি, আর্থিক বছর শেষে আরও আদায় হবে।’’
বাণিজ্য কর-কর্তাদের একাংশের বক্তব্য, জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে প্রতি বছর স্বাভাবিক ভাবেই ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু শিল্পে বৃদ্ধির আশায় যে পরিমাণ বাড়তি কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেটাই পূরণ হয়নি। অর্থনীতির সাধারণ নিয়মই হল, যে রাজ্যে বিনিয়োগ যত বেশি, সেখানে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণও তত বেশি। মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, গুজরাত, অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রে ধারাবাহিক বিনিয়োগ হচ্ছে। তাই সারা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে একটা মন্দা ভাব থাকা সত্ত্বেও তাদের ভ্যাট আদায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। আর পশ্চিমবঙ্গে কর আদায় কমতে থাকায় রাজস্ব ঘাটতি বেড়েই চলেছে। কর কর্তাদের কথায়, ‘‘ভ্যাট, পণ্য প্রবেশ কর, পেট্রোলের সেস এবং কয়লার সেস সংগ্রহে বৃদ্ধির হার থেকেই বোঝা যায় রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি। নতুন কলকারখানা হলে বা চালু শিল্পকে ঘিরে কাজকর্ম জোরদার থাকলে এই সমস্ত করের আদায়ও বেড়ে যায়। তা না হলেই বুঝতে হবে রাজ্যের শিল্পের হাল খারাপ। এ রাজ্যে এমনকী ব্যবসা-বাণিজ্যেও তেমন বলার মতো কিছু নেই। তাই কর সংগ্রহের বৃদ্ধির হারও এ বার কমছে।’’
বাণিজ্য কর বিভাগ সূত্রের মতে, শিল্পচিত্রের অন্যতম রসদ হচ্ছে কয়লা। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কারখানার জ্বালানি হিসাবে কয়লার ব্যবহার থেকেই বোঝা যায় শিল্পে একটি রাজ্যে অবস্থা কেমন। আর যে রাজ্যে যত বেশি কয়লা বিক্রি হয়, তার সেস আদায়ও তত বেশি। পশ্চিমবঙ্গে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কয়লা সেস জমা পড়েছে ১১৬৫ কোটি টাকা। এ বছর মাত্র ৮৬ কোটি টাকা বেড়ে তা হয়েছে ১২৫২ কোটি টাকা। এক কর্তার কথায়, ‘‘এই পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট, বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়েনি। কারণ নতুন শিল্পের দেখা নেই।’’
শুধু কয়লা নয়, উৎপাদন এবং পরিকাঠামো শিল্পের আরও বড় উপাদান ইস্পাত ও সিমেন্ট থেকেও ভ্যাট আদায় কমে গিয়েছে বলে বাণিজ্য কর কর্তারা জানিয়েছেন।
তাঁদের কথায়, ‘‘চালু শিল্প থেকে ভ্যাট আদায় কম হওয়াটা সবচেয়ে বেশি চিন্তার। যার অর্থ, এ রাজ্যের শিল্প সংস্থাগুলি তাদের উৎপাদিত শিল্প এ রাজ্যের বাজারে বিক্রি
করতে পারছে না।’’ ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জেরে রাজ্যের বাসিন্দাদের রোজগারে ঘাটতিই এর কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই ধারণা জোরদার হয়েছে আবগারি রাজস্ব খাতে আদায় কম হওয়া থেকেও। একে তো সামনেই ভোট বলে গত দেড় বছরে নতুন কোনও মদের দোকান খোলার লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। তার ওপর ‘‘মানুষের হাতে টাকা থাকলে তবেই সে বিলাসিতায় খরচ করে। না হলে কে আর মদ খাবে? এ বার তাই বাজেটের ঘোষণা মতো ৪৪১৮ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ কার্যত অসম্ভব।’’ মন্তব্য দফতরের এক আধিকারিকের।
রাজ্যে শিল্প নেই। ফলে আসছে না কাঁচামালও। তার জেরে পণ্য প্রবেশ কর আদায়েও ভাটার টান। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৮২ কোটি টাকা পণ্য প্রবেশ কর আদায় হয়েছিল। এ বার তা সামান্য বেড়ে হয়েছে ৫৯৬ কোটি।
অর্থ দফতরের কর্তাদের মতে, বাজারের পরিস্থিতি কেমন তা বোঝার আরও একটি উপায় হচ্ছে স্ট্যাম্প ডিউটি এবং রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ আদায়। জমি-বাড়ি যত বেশি কেনা-বেচা হবে, ততই বাড়বে এই খাতে আয়। ২০১৫-’১৬ বাজেটে ৪৫৯৭ কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে এই খাতে।এক কর্তার কথায়, ‘‘সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেটাও পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে না।’’
কেন? কর্তাদের একাংশের ব্যাখ্যা, কলকারখানা হচ্ছে না। রাজ্যে একমাত্র প্রোমোটারি আর ইমারতি দ্রব্যের কারবারেরই রমরমা চলছিল। কিন্তু সিন্ডিকেট, তোলাবাজির কারণে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে নতুন আবাসন প্রকল্পে উৎসাহ হারিয়েছেন অনেকেই। বিশেষজ্ঞ সংস্থা নাইট ফ্র্যাঙ্কের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের প্রথম আটটি শহরের মধ্যে আবাসন শিল্পে কলকাতার হাল সবচেয়ে খারাপ। গত বছর প্রথম ছ’মাসে সবচেয়ে কম ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে কলকাতায়। মাত্র ৫৮৮৩টি। ওই একই সময়ে বেঙ্গালুরুতে বছরের ২২,২৩৪টি, মুম্বইয়ে ২৮,৪৪৬টি এবং দিল্লিতে ১৪,২৫০টি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। ফ্ল্যাট বিক্রি কম হওয়ার কারণে স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ রোজগারও তেমন বাড়ছে না।
বাণিজ্যিক কারণে জায়গা নেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ছবি। বিশেষজ্ঞ সংস্থা জোনস লাং ল্যাসেলের রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছর দেশ জুড়ে মোট ৩৫ কোটি বর্গ ফুট অফিস স্পেস নিয়েছে কপোর্রেট মহল। ২০১৪ সালের তুলনায় যা ১৭ শতাংশ বেশি। মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু থেকে হায়দরাবাদ, চেন্নাই শহরে বাড়ছে অফিস তৈরির জায়গার চাহিদা। ব্যতিক্রম শুধু কলকাতা। চাহিদা বাড়া তো দূর অস্ত্। উল্টে ৩০ শতাংশ কমেছে।
একই সঙ্গে ফাঁকা পড়ে থাকা অফিসের জায়গা এ শহরে সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞ সংস্থা কুশম্যান অ্যান্ড ওয়েকফিল্ডের হিসেব বলছে, কলকাতার ৩৩.২ শতাংশ অফিস স্পেস খালি পড়ে রয়েছে। জোম্যাটো, স্ন্যাপডিল, ফ্লিপকার্টের মতো স্টার্ট-আপ সংস্থাই হোক বা গুগল, কোকাকোলার মতো এক ডাকে চেনা সংস্থা— শহরে এদের অফিস নেই, বা না-থাকার মতো। অথচ দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরুতে এদের হাত ধরেই ব্যবসা করছে নির্মাণ সংস্থারা। দিল্লিতে জোম্যাটো নিয়েছে এক লক্ষ বর্গ ফুট জায়গা। স্ন্যাপডিল সাড়ে চার লক্ষ বর্গ ফুট। গুগল চার লক্ষ বর্গ ফুট। অথচ কলকাতার ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো চিত্র।
সব মিলিয়ে ক্রমেই শুকিয়ে আসছে অমিতবাবুর কোষাগার!
তথ্য সহায়তা: গার্গী গুহঠাকুরতা