রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জনগণমন’ গাওয়ার আগে গাইতে হবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম’। বুধবার এমনই নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল গত জানুয়ারি মাসে। তার পরে আনুষ্ঠানিক ভাবে বুধবার নির্দেশিকা জারি করে অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়ে দিয়েছে, সরকারি অনুষ্ঠানে এ বার থেকে জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’ গাওয়ার আগে গাইতে হবে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’। তার বিধিও স্থির করে দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকা জারির অব্যবহিত পর থেকেই জাতীয় স্তরে বিতর্ক তৈরি হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার এ নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে দিল রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। যে ‘বন্দে মাতরম’-এর সঙ্গে কংগ্রেসি রাজনীতির নাড়ির যোগ, সেই শতাব্দীপ্রাচীন দলও নরেন্দ্র মোদী সরকারের এ-হেন নির্দেশিকাকে ‘বিভাজনের কৌশল’ হিসাবে বর্ণনা করেছে। বিজেপির পাল্টা বক্তব্য, কংগ্রেস-সহ বাকিরা ইতিহাস বিকৃত করছিল। যে বিতর্ক ছিল, এই নির্দেশিকার মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি ঘটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
‘বন্দে মাতরম’-এর বিধি বা সেই সংক্রান্ত নির্দেশিকার একটি বিষয় নিয়েই আপত্তি তুলছে কংগ্রেস, তৃণমূল-সহ বিরোধী দলগুলি। তাদের বক্তব্য, হঠাৎ কেন এখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘জনগণমন’র আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার নির্দেশিকা জারি করা হল? অর্থাৎ, মূল বিতর্কের সূত্রপাত আগে ‘বন্দে মাতরম’ এবং পরে ‘জনগণমন’ নিয়ে। জাতীয় গানের বিধি নিয়ে নয়।
তৃণমূলের তরফে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেন, ‘‘বঙ্কিমচন্দ্রের গরিমা তুলে ধরাতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু এটা করতে গিয়ে আসলে রবীন্দ্রনাথকে ছোট করা হয়েছে।’’ ব্রাত্য আরও বলেন, ‘‘হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি কোনওদিনই রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করে না। কারণ, তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। সারাজীবন সব ধর্ম এবং বর্ণের মধ্যে ঐক্যের চেষ্টা করেছেন। তাঁর লেখাতেও তা বারংবার উঠে এসেছে। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ ওদের অপছন্দের।’’ রাজ্যের আর এক মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য আবার বিজেপিকে খোঁচা দিয়ে বলেছেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন লোকসভায়। যেন চায়ের দোকানে বসতেন! সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতেই এ হেন নির্দেশিকা।’’ ব্রাত্যের কথায়, ‘‘মাস তিনেকের জন্য এই নির্দেশিকা, বাগাড়ম্বর থাকবে। তার পরে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন, তখন এই নির্দেশিকার হদিস কেউ রাখবে না।’’
ব্রাত্যের বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের দিকে তাকিয়েই এমন নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। যেমনটা বলেছেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধীও। প্রিয়ঙ্কা বলেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে ভোট আসছে। সে দিকে তাকিয়েই কেন্দ্রীয় সরকার নম্বর বাড়াতে এই পদক্ষেপ করেছে।’’ আবার প্রাক্তন সাংসদ তথা প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অধীর চৌধুরীর কথায়, ‘‘এ সবের কোনও প্রয়োজনই ছিল না। আসলে বিজেপি তাদের দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতেই এটা করেছে। এই নির্দেশিকা আসলে বিভাজনের কৌশল।’’
পশ্চিমবঙ্গে গত তিনটি বড় নির্বাচনে তৃণমূলের প্রচারের অভিমুখ ছিল ‘বাংলা এবং বাঙালি’। ২০২৬ সালের ভোটেও সেই পথেই হাঁটছে মমতার দল। ভিন্রাজ্যে বাঙালিদের ‘হেনস্থা’, হত্যা, বাংলার প্রতি ‘বঞ্চনা’, মনীষীদের ‘অপমান’ ইত্যাদি নিয়ে উচ্চগ্রামে প্রচার করা হচ্ছে। সমান্তরাল ভাবে বিজেপি সম্পর্কে ‘বাংলা-বিরোধী’ প্রচারেও শান দিচ্ছে তৃণমূল। সেই প্রেক্ষাপটে বুধবার কেন্দ্রের নির্দেশিকার পরে কৌতূহল ছিল, তৃণমূল কী অবস্থান নেয়। কারণ, এ ক্ষেত্রে ‘জনগণমন’ এবং ‘বন্দে মাতরম’— দু’টি গানের রচয়িতাই বাঙালি। কিন্তু বৃহস্পতিবার তৃণমূল তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। শাসকদলের বক্তব্যে স্পষ্ট, তারাও মনে করছে এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে ভোটের আগে বাঙালির মন পেতে।
বঙ্কিমচন্দ্র রচিত দেশাত্মবোধক গান ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন চলছে। ১৮৭৫ সালে লেখা এই গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮২ সালে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম এই গান গেয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’-এর কথা ও ভাবনা। জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি দেশের সংবিধান এই গানকেও সমান মর্যাদা এবং স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এটি গাওয়ার জন্য আলাদা করে কোনও বিধি এত দিন নির্ধারিত ছিল না। নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘বন্দে মাতরম’-এর ছ’টি স্তবক ১৯০ সেকেন্ড (৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড)-এ পরিবেশন করতে হবে। কোন কোন সময়ে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করা বাধ্যতামূলক, তা-ও নির্দিষ্ট ভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রের নির্দেশিকায়। বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকা উন্মোচনের সময়ে, সরকারি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির আগমন এবং প্রস্থানের সময়ে, জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে এবং পরে, সরকারি অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল এবং উপরাজ্যপাল (লেফটেন্যান্ট গভর্নর)-দের আগমন এবং প্রস্থানের সময়ে, কোনও নাগরিক সম্মান বা পুরস্কার দেওয়ার সময়ে এবং কুচকাওয়াজে জাতীয় পতাকা আনার সময়ে জাতীয় গান পরিবেশন বাধ্যতামূলক।
বছর খানেক আগেও সংসদে ‘বন্দে মাতরম’ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিযোগ ছিল, মহম্মদ আলি জিন্নার কথা অনুসরণ করেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরোধিতা করেছিলেন, যাতে মুসলিমরা বিরক্ত না-হন। নির্দেশিকা জারির পরে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাস বিকৃতি’র অভিযোগ তুলছে বিজেপি। পাশাপাশিই, কোনও গান বা তার রচয়িতাকে ‘ছোট করা’ বা ‘বড় করা’ সংক্রান্ত ভাষ্যকেও বিজেপি নস্যাৎ করছে । রাজ্য বিজেপির সভাপতি তথা সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, কংগ্রেস এবং তার গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া তৃণমূল এখন ইতিহাসকে বিকৃত করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানের কোনও অংশকে বা স্তবককে বাদ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে যে দাবি অনেকে করেন, শমীক তা নস্যাৎ করে বলছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথ কোনও অংশ বাদ দেননি। রবীন্দ্রনাথ প্রথম দু’টি স্তবক গেয়েছিলেন। বাকিটা গাওয়া যাবে না, এমন কথা রবীন্দ্রনাথ বলেননি।’’ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরোধিতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে শমীক দাবি করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বসু এই বাদ দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। ১৯৩৭ সালের ২০ ডিসেম্বর উনি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে নেতাজি লিখেছিলেন, আপনি একটু দয়া করে কবিগুরুকে বলুন গান্ধীজির সঙ্গে কথা বলতে। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটিতে আমি একমাত্র বাঙালি। আমি জানি না বন্দে মাতরমের কী ভাগ্য হতে চলেছে।’’ শমীকের তোপ, ‘‘এটা কংগ্রেসের পরিকল্পিত চক্রান্ত। মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণের কারণেই ‘বন্দে মাতরম’কে খণ্ডিত করা হয়েছিল।’’
‘বন্দে মাতরম’ গান নিয়ে বিজেপির অবস্থান বা সরকারি পদক্ষেপ যে নতুন কিছু নয়, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শমীক ১৯৯৪ সালে দিল্লি সরকারের একটি সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘১৯৯৪ সালে একই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মদনলাল খুরানা সমস্ত সরকারি স্কুলে বন্দে মাতরম গানকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন। কংগ্রেস রাস্তায় নেমে বলেছিল, এটা সাম্প্রদায়িক বিভাজনকারী রাজনীতি। সে দিন সৌগত রায়ের বিবৃতি ছিল— বন্দেমাতরম এতটি সাম্প্রদায়িক গান। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন— আমার ভাবলে আশ্চর্য লাগে, কী করে বঙ্কিমচন্দ্রের মতো একজন প্রতিভাবান ঔপন্যাসিক ‘আনন্দমঠ’ রচনা করেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা সদস্য মুজফ্ফর আহমেদ নিজের আত্মজীবনীতে লিখে গিয়েছেন যে, বঙ্কিমের বন্দে মাতরম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘৃণায় পরিপূর্ণ এবং তাঁর মতো একজন একেশ্বরবাদীর পক্ষে এই বন্দে মাতরমকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।’’
কংগ্রেসের অবস্থান, সৌগত বা বুদ্ধদেবের মন্তব্য, মুজফ্ফরের লেখা ইত্যাদি সামনে এনে বিজেপি এখন পাল্টা প্রশ্ন তুলছে। ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে যে ধরনের কথাবার্তা কংগ্রেসিরা এবং বামেরা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন বা লিখেছেন, সেগুলি কি বন্দে মাতরম গানের অপমান নয়? এই সব মন্তব্য বা রচনায় কি তা হলে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ছোট করা হয়নি? এমনই প্রশ্ন বিজেপির। শমীকদের প্রশ্ন, এত দিন ধরে যাঁরা নিজেরাই বঙ্কিমচন্দ্রকে ছোট করে এসেছেন, তাঁকে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা দিয়ে এসেছেন, তাঁদের কাছ থেকে দেশভক্তি শিখতে হবে বিজেপিকে?
বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ তথা দলের অন্যতম ‘বিশিষ্ট’ মুখ স্বপন দাশগুপ্ত বলছেন, ‘‘বিজেপির যে কোনও অধিবেশনে বরাবরই বন্দে মাতরম গাওয়া হয় এবং সম্পূর্ণ গানটিই গাওয়া হয়। সুতরাং বন্দে মাতরম নিয়ে বিজেপির অবস্থান একেবারেই নতুন কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্কই নেই। বন্দে মাতরম রচনার ১৫০ বছর একটা মাইলফলক। তাই এই গানকে তার পূর্ণাঙ্গ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ আমাদের কাছে ছিল। সেই অনুযায়ীই কাজ হয়েছে।’’ বঙ্কিমকে ‘বড় করে’ রবীন্দ্রনাথকে ‘ছোট করা’ সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বপনের মন্তব্য, ‘‘এগুলো ছেলেমানুষের মতো মন্তব্য। এ সবের কোনও উত্তর হয় না। জনগণমন নিয়ে কখনও সে ভাবে বিবাদ ছিল না। কিন্তু বন্দে মাতরম নিয়ে একটা বিতর্ক জিইয়ে রাখা হয়েছিল। সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি করা হল।’’