—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
আবেদন জমা পড়ার হার অত্যন্ত বেশি। তাই বারো দিনের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে পালিয়ে আসাদের নাগরিকত্ব দিতে আরও দু’টি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নিল অমিত শাহের মন্ত্রক। আগের বারের মতোই এ বারেও কমিটিগুলি গড়া হয়েছে কেবল পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ভোটের আগে মতুয়া ও নমঃশূদ্র সমাজের ভোট যাতে বিজেপির পিছন থেকে সরে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই তড়িঘড়ি দু’সপ্তাহের মধ্যে তিনটি কমিটি গঠন করা হল বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে বিরোধীদের অভিযোগ, কমিটি গঠনের কথা বলে মতুয়াদের বোকা বানাচ্ছে বিজেপি।
আগের কমিটির মতোই গত কাল যে দু’টি কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই কমিটির মাথায় থাকবেন এক জন ডেপুটি সেক্রেটারি পদমর্যাদার অফিসার। তাঁকে নিয়োগ করবেন রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং সেন্সাস কমিশনার। এ ছাড়া কমিটির সদস্য হবেন উপসচিব পর্যায়ের এক জন করে ইনটেলিজেন্স ব্যুরো, রাজ্য ইনফর্মেটিক্স সেন্টার, ফরেনার্স রিজিয়োনাল রেজিস্ট্রেশন দফতরের অফিসার। এ ছাড়া কমিটিতে থাকবেন উপসচিব পর্যায়ের পোস্টাল দফতরের এক জন অফিসার। আমন্ত্রণমূলক সদস্য হিসেবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি বা অতিরিক্ত মুখ্যসচিব পর্যায়ের কোনও আমলা থাকবেন। এ ছাড়া রেলের ডিআরএম পর্যায়ের কোনও অফিসার।
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ বনগাঁ ও দক্ষিণ নদিয়ায় মতুয়া ও নমঃশূদ্র সমাজের বড় অংশের নাম বাদ পড়ায় রীতিমতো অস্বস্তিতে বিজেপি নেতৃত্ব। দল ভালই বুঝতে পারছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া আদৌ ভাল ভাবে নিচ্ছে না মতুয়া সমাজ। বিজেপি সূত্রের মতে, তড়িঘড়ি নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য গত মাসের তৃতীয় সপ্তাহে একটি ও তার পরে আরও দু’টি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে বিজেপি মতুয়াদের পাশে রয়েছে। বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুরের কথায়, “নাম বাদ যাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু রাস্তা বন্ধ হয়নি। নাগরিকত্ব দিতে সরকার দায়বদ্ধ।”
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এত দেরিতে কেন? কারণ ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার মতুয়ার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাঁরা উচ্চপর্যায়ের কমিটির কাছে আবেদন জানিয়ে ভোটের আগে নাগরিকত্ব পেতে পারেন। কিন্তু এসআইআরে বাদ গেলে আর সেই নাম ভোটের আগে অন্তত ভোটার তালিকায় তোলা সম্ভব হবে না। এই নিয়ে ক্রমশ ক্ষোভ বাড়ছে মতুয়াদের মধ্যে। একের পর এক উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গড়ে সেই ক্ষোভ কি আদৌ প্রশমন হবে, সংশয় রয়েছে বিজেপির অন্দরমহলেই।
মতুয়া সমাজের সেই ক্ষোভকে আজ আরও উস্কে দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ। বিজেপি সিএএ-র নামে আসলে মতুয়াদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ তুলে কুণাল বলেন, “বিজেপি সরকার আগেই মতুয়াদের ঠেলে জলে ফেলে দিয়েছে। এখন বলছে কমিটি গড়া হল। তার মানে মানুষ জলে পড়ে আছে, ডুবুরিদের জলেও নামায়নি। তাদের পাড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে!” প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অমিতাভ চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘নির্বাচন কাছে এলেই বিজেপি মতুয়া সমাজকে সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। অথচ বিজেপি সরকারের নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন, ২০০৩-এর জন্যই মতুয়া-সহ অন্য শরণার্থীদের নাগরিকত্ব পেতে সমস্যা হচ্ছে। কংগ্রেস আমলে তো মতুয়াদের ভোট নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। এখন নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিজেপি তাঁদের ভোটাধিকার রক্ষা করবে কী ভাবে?’’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘আইন করে কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ধর্মীয় হিংসার কারণে যাঁরা ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁরা দেশের নাগরিক হবেন। পরে সেই তারিখ সম্প্রসারণ করে বলা হয়েছে, তাঁদের ফেরত পাঠানো হবে না। সে ক্ষেত্রে যে মতুয়ারা দীর্ঘ দিন ধরে এই রাজ্যে বসবাস করেন, তাঁদের কেন এসআইআর-এর নাম করে সমস্যায় ফেলা হচ্ছে? এর কোনও উত্তর বিজেপি দিতে পারবে?’’
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন এনেছিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। ওই আইনানুযায়ী বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো মুসলিম ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশী দেশ থেকে যদি ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, পার্সি ও খ্রিস্টান) ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে ২০১৫ সালের আগে এ দেশে আশ্রয় নিয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাঁদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত। কিন্তু ওই আইন পাশ হওয়ার প্রায় পাঁচ বছরের মাথায় লোকসভা ভোটের ঠিক আগে বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই আইন কার্যকর করে নরেন্দ্র মোদী সরকার। কিন্তু তাতেও রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে নাগরিকত্ব দেওয়ার কাজ ধীরে চলছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বিরোধীদের অভিযোগ, এত দিন নাগরিকত্ব দেওয়ার গতি নিয়ে বিজেপির হেলদোল না থাকলেও, ভোটে মতুয়া সমর্থন হারানোর ভয়ে তড়িঘড়ি লোক দেখানো কমিটি গঠন করা হচ্ছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে