সবে মিলি: ইফতারের খাওয়াদাওয়া। রবিবার, পার্ক সার্কাস ময়দানে এসআইআর বিরোধী মঞ্চে। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।
স্কুলের অ্যাসেম্বলি হলে সারি-সারি টেবিলে সাজানো খেজুর, তরমুজ, ভাজাভুজি, শরবত। অভ্যাগতদের সাদর সম্ভাষণে ডন বস্কোর অধ্যক্ষ ফাদার জর্জ, ১৯৮৪-র আইসিএসই ব্যাচ, প্রাক্তন শুল্ক-কর্তা শেহেনশাহ মির্জ়া বা ১৯৮৫-র প্রাক্তনী, শিল্পোদ্যোগী অনিমেষ চক্রবর্তীরা। আজানের আগে পিছনে দেওয়াল জোড়া জিশুখ্রিস্টের ছবির সামনে রমজানের সংযমের মাসে ইরানে শিশুঘাতী হিংসা নিয়ে বলতে থাকলেন উদ্যোক্তারা। গম্ভীর পরিবেশে একটু বাদেই অবশ্য মিশল মিলনমেলার আনন্দও। স্কুলের প্রাক্তন সহ-অধ্যক্ষ ফাদার অ্যালবার্টকে ঘিরে ধরে ছবি তুললেন বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তনী অভীক গুহঠাকুরতা, অভিজ্ঞানেরা। বুফেয় সাজানো কাবাব, ফ্রাই, হালিম থেকে চাট, কুলফি নিতে নিতে খোশগল্প জমে উঠল।
স্কুলের কৃতী প্রাক্তনী শেহেনশাহ মির্জ়া বলছিলেন, “প্রাক্তনীদের উদ্যোগে হোলি, দেওয়ালির মতো ইফতারও ডন বস্কোর পরম্পরা। প্রধানত মুসলিম ছাত্র এবং নাইট স্কুলের প্রাক্তনীরা এ আসরে অন্য বন্ধুদের নেমন্তন্ন করেন।” ইদানীং ইফতারের সামাজিক বা ধর্মীয় চরিত্রটির মধ্যে জাতীয়-আন্তর্জাতিক রাজনীতির অভিঘাতও ছাপ ফেলছে। ডন বস্কোয় পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে শান্তি প্রার্থনার মতো আসন্ন বিধানসভা ভোটে ভোটাধিকার নিয়ে অনেকের উৎকণ্ঠাও ইফতারকালীন দোয়ায় মিশে যাচ্ছে।
ইদের আগের এই শেষ রবিবারই পার্ক সার্কাসে ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চের অবস্থানে দু’টি ছবি দেখাল পিপলস ফিল্ম কালেক্টিভ। এনআরসি-সঙ্কটে অসমবাসীদের দুর্ভোগ নিয়ে দেবশ্রী নাথের ছবি নুর ইসলাম এবং ছ’বছর আগে সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে দিল্লির অভিজ্ঞতা নিয়ে নওশিন খানের ছবি ল্যান্ড অব মাই ড্রিমস দেখলেন নানা ভাষাভাষী, ধর্মের মানুষ।
আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক সাইন শেখ বলছিলেন, ‘‘ইফতারের পরে আগেকার মতো ধর্মীয় আলোচনার বদলে পরিস্থিতির চাপে দেশ, নাগরিক অধিকার নিয়ে আলোচনাই এখন প্রধান সুর হয়ে উঠেছে।” এ দিন বারাসতের কদম্বগাছিতেও ভোটাধিকার হারানো একটি বুথের প্রায় শ’তিনেক ভোটারকে নিয়ে ইফতারে বসেন মানবাধিকার সংগঠনের কর্মী মিতালি বিশ্বাস, দিলীপ দত্তেরা।
আল-আমিন মিশনের ২০০৫-এর প্রাক্তনীদের সংস্থা উইথ ইউ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ডাকে ইফতারকালীন আলোচনাচক্রেও সংখ্যালঘুদের শিক্ষার উদ্যোগ থেকে ভোটাধিকারের বিপন্নতার নানা দিক উঠে এসেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য, আল-আমিন মিশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলামেরা বক্তৃতা দিলেন। সমাজকর্মী-গবেষক সাবির আহমেদ ভোটার তালিকায় বিবেচনাধীন হওয়ার সঙ্কট ব্যাখ্যা করেন। বছর দুয়েক আগে সংসদে সিএএ আইনও পাশ হয়েছিল রমজান মাসে। তখনও এ সব চর্চায় পাল্টে গিয়েছিল ইফতারের পরিবেশ। এ বারও সেই ধারাবাহিকতার ছাপ।
গত নারী দিবসের প্রাক্কালে ইফতারের মধ্যে বোনতুতো বাঁধনের স্পর্শ টের পেয়েছেন নৃত্যশিল্পী, গবেষক শ্রুতি ঘোষ। সাঁতরাগাছির দ্বিনীয়ত মুয়াল্লিমা কলেজ এবং নো ইয়োর নেবার মঞ্চের ডাকে শুধু মেয়েদের এক ইফতারে গিয়েছিলেন তিনি। শ্রুতি মুগ্ধ, “ইফতারের মজলিসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা থেকে ক্ষমতায়নের নানা দিক উঠে এল।” জ়াকারিয়া স্ট্রিট লাগোয়া রতু সরকার লেনে বালকনাথ মন্দিরের পাশের ছাদে এই বিকেলেই স্থানীয় কিশোর, তরুণদের সঙ্গে ইফতার আয়োজনের শরিক হন যাদবপুর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন ছাত্রছাত্রী।
অনুষ্কা, সোহম, সুমনিমাদের সঙ্গে মিশে গেলেন আলিয়া, আয়েশা, নুর, মুনাফেরা। কলকাতার তথাকথিত সংখ্যালঘু মহল্লার অপরিচয় ভাঙাও এখন শহুরে ইফতারি সংস্কৃতি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে