— প্রতীকী চিত্র।
তখনও কোভিড শুরু হয়নি। সেই সময়ে রাজ্য সরকারের বেশির ভাগ অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠত কন্যাশ্রী যোদ্ধারা। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হত সাইকেল। প্রচারের ফ্লেক্স-ফেস্টুনে লেখা হত কন্যাশ্রী প্রকল্পের কথা।
২০২০ সালের এপ্রিলের পরে পরিস্থিতি বদলে গেল। এক বছরের মধ্যে একুশের ভোটে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করল ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের। বাড়ির মহিলাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে নগদ টাকা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই একটি প্রতিশ্রুতি সেই ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘রাজনৈতিক ভাবে’ এগিয়ে দিয়েছিল অনেকটা রাস্তা। প্রকল্পটিতে রাজ্য সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটা বোঝা যায় এই খাতে খরচ দেখলেই। রাজ্য সরকারের তথ্যই বলছে, চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত লক্ষ্মীর ভান্ডারে ২.২১ কোটি উপভোক্তাকে টাকা দিতে খরচ হয়েছে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এর জন্য প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ধরে রাখতে হয়েছে।
বর্তমানে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও নতুন জনমুখী প্রকল্প। আর সে সব চালাতে বরাদ্দ কমেছে পুরনো প্রকল্পগুলিতে। তার মধ্যে আছে কন্যাশ্রীও। সরকারের প্রচারের মুখও বদলে গিয়েছে কন্যাশ্রী থেকে লক্ষ্মীর ভান্ডারে। সরকারি তথ্য বলছে, সব মিলিয়ে এমন মূল ১৬টি প্রকল্পের পিছনে রাজ্যের শুধু এ বছরই খরচ হয়েছে প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকা। ‘যত্র আয় তত্র ব্যয়’-এর প্রশাসনিক সংসারে, এই খরচ ও বেতন-ভাতা সামলে উন্নয়নের জন্য হাতে টাকা প্রায় থাকেই না বলতে গেলে। তখন সরকার ধার করতে বাধ্য হয়।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ঋণ করে ঘি খাওয়া (অর্থাৎ উৎপাদনহীন জনমুখী প্রকল্প) আর্থিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল কি! আরও প্রশ্ন, ভোট রাজনীতি, না কি স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজ্যের আর্থিক সুব্যবস্থা চাইলে কোনটাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি?
এই আলোচনার আগে এক বার দেখে নেওয়া যাক, রাজ্য সরকার কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ এবং খরচ করে। লক্ষ্মীর ভান্ডারের জন্য যেমন ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বরাদ্দ প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। নতুন প্রায় ১৬ লক্ষ বাড়ির উপভোক্তাকে প্রথম কিস্তি (অর্ধেক) দিতে রাজ্যের খরচ প্রায় ৯৬০০ কোটি টাকা। ‘আমার পাড়া, আমার সমাধান’ কর্মসূচিতে ৮০০০ কোটি টাকা খরচ করবে বলেছিল রাজ্য। আর আয়? কেন্দ্রের কর-অনুদান ধরে রাজ্যের আশা, এই অর্থবর্ষে ২.৬৬ লক্ষ কোটি টাকা আয় হবে। অর্থাৎ, রাজ্যের আয়ের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই চলে যাচ্ছে এই সব খরচ করতে। এর পাশাপাশি ধার শোধের ৮১,৫১০ কোটি টাকা ধরলে আয়ের ৬২% শতাংশই খরচ করে ফেলতে হবে রাজ্যকে। হাতে থাকবে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৯৫টি প্রকল্পের প্রচার করে রাজ্য। এর উপর অনুদান-বৃদ্ধির ঘোষণা হলে খরচ আরও বেশি হবে।
সব খরচ সামলে হাতে যে টাকা পড়ে থাকবে, তাতে টানা যাবে তো এত বড় সংসার? দৈনন্দিন সরকারি খরচ, দফতরগুলির কাজকর্ম সামলে ঠিক মতো দেওয়া যাবে তো বেতন-পেনশন?
এখানেই ‘ধার করে ঘি খাওয়ার’ উপমা টানেন অভিজ্ঞরা।
ফল? বাড়ছে রাজ্যের রাজস্ব ঘাটতি, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজকোষ ঘাটতিও। তার সঙ্গে ধার এবং তা শোধ করার পরিমাণও বাড়ছে। এ বছরের বাজেটে কাটছাঁট করতে হয়েছে কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, সবুজসাথীর মতো গুরুত্বপূর্ণ একাধিক প্রকল্পের বরাদ্দ। বাজেট কমাতে হয়েছে ক্ষুদ্র-ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) দফতরের (কর্মসংস্থানের প্রশ্নে এই দফতরকেই এগিয়ে রাখে রাজ্য)। নামেমাত্র বাজেট বেড়েছে পূর্ত, পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের। নবান্নের অন্দরের খবর, পূর্ত দফতরের বাজেট বরাদ্দ যা-ই থাকুক, যৎসামান্য অর্থ পাচ্ছে সরকারের থেকে। দফতরের অনেকের মতে, টান পড়ছে সেই বরাদ্দেও। ফলে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। রাস্তার হাল নিয়ে ক্ষোভও বাড়ছে বিভিন্ন মহলে। প্রশ্ন উঠছে, পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে টাকার টান পড়লে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হবে কী ভাবে! গত প্রায় ১৪ বছর ধরে এত কাজ হলেও, ভোটের আগে ‘আমার পাড়া আমার সমাধান’ কর্মসূচিতে রাতারাতি বাজেট-বরাদ্দের বাইরে ৮০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হচ্ছে কেন? তবে কি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী উন্নয়নের থেকে ভোট-রাজনীতিই সরকারের অগ্রাধিকার?
অবশ্য সরকারের বক্তব্য, রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গড় উৎপাদন (জিএসডিপি) ৪.৪১ গুণ বেড়ে হয়েছে ২০.৩১ লক্ষ কোটি টাকা। মাথাপিছু আয়ও ২০১১-১২ থেকে তিন গুণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ১.৬৩ লক্ষ টাকা। দারিদ্রসীমার বাইরে এসেছেন ১.৭২ কোটি মানুষ। মূলধনী বরাদ্দ (প্রধানত স্থায়ী পরিকাঠামো খাতে খরচ) গত প্রায় সাড়ে ১৪ বছরে বেড়েছে ১৭.৬৭ গুণ, সামাজিক খাতে ১৪.৪৬ গুণ, কৃষিতে তা ৯.১৬ গুণ। সদ্য প্রকাশিত ‘উন্নয়নের পাঁচালি’-তে সরকার দাবি করেছে, ২০১১ সালে মাথাপিছু আয় যেখানে ছিল ৫১,৫৪৩ টাকা, সেটাই ২০২৪-২৫ সালে তিন গুণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ১.৬৩ লক্ষ টাকা করে।
উল্টো দিকে, অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, বেড়েছে ধারের পরিমাণও। ২০১১ সালে রাজ্যের সর্বমোট ধার ছিল ২ লক্ষ কোটি টাকা মতো। এ বছর (২০২৫-২৬) রাজ্যের অনুমান—তা হতে পারে প্রায় ৭.৭১ লক্ষ কোটি টাকা। আবার এরই হাত ধরে মাথাপিছু ধারের বোঝাও এই সময়সীমায় বেড়েছে তিন গুণের বেশি। ২০১১ সালের মোট ধারের নিরিখে এক জন মানুষের মাথায় ধারের বোঝা ছিল ২২,৫৬৭ টাকা। এখন তা-ই দাঁড়িয়েছে ৭৩,৪৯২ টাকায় (আগামী বছর রাজ্যের জনসংখ্যা কমবেশি সাড়ে ১০ কোটি হবে বলে সরকারি অনুমানের নিরিখে)।
ফলে সরকার যে সার্বিক উন্নয়নের দাবি করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশেষজ্ঞ মহলে। এখানেই ধারের সঙ্গে আসছে সেই ধারের ঋণ শোধ করা এবং কেন্দ্রের প্রকল্প বাবদ বরাদ্দ বন্ধ হওয়ার ফলে ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’র অভিযোগ।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এই অভিযোগ কমে যেত, যদি অন্য সম-আয়তনের রাজ্যগুলির মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিনিয়োগ আসত। তামিলনাড়ু, কর্নাটকের মতো বিজেপি-বিরোধী রাজ্যগুলির উদাহরণ দিয়ে তাঁদের বক্তব্য, এই রাজ্যগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বিনিয়োগ অনেক বেশি। ফলে অনুদান-প্রকল্পের বোঝা সামলেও, তাদের পরিকাঠামো বরাদ্দ যথেষ্ট। তাতে আবার নতুন বিনিয়োগও আনার রাস্তা খুলে যাচ্ছে। এ রাজ্যে তা কেন ঘটছে না, তা নিয়ে বিশ্লেষণ জরুরি, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
(চলবে)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে