যুব সাথীর ফর্ম নেওয়ার ভিড়। নিজস্ব চিত্র।
এক মুহূর্তের ঘোষণার খরচ অন্তত ১২৬০ কোটি টাকা! আধিকারিকদের মতে, ভোটবাক্স ভর্তি করার লক্ষ্যে অনুদানের খরচ সামলাতে তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) সম্ভাব্য ধারের (এই মর্মেই ২ জানুয়ারি প্রকাশিত রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের ইন্ডিকেটিভ ক্যালেন্ডারে রাজ্যের তরফে প্রস্তাব নথিভুক্ত রয়েছে) পরিমাণ পৌঁছতে পারে ৪৬ হাজার কোটি টাকায়! অর্থ-কর্তাদের একাংশের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত তা-ই ঘটলে লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে একটি বছরেই ধারের পরিমাণ পৌঁছে যাবে ১ লক্ষ ২৪ হাজার কোটি টাকায়। রাজ্যের অর্থ দফতর সরকারি ভাবে এ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি না থাকলেও, বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্যকে আর্থিক ভাবে দেউলিয়া করার পথে এগোচ্ছে রাজ্য।
শনিবার ধর্মতলার মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ‘উপহার’ হিসেবে ১ এপ্রিলের বদলে এ দিন থেকেই যুবসাথী প্রকল্পের টাকা পাঠানো হবে আবেদনকারীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নবান্নের অন্দরের তথ্য ছিল, প্রায় ৬৫ লক্ষ অফলাইনে এবং অনলাইনে আরও প্রায় ১৯ লক্ষ মিলিয়ে মোট প্রায় ৮৪ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতী এই ভাতার জন্য আবেদন করেছিলেন। সেই সংখ্যা ধরলে আচমকা দিন বদলে সরকারকে চলতি মাসেই ১২৬০ কোটি টাকা (মাসে মাথাপিছু ১৫০০ টাকার হিসাবে) মেটাতে হবে। যদিও এ দিনের মঞ্চ থেকে মমতা দাবি করেছেন, “২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি ৯০ লক্ষ থেকে এক কোটি ছেলেমেয়ে দরখাস্ত করেছেন, যাঁরা অন্য কোনও সাহায্য নেন না। যাঁরা বৃত্তি পান, তাঁদের ধরছি না। পড়াশোনার জন্য সেই টাকা তাঁদের প্রাপ্য।” মুখ্যমন্ত্রীর দাবি মতো সংখ্যাটা ১ কোটি ধরলে ১৫০০ কোটি টাকা খরচ হবে রাজ্যের।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য, “রাজ্যকে দেউলিয়া করার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে এই সরকার। যুবসাথী যাঁরা নেবেন, তাঁরাও জানেন, এই সরকারের আমলে তাঁদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ফলে ভাতা নিলেও এই সরকারকে বিসর্জন দেবেন তাঁরাই।”
কেন ১ এপ্রিল থেকে ভাতা দেওয়ার কথা ছিল এবং কেনই বা বদল হল? আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, ১ এপ্রিল থেকে নতুন আর্থিক বছর (২০২৬-২৭) শুরু হবে। ফলে তখন থেকে ভাতা চালু করলে ওই বছরের বাজেট থেকে খরচ করা যেত। কিন্তু এখন থেকেই তা চালু হওয়ায় প্রথম মাসের খরচটা চলতি আর্থিক বছরেই (২০২৫-২৬, যা শেষ হবে ৩১ মার্চ) ঢুকে যাবে। শীঘ্রই ভোট ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটের আদর্শ আচরণবিধি চালু হলে নতুন ভাতা দেওয়ার সামনে বাধা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই এই সিদ্ধান্ত কার্যত মরিয়া হয়েই। এক কর্তার কথায়, “ভোটের আগে হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়তো জরুরি বলেই মনে করছে শাসক দল।” প্রসঙ্গত, বাজেটের ঘোষণা ছিল, ১৫ অগস্ট থেকে এই ভাতা দেওয়া হবে। তা নিয়ে বিরোধীরা তীব্র কটাক্ষ করেন। ঘটনাচক্রে, তার পরেই দিন বদল করে ১ এপ্রিল থেকে ভাতা দেওয়ার ঘোষণা হয়। ভোট ঘোষণার মুখে ফের তাতে বদল ঘটল।
গত কয়েক বছরে চাকরি-দুর্নীতির অভিযোগে সরকারের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে। রাস্তায় নেমেছেন যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা। সরকারি স্তরে নিয়োগ, বেসরকারি স্তরে ভাল মানের কর্মসংস্থান কেন হচ্ছে না, লাগাতার তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে লক্ষ লক্ষ সরকারি শূন্যপদ পূরণ করা হবে। এই চাপ সামাল দিতেই সম্ভবত ভবিষ্যতের চিন্তা ছেড়ে বর্তমানে জোর দিয়েছে নবান্ন। কোষাগারে চাপ ও ঋণের হালের প্রশ্নে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির উপরে দায় চাপিয়ে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষের বক্তব্য, “এ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজ্যের প্রাপ্য বকেয়া ছেড়ে দিতে বলুন!” সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী ‘ক্যাশ ফর ভোট’ মডেলে চলে গিয়েছেন। রাজ্যের মানুষের ঘাড়ে বিপুল ঋণের বোঝা চেপে থাকবেএবং তার দায় বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকেই নিতে হবে।’’
আগামী ভোটকে সামনে রেখে গত অন্তর্বর্তী বাজেটে যুবসাথী ছাড়াও খরচসাপেক্ষ একাধিক ঘোষণা করেছিল রাজ্য। বাড়ি তৈরির টাকা দিতেও বিপুল খরচ করা হয়েছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে উপভোক্তার সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ২.৪২ কোটি করা হয়েছে। ৫০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে মাসিক ভাতাও। খেতমজুরদের আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথাও ঘোষণা হয়েছিল। সব মিলিয়ে আগের খরচের বহরের উপর আরও বোঝা চাপানো হয়েছে। যে রাজ্য সরকার নিজেরাই এত আর্থিক সংকট এবং কেন্দ্রের আর্থিক বঞ্চনার কথা বলে এসেছে, তারা কী ভাবে সেই খরচ সামাল দেবে, প্রশ্ন ছিল তা নিয়েও।
তবে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি থেকে চলতি মার্চ মাস পর্যন্ত রাজ্য সরকার প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে ধার করার প্রস্তাব (রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের ইন্ডিকেটিভ ক্যালেন্ডারে) দিয়েছে। অর্থ-কর্তাদের অনেকের মতে, একটি ত্রৈমাসিকে যা এ পর্যন্ত সর্বাধিক। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ন’মাসে (২০২৫ সালের এপ্রিল-ডিসেম্বর) ৭৮ হাজার কোটি টাকা ধার করার কথা জানিয়েছিল রাজ্য। ফলে এই তিন মাসের জন্য আরও ৪৬ হাজার কোটি টাকা ধার করতে হলে চলতি আর্থিক বছরেই ধারের বহর হবে ১.২৪ লক্ষ কোটি টাকা।
অথচ বাজেটে রাজ্যই জানিয়েছিল, চলতি আর্থিক বছরে বাজার থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা ধার করলেই চলবে। বাস্তবে এই ধার ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত। সমান্তরালে বাড়বে পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ এবং ধার শোধের অঙ্কও। যদি পুরোটা ধার না করতে হয়, তবে অবশ্য আলাদা কথা। অর্থসচিব প্রভাত মিশ্রকে এ ব্যাপারে ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি। জবাব মেলেনি মোবাইল-বার্তারও।
এখানেই আর্থিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ধার এবং খরচের বিপুল বোঝা সামাল দেওয়া যাবে তো! মানুষকে দেওয়া যাবে সাধারণ পরিষেবা? না কি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিকাঠামো-চাকরি ইত্যাদিতে আরও টান পড়বে!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে