অসহিষ্ণুতা-বিতর্ক

রাজ্যে হিংসার তথ্য নিয়ে কড়া চিঠি কেন্দ্রকে

তৃণমূল জমানায় পশ্চিমবঙ্গে অসহিষ্ণুতার জেরে হিংসা নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের তথ্যকে চ্যালেঞ্জ জানাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংসদে তথ্য দিয়ে জানিয়েছিল, অসহিষ্ণুতার জেরে হিংসাত্মক ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:৪০
Share:

তৃণমূল জমানায় পশ্চিমবঙ্গে অসহিষ্ণুতার জেরে হিংসা নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের তথ্যকে চ্যালেঞ্জ জানাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।

Advertisement

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংসদে তথ্য দিয়ে জানিয়েছিল, অসহিষ্ণুতার জেরে হিংসাত্মক ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে। সেই তথ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব রাজীব মহর্ষিকে কড়া চিঠি লিখে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘আপনারা কোথায় পেলেন এই তথ্য?’’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পশ্চিমবঙ্গে যত হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল, এ বছরের প্রথম দশ মাসেই তার থেকে অনেক বেশি ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, অসহিষ্ণুতার জেরে ২০১৪-য় রাজ্যে ১৬টি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৫-য় জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যেই ২৪টি ঘটনা ঘটে গিয়েছে। কিন্তু বাসুদেববাবু চিঠিতে লিখেছেন, ‘এই তথ্যের সূত্র কী, তা স্পষ্ট নয়। কারণ আমাদের তরফ থেকে এমন কোনও পরিসংখ্যান পাঠানো হয়নি।’

Advertisement

নরেন্দ্র মোদী সরকারের জমানায় দেশ জুড়েই অসহিষ্ণুতা ও হানাহানির ঘটনা বাড়ছে, এই অভিযোগে কংগ্রেস ও অন্য সব দলের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিল তৃণমূলও। তার মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যে রাজ্যেই অসহিষ্ণুতার জেরে হিংসা বৃদ্ধির ইঙ্গিত মেলায় স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তিতে পড়েছে তৃণমূল। বিধানসভা ভোটের আগে সিপিএম, প্রদেশ কংগ্রেসের নেতারা এ বিষয়ে মুখ খোলার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের যুক্তি, এমনিতেই অধিকাংশ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয় না। অসহিষ্ণুতার জেরে ঘটনাকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হিসেবে চালানো হয়। তার পরেও যদি দেখা যায় হিং‌সার ঘটনা বাড়ছে, তা হলে পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।

এই বিষয়ে বিরোধীরা আরও সরব হওয়ার আগেই কেন্দ্রের এই তথ্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাসুদেববাবুর চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, কেন্দ্র যে সব ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করছে তার বিস্তারিত তথ্য রাজ্যকে জানানো হোক। অর্থাৎ শুধু সংখ্যা বলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। কবে, কোথায় ওই সব ঘটনা ঘটেছে, কত জন হতাহত হয়েছেন, সে সবও যত শীঘ্র সম্ভব বিস্তারিত জানাতে হবে। ৪ ডিসেম্বরের লেখা চিঠিতে স্বরাষ্ট্রসচিবের যুক্তি, সে ক্ষেত্রে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার থাকলে রাজ্যও তা কেন্দ্রকে জানাবে। যাতে সেই ব্যাখ্যা সংসদে পেশ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠকেও এই প্রসঙ্গ তোলার কথা ভাবা হয়েছিল। পরে ঠিক হয়, আগে স্বরাষ্ট্রসচিবের চিঠির জবাব দিক কেন্দ্র। তার পরে পদক্ষেপ করা হবে।

রাজ্যে অসহিষ্ণুতার জেরে হিংসা নিয়ে তথ্য পেশের পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেণ রিজিজু যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘‘আইন-শৃঙ্খলা রাজ্যের বিষয়। রাজ্য পুলিশের কাছেই এই সব ঘটনার মামলা দায়ের হয়। তাই রাজ্য থেকেই আমরা তথ্য পেয়ে থাকি।’’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গের চিঠির জবাবেও কেন্দ্র জানাবে যে ওই তথ্য রাজ্যের কাছ থেকেই পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব তাঁর চিঠিতে দাবি করেছেন, এমন কোনও তথ্য রাজ্য পাঠায়নি। বাসুদেববাবু যুক্তি দিয়েছেন, ১ ডিসেম্বর সংসদে বলা হয়েছে বড় মাপের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র ছ’টি রাজ্যে। ওই ছ’টি রাজ্য থেকে এ বিষয়ে রিপোর্টও চেয়েছিল কেন্দ্র। কিন্তু তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের বক্তব্য, ‘‘এর জবাবও খুব সহজ। পশ্চিমবঙ্গে এমন কোনও বড় ঘটনা ঘটেনি, যার ভিত্তিতে কেন্দ্র রিপোর্ট তলব করেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোনও ঘটনাই ঘটেনি।’’

একটি বিষয়ে অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অন্দরমহলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তা হল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সংসদে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে এনসিআরবি (ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো)-র তথ্যের অমিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, ২০১৪-য় গোটা দেশে ৬৪৪টি এমন ঘটনা ঘটেছিল, যেগুলি অসহিষ্ণুতার জেরে ঘটেছে। কিন্তু এনসিআরবি-র তথ্য বলছে, ওই বছর এই ধরনের ১,২২৭টি ঘটনা ঘটেছিল। কংগ্রেসের অভিযোগ, মোদী সরকারের জমানায় এই ধরনের ঘটনা কম করে দেখাতেই ভুল তথ্য দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

এনসিআরবি-র তথ্য মানলে অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আরও অস্বস্তিতে পড়ার কথা। কারণ তা বলছে, ২০১৪-য় ১৬টি নয়, পশ্চিমবঙ্গে ১০৪টি ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল, এনসিআরবি-ও রাজ্যের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরিসংখ্যান তৈরি করে। তা হলে সংসদে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সেই তথ্যের এত ফারাক কেন? এ বিষয়ে প্রশ্ন ওঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তের নির্দেশও দিয়েছে বলে সূত্রের খবর। প্রাথমিক ভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের শীর্ষ কর্তারা জানাচ্ছেন, সংসদে ওই তথ্য পেশ করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মানবাধিকার দফতর। এনসিআরবি বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের মামলাকেও এই ধরনের ঘটনার আওতায় ফেলে। যা মানবাধিকার দফতর করে না। হিসেব রাখার ধরনে ফারাক রয়েছে বলেই এই ধরনের হিসেবের ফারাক তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এই ধরনের বিভ্রান্তি যাতে না হয়, সেই নির্দেশও জারি হয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement