West Bengal Government

বন্দর বাণিজ্যে গতি আনতে নদীগর্ভের করিডর

প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্তাদের মতে, দেশের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ এই প্রকল্পটি নির্মাণ হয়ে গেলে কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরের গুরুত্ব অনেক বাড়বে। স্থল, জল, বিমান বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগের পরিকাঠামো যুক্ত হলে বাড়াবে শিল্প-বিনিয়োগের সম্ভাবনাও।

চন্দ্রপ্রভ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ ০৮:৪২
Share:

— প্রতীকী চিত্র।

কেন্দ্র রাজি থাকলেও হুগলি নদীর উপর দিয়ে তৃতীয় একটি সেতু তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে পারেনি তৃণমূল সরকার। নতুন সরকারের শপথগ্রহণের মাস পেরনোর আগেই প্রায় আট হাজার কোটি টাকার পরিকাঠামো প্রকল্প পেতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ। ঘটনাচক্রে সেই পরিকাঠামো তৈরি হবে হুগলি নদীর তলা দিয়ে। যে ভাবে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর লাইন তৈরি হয়েছে, সে ভাবেই হুগলি নদীর তলা দিয়ে যাওয়া একজোড়া টানেল জুড়ে দেবে কলকাতা বন্দর এবং জাতীয় সড়ক ১৬-কে। টানেলের সঙ্গে নির্মাণ হবে ‘এলিভেটেড করিডর’ (ঝুলন্ত পথ), রেল ওভারব্রিজ (আরওবি) এবং সংযোগকারী একটি সড়কও (অ্যাপ্রোচ রোড)। যা ভবিষ্যতে বারাণসী-কলকাতা আর্থিক করিডরের সঙ্গে জুড়ে দেবে টানেল-করিডরকে।

প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্তাদের মতে, দেশের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ এই প্রকল্পটি নির্মাণ হয়ে গেলে কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরের গুরুত্ব অনেক বাড়বে। স্থল, জল, বিমান বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগের পরিকাঠামো যুক্ত হলে বাড়াবে শিল্প-বিনিয়োগের সম্ভাবনাও।

শহর কলকাতার রাস্তার সংখ্যা অন্যান্য মহানগরের তুলনায় বেশ কম। তাই বিকল্প সড়ক পরিকাঠামোর প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্য পরিবহণের সময় এবং খরচ কম হলে তবেই কোনও বন্দরের গুরুত্ব বাড়ে। তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় নানা ধরনের শিল্পের কর্মকাণ্ড। আবার বন্দরকেন্দ্রিক রফতানি শিল্পের ক্ষেত্রেও তা অত্যন্ত জরুরি। সব মিলিয়ে উপযুক্ত পরিকাঠামোর ইতিবাচক একটা প্রভাব রয়েছে শিল্পায়ন তথা বিনিয়োগের উপরে।

বর্তমানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরে যাতায়াত করা বড় পণ্যবাহী গাড়িগুলিকে একটি রাস্তার উপরেই নির্ভর করতে হয়। কলকাতায় ঢোকার ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা বিদ্যাসাগর সেতুই। অথচ সেই রাস্তা এবং সেতুতে সব ধরনের যাত্রিবাহী গাড়িরই চলাচল রয়েছে। তাই নিয়মিত বিপুল যানজটের সঙ্গে দুর্ঘটনাও ঘটে। আবার দিনের একটা বড় সময় পণ্যবাহী গাড়ির চলাচল বন্ধ থাকায় পরিবহণের সময় এবং খরচ দু-ই বাড়ে। এই পথই এড়িয়ে সরাসরি বন্দরের ডক পর্যন্ত পণ্যবাহী গাড়িগুলির নির্বিঘ্নে যাতায়াত নিশ্চিত করতে এই পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাবনার সমীক্ষা রিপোর্ট ইতিমধ্যেই জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের (এনএইচএআই) হাতে তুলে দিয়েছে বন্দর। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় জাহাজমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের সঙ্গে বৈঠকের পরে নবান্ন থেকে এর প্রাথমিক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।

নদীর তলা দিয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্প সফল হওয়ার পরেই সড়ক-টানেল পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা শুরু করে কেন্দ্র। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী, নদীর তলা দিয়ে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ একজোড়া টানেল তৈরি করা সম্ভব। যা শহরের যানজট এড়িয়ে বন্দর থেকে পণ্যবাহী গাড়িগুলিকে সরাসরি ধূলাগড় পর্যন্ত পোঁছে দিতে পারবে। এই পথের মধ্যে কলকাতা বন্দর থেকে হাওড়ার পাঁচলা পর্যন্ত নদীর তলার টানেল যাবে। তার পরে থাকবে এলিভেটেড করিডর, আরওবি এবং সংযোগকারী পথ। পরে বারাণসী-কলকাতা আর্থিক করিডর তৈরি হয়ে গেলে টানেল-করিডর সেটির সঙ্গে জুড়ে যাবে হাওড়ার বাগনান এলাকায়। ফলে ওই জাতীয় সড়ক থেকে আসা কলকাতাগামী কোনও পণ্যবাহী গাড়িকে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যাসাগর সেতু এবং কলকাতার হয়ে বন্দরে পৌঁছতে হবে না। দিন-রাত ওই পথে পণ্যবাহী গাড়ি যাতায়াত করতে পারবে। তাতে পরিবহণের সময় এবং খরচ কমবে।

প্রশাসনের এক কর্তার কথায়, ‘‘এখন বন্দর থেকে প্রায় ৮ লক্ষ কন্টেনার যাতায়াত করে। ২০৩০ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষে পৌঁছবে। স্বাভাবিক ভাবেই পণ্যবাহী গাড়ির সংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়বে। তাই সড়ক পরিকাঠামো উন্নত না-হলে বন্দরের গুরুত্ব কমবে। মার খেতে পারে বাণিজ্য। সাগরমালা প্রকল্পের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ যুক্ত হওয়ার কারণে এ রাজ্যে পরিকাঠামো আরও বাড়বে। ফলে শিল্প এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনাও বাড়বে পাল্লা দিয়ে। তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’

অতীতে বারাণসী-কলকাতা আর্থিক করিডরের পরিকল্পনার সময়ে ঠিক ছিল, সেই প্রকল্প হাওড়ার উলুবেড়িয়ার কাছে শেষ হবে। যদিও সেই করিডরের সঙ্গে জাতীয় সড়ক ১১৭ তথা ডায়মন্ড হারবার রোডকে যুক্ত করা গেলে তবেই গোটা পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হত। তাই হুগলি নদীর উপরে তৃতীয় একটি সেতুর পরিকল্পনা হয়। তার জন্য বজবজ-বাটানগর বা তার কাছাকাছি কোনও এলাকায় জমি চেয়েছিল এনএইচএআই। প্রকল্পের পুরো খরচ করত কেন্দ্রই। কিন্তু দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন তখন জমি খোঁজার কাজ শেষ করতে পারেনি। তৎকালীন রাজ্য সরকার আগ্রহ না দেখানোয় জমি জোগাড়ের কাজও থেমে যায়। প্রকল্পটি কার্যত হিমঘরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার কেন্দ্রের সব প্রকল্প গ্রহণ করায় তুলনায় আরও বড় এই প্রকল্পের কাজ বাধাহীন হবে বলেই মনে করছেন আধিকারিকেরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন