পরিষেবা মেলেনি নয়াগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে। রেফার হয়ে মেদিনীপুরের পথে। — নিজস্ব চিত্র।
ক্ষতবিক্ষত ডান পা থেকে অঝোরে রক্ত পড়ছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে বছর পঁচিশের এক যুবক। ছেলে মৃন্ময়ের এই দশা দেখে স্থির থাকতে পারছিলেন না রামচন্দ্র মাহাতো। বারবার ছুটে যাচ্ছিলেন ডাক্তার-নার্সদের কাছে। সঙ্গে কাতর আর্জি, ‘ওকে একটু দেখুন’।
ততক্ষণে মৃন্ময়কে মেদিনীপুর মেডিক্যালে ‘রেফার’ করা হয়ে গিয়েছে। তা জেনে নয়াগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের বিশাল বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে মৃন্ময়ের বাবা রামচন্দ্রবাবু বললেন, ‘‘এত বড় হাসপাতাল করে কী লাভ হল? সেই তো মেদিনীপুরে ছুটতে হচ্ছে!’’
বৃহস্পতিবার নয়াগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক সভায় যাওয়ার পথে বেড়াজাল এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় তৃণমূল কর্মী-সমর্থক বোঝাই পিক-আপ ভ্যান। জনা চল্লিশেক জখম হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়া হয় নয়াগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে জটিল রোগের চিকিত্সা দূর, দুর্ঘটনায় জখমদের প্রাথমিক চিকিত্সার ব্যবস্থাও যে নেই! অগত্যা প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে মেদিনীপুর মেডিক্যালে ‘রেফার’।
গত ২৩ নভেম্বর নয়াগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের উদ্বোধন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ৩০০ শয্যার হাসপাতালটি অবশ্য নামেই চালু হয়েছে। এখনও ইনডোর পরিষেবা চালু হয়নি। রয়েছে শুধু আউটডোর। তবে সেখানেও চিকিৎসক থাকে না। এ দিনের দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম ১৩ জনকে তাই পাশের খড়িকামাথানি গ্রামীণ হাসপাতালে প্রাথমিক শুশ্রূষার পরে মেদিনীপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মেদিনীপুর মেডিক্যালের এক নার্স মানছেন, “রেফার না করলে সমস্যাই হত। ওখানে তো তেমন পরিকাঠামো নেই। মেদিনীপুরে তা-ও কিছু পরিকাঠামো রয়েছে।”
মেদিনীপুর মেডিক্যালে রেফার হয়ে আসা দেবেন্দ্র মাহাতো, মুকুল মাহাতো, প্রদীপ মাহাতো, কালীপদ মাহাতোরা তৃণমূল কর্মী বলেই পরিচিত। তাঁদেরও বক্তব্য, প্রয়োজনের সময় চিকিৎসাই না মেলে, তা হলে সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল চালু করার দরকার কী! হাতে-পায়ে চোট থাকা দেবেন্দ্রের কথায়, “আমাদের এলাকা থেকে মেদিনীপুর অনেক দূর। আসতে আসতে মনে হচ্ছিল যন্ত্রণাতেই মরে যাব।’’
বাস্তব ছবিটা এমন হলেও মুখ্যমন্ত্রীর হাসপাতাল উদ্বোধন কিন্তু থেমে নেই। এ দিন নয়াগ্রামের প্রশাসনিক সভা থেকে চার জেলায় আরও ছ’টি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসাপতালের উদ্বোধন করেছেন তিনি। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, কেন্দ্রের ‘ব্যাকওয়ার্ড রিজিয়ান গ্রান্ট ফান্ড’ (বিআরজিএফ)-এর এককালীন টাকায় ৩৪টি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল ছাড়াও রাজ্যে আরও সাতটি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল হওয়ার কথা। মুখ্যমন্ত্রীও এ দিন সগর্বে বলেছেন, ‘‘৪১টি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের কথা ছিল। মার্চের মধ্যে ২৫টাই হয়ে যাচ্ছে।’’ শালবনি, ডেবরা, ঘাটাল সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালও যাতে মার্চের মধ্যে চালু হয়ে যায়, মঞ্চে উপস্থিত স্বাস্থ্য সচিবকে তা দেখতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী। চালু হওয়া হাসপাতালগুলিতে পরিষেবা না মেলার একটা ব্যাখ্যাও দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘‘সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে প্রথম ছ’মাস শুধু আউটডোর পরিষেবা মিলবে। এটাই নিয়ম।’’
স্বাস্থ্য সচিবের প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে আরও ফাঁপড়ে পড়েছেন স্বাস্থ্যকর্তারা। এক শীর্ষ কর্তা বলেন, ‘‘আমাদের যে কী চাপ যাচ্ছে, তা শুধু আমরাই জানি। চতুর্থ শ্রেণির পর্যাপ্ত কর্মীও দেওয়া যাচ্ছে না। অথচ সুপার স্পেশ্যালিটির বোর্ড ঝুলছে!’’
স্বাস্থ্যকর্তারা এ-ও মানছেন, পরিকাঠামোর ব্যবস্থা না করেই হাসপাতালগুলি চালু করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে, সেখানে সাধারণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো জ্বর, পেট খারাপের ওষুধ দেওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছু পাওয়ার আশা নেই।
রাজ্যে এখনও যতগুলি সুপার স্পেশ্যালিটি চালু হয়েছে, প্রত্যেকটিরই এক হাল। কাছের মেডিক্যাল কলেজ থেকে চিকিৎসক তুলে আনায় সেখানে সঙ্কট হচ্ছে। উল্টো দিকে নতুন চালু হওয়া হাসপাতালে আউটডোর পরিষেবাটুকুও মিলছে না। নয়াগ্রামের সঙ্গেই চালু হওয়া বাঁকুড়ার বড়জোড়া সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালেরও এক দশা। বড়জোড়ার জন্য চিকিৎসক তুলে নেওয়ায় বাঁকুড়া মেডিক্যালে রয়েছে ২০ জন মেডিক্যাল অফিসার। অথচ থাকার কথা ৯৪ জনের।
নয়াগ্রামের হাসপাতাল চালুর জন্য মেদিনীপুর মেডিক্যাল থেকেও বহু চিকিৎসক তুলে নেওয়া হয়েছিল। ফলে, দুই মেদিনীপুরের একমাত্র মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সঙ্কট বেড়েছে। এ দিনই যেমন দুর্ঘটনায় জখমদের চিকিৎসায় হিমশিম খাচ্ছিলেন জুনিয়র ডাক্তার ও নার্সরা। শয্যা না মেলায় অনেককে দীর্ঘক্ষণ মেঝেতে রাখতে হয়। এক জুনিয়র ডাক্তার তো বলেই ফেললেন, ‘‘সব চিকিৎসক তুলে নিচ্ছে। আর যত দায় সামলাতে হচ্ছে আমাদের।’’
সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল প্রসঙ্গে এ দিন মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বারাকপুরের সভায় বুদ্ধবাবু বলেন, ‘‘একটাও হাসপাতাল হয়েছে কি! চিকিৎসক-নার্স কিছুই তো নেই। হবেটা কোত্থেকে।’’
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এ দিন দুপুরে নয়াগ্রামের সভায় মুখ্যমন্ত্রীর মেজাজ খুব একটা ছন্দে ছিল না। দুই সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী ও মুকুল রায়কে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন তিনি। প্রথামাফিক একগুচ্ছ প্রকল্পের শিলান্যাস-উদ্বোধন করেন, বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা দেন। তবে বারবারই মুখ্যমন্ত্রীর চোখে-মুখে ধরা পড়ে বিরক্তি। প্ল্যাকার্ড হাতে মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাওয়া অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ধমক দিয়ে বলেন, ‘‘বসুন। চুপ করে বসে পড়ুন’। উন্নয়নের ফিরিস্তি দেওয়ার ফাঁকে মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ করেন, অনেক মহিলার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। তখন রীতিমতো বিরক্ত দেখাচ্ছিল তাঁকে। শেষে পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ মঞ্চ থেকে নেমে অবস্থা সামলানোর চেষ্টা করেন।
সিপিএমের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য প্রদীপ সরকারের কটাক্ষ, ‘‘মানুষ যেমন বুঝছেন মুখ্যমন্ত্রীর দাবি আর বাস্তবের মধ্যে কোনও মিল নেই, মুখ্যমন্ত্রী নিজেও তা জানেন। তাই ভোট যত এগোবে, উনি তত মেজাজ হারাবেন।’’