কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।
গত বছর ছিল বিহারের ভোট। তার আগে কেন্দ্রীয় বাজেটে বিহারের জন্য ছিল ঢালাও ঘোষণা। এ বার ভোট পশ্চিমবঙ্গে। এ বছরেও কি সেই ভোট-ভাবনার প্রতিফলন দেখা যাবে? পশ্চিমবঙ্গের জন্য থাকবে কি দরাজ ঘোষণা, ঠিক যেমনটা গত বার হয়েছিল বিহারের জন্য? অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের নবম বাজেট পেশের আগে তা নিয়ে কৌতূহল ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গত বছরের কেন্দ্রীয় বাজেটে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে বিহারই। তার আগের বছরেরও নির্মলার বাজেট ছিল বিহারময়। ওই বছর কেন্দ্রীয় বাজেটে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছিল, যা থেকে প্রত্যক্ষ ভাবে লাভবান হয়েছে বিহার। গত বছর ছিল বিহার ভোটের আগে শেষ কেন্দ্রীয় বাজেট। ঢালাও ঘোষণা ছিল বিহারবাসীর জন্য। পটনা বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে নতুন বিমানবন্দর তৈরির ঘোষণা ছিল নির্মলার বাজেটে।
বিহারে শিল্প এবং পরিষেবা পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য চারটি নতুন গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর এবং একটি ব্রাউনফিল্ড বিমানবন্দর নির্মাণের কথা বাজেট বক্তৃতায় জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। বিহারে মাখনা চাষের সঙ্গে জড়িতদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ বোর্ড গড়ার কথাও ঘোষণা হয়েছিল। বিহারে আগে থেকেই ক্ষমতায় ছিল জেডিইউ-বিজেপির জোট সরকার। ভোটের পরে ক্ষমতায় ফেরে তারাই। অনেকে মনে করেন, ভোটের কথা মাথায় রেখেই গত দু’বছর নির্মলার বাজেট ছিল বিহারমুখী।
বিহারের ভোটের দু’বছর আগে থেকেই কেন্দ্রীয় বাজেট ছিল দৃশ্যত বিহারমুখী। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বিজেপি। বিহারের জেডিইউ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের টিডিপি-র সমর্থন নিয়ে তৃতীয় বারের জন্য সরকার গঠন করেন মোদী। ক্ষমতায় আসার পরে প্রথম বাজেটে দুই রাজ্যের জন্যই ঢালাও ঘোষণা ছিল মোদী সরকারের বাজেটে। ৬০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের ঘোষণা হয়েছিল বিহারের জন্য। ২০২৫ সালের বাজেটেও বিহারে পশ্চিম কোশী খাল সংস্কারের জন্য ১১,৫০০ কোটি বরাদ্দ করা হয়। এর ফলে বিহারের ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির কৃষকেরা উপকৃত হবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন নির্মলা। পটনা আইআইটি-র হস্টেল এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন করা হবে বলেও ঘোষণা করা হয় বাজেটে।
অতীতেও বিভিন্ন নির্বাচনমুখী রাজ্যের জন্য কেন্দ্রীয় বাজেটে এমন ঢালাও ঘোষণার প্রবণতা দেখা গিয়েছে। এ বার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কি তেমন কিছু হতে পারে? আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে দেড় দশকের তৃণমূল সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার লক্ষ্য নিয়েছে বিজেপি। অতীতে যেমন ‘২০০ পার’-এর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল, এখনও তেমন কোনও লক্ষ্যমাত্রা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তবে ভোট শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছেন শাহ। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ৪৬ শতাংশ ভোট চাই-ই চাই। কলকাতা এবং শহরতলিতেও ২৮টি আসনের মধ্যে ২০টি পেতেই হবে, এই লক্ষ্যমাত্রাও স্থির করে দিয়েছেন তিনি।
শনিবার রাজ্যে কর্মী সম্মেলনে এসেও পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের ‘লক্ষ্য’ স্পষ্ট করেছেন শাহ। জানিয়েছেন, এতগুলি রাজ্যে বিজেপি এবং এনডিএ-র সরকার থাকার পরেও খুশি নন মোদী। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গড়ার পরেই মোদীর মুখে হাসি ফুটবে বলে দাবি শাহের। রাজ্যে ক্ষমতায় এলে কী কী ‘পরিবর্তন’ হতে পারে, ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গকে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন বিজেপির দিল্লির নেতৃত্ব। রবিবার কেন্দ্রীয় বাজেটেও কি সেই আভাস দিতে রাখতে চাইবেন মোদী-শাহেরা?
উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির প্রতি তৃণমূল সরকার ‘বঞ্চনা’ করছে বলে শনিবারও অভিযোগ তুলেছেন শাহ। তাঁর দাবি, ২০২৪-২৫ সালের রাজ্য বাজেটে ৩ লক্ষ ৬৭ হাজার কোটির বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু উত্তরবঙ্গের জন্য ঘোষণা করা হয়েছিল ৮৬১ কোটি। তাঁর দাবি, আয়তন এবং জনসংখ্যার হিসাবে মোট বাজেটের ২৫ শতাংশ পাওয়ার কথা উত্তরবঙ্গের। কিন্তু উত্তরবঙ্গের জুটেছে ০.২৫ শতাংশ। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় রাজ্যের বাজেটে উত্তরবঙ্গের যা প্রাপ্য, তার চেয়ে এক টাকা হলেও বেশি বরাদ্দের ঘোষণা করা হবে।
ঘটনাচক্রে, শাহ যে দিন তৃণমূল সরকারের রাজ্য বাজেটে এই ‘বৈষম্যে’র অভিযোগ তুললেন, তার পরের দিনই সংসদে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করবেন নির্মলা। অনেকেই মনে করছেন, রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বিজেপি কেমন কাজ করতে পারে, তার কোনও পূর্বাভাস থাকতে পারে নির্মলার বাজেটে।
কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বার বার ‘বঞ্চনা’র অভিযোগ তুলছে রাজ্য সরকার। এমনকি ১০০ দিনের কাজের টাকাও আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। এ অবস্থায় রবিবার কোনও ‘বিশেষ প্যাকেজ’ থাকবে কি কেন্দ্রীয় বাজেটে? রেল বা মেট্রোর প্রকল্পে কোনও উপহার থাকবে কি? এমন বেশ কিছু প্রশ্ন উঁকি মারতে শুরু করেছে।
এ বছরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ মোট চার রাজ্য এবং এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা ভোট রয়েছে। তালিকায় রয়েছে কেরল, তামিলনাড়ু, অসম এবং পুদুচেরি। এর মধ্যে বর্তমানে অসম এবং পুদুচেরিতে এনডিএ সরকার রয়েছে। বাকি তিন রাজ্যই রয়েছে বিজেপিবিরোধী শক্তি। সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি বামশাসিত কেরল এবং ডিএমকে-শাসিত তামিলনাড়ুর জন্য কী কী ঘোষণা থাকতে পারে নির্মলার বাজেটে, তা নিয়েও কৌতূহল বৃদ্ধি পেয়েছে।