শনিবার শিলিগুড়ির কর্মী সম্মেলনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ছবি: সংগৃহীত।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের জন্য যতটা ভোট বাড়ানো দরকার, তা একা উত্তরবঙ্গই বাড়িয়ে দেবে! দাবি করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার বাগডোগরা বিমানবন্দরের অদূরে এয়ারফোর্স ময়দানে বিজেপির কর্মী সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে শাহ ওই মন্তব্য করেছেন।
শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার— পাঁচ সাংগঠনিক জেলার বিজেপি কর্মীরা শাহের সভায় ডাক পেয়েছিলেন। কর্মীদের উদ্দেশে শাহের বার্তা, আসন্ন নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের প্রায় কোনও আসনই বিজেপির হাতের বাইরে যাবে না। রাজ্যের উত্তরাংশের আয়তন এবং জনসংখ্যা অনুযায়ী রাজ্য বাজেটের যতটা অংশ উত্তরের প্রাপ্য, তার চেয়ে এক টাকা হলেও বেশি বরাদ্দ উত্তরবঙ্গের জন্য বিজেপি সরকার রাখবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন বিজেপির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এখন গোটা দেশে বিজেপি এবং এনডিএ-র ২১টি সরকার রয়েছে। কিন্তু ২১টি সরকার গঠনের পরেও সারা দেশে আমাদের কর্মীরা বা আমাদের নেতা নরেন্দ্র মোদী খুশি নন। তাঁর মুখে হাসি সে দিন ফুটবে, যে দিন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে জিতবে।”
উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুরে শনিবার সকালে কর্মী সম্মেলন সেরে বাগডোগরা যান শাহ। ব্যারাকপুরের কর্মী সম্মেলনে যা বলেছিলেন, বাগডোগরার ভাষণ তার চেয়ে খুব আলাদা ছিল না। কিন্তু গোটা রাজ্যে বিজেপির মোট ভোটপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের ভূমিকা কেমন থাকবে, তা নিয়ে বাগডোরায় শাহ ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ মন্তব্য করেছেন। গত কয়েকটি বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটপ্রাপ্তি যে ৩৮ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে, সে কথা মনে করিয়ে শাহ বলেছেন, ‘‘আমাদের ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশে পৌঁছোতে হবে। একা উত্তরবঙ্গই তা করে দেবে।’’
কলকাতা থেকে বিএসএফের বিশেষ বিমানে শনিবার বাগডোগরা যান শাহ। উড়ানে তাঁর সঙ্গী ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিমানেও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে শাহ তাঁ ভাষণে জানান। তিনি বলেন, ‘‘বিমানে শুভেন্দুদা আমাকে বলছিলেন, উত্তরবঙ্গে একটা-দুটো আসনে সমস্যা রয়েছে। আমি বলেছি, সেগুলোও আমরা এ বার জিতব।’’
উত্তরবঙ্গের প্রতি ‘বঞ্চনা’র চিরাচরিত অভিযোগও শাহের ভাষণে আবার শোনা গিয়েছে। রাজ্য বাজেটের কতটা অংশ উত্তরবঙ্গ পায়, তা নিয়ে একটি ‘হিসাব’ তুলে ধরেন শাহ। তিনি বলেন, ‘‘২০২৪-’২৫ সালের রাজ্য বাজেটে ৩ লক্ষ ৬৭ হাজার কোটির বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু উত্তরবঙ্গের জন্য জোটে ৮৬১ কোটি। অর্থাৎ, এক শতাংশের এক চতুর্থাংশেরও কম। অথচ উত্তরবঙ্গের আয়তন রাজ্যের মোট আয়তনের ২৪ শতাংশ। ২৫ শতাংশ বাজেট পাওয়ার কথা। তার বদলে দেওয়া হয়েছে ০.২৫ শতাংশ।’’ শাহের বক্তব্য, ‘‘এর চেয়ে বেশি অর্থ তো মোদীজি উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য পাঠিয়েছেন।” শাহের আশ্বাস, ‘‘আমরা উত্তরবঙ্গবাসীকে কথা দিচ্ছি, উত্তরবঙ্গের আয়তন এবং জনসংখ্যার হিসাবে যে পরিমাণ বাজেট হওয়ার কথা, তার চেয়ে এক টাকা হলেও বেশি বরাদ্দ আমরা উত্তরবঙ্গকে দেব।”
শিলিগুড়ি শহরের অদূরে দাঁড়িয়ে ‘শিলিগুড়ি করিডর’ বা ‘চিকেন্স নেক’-এর নিরাপত্তা নিয়েও মুখ খুলেছেন শাহ। তিনি বলেন, “কিছু দিন আগে কয়েক জন দিল্লিতে স্লোগান তোলে, চিকেন্স নেক কেটে দেবে। কেন কেটে দেবে? কারও বাবার জমি নাকি! এটা ভারতের জমি, কেউ হাত লাগাতে পারবে না।’’ যারা ‘চিকেন্স নেক’ কাটার নিদান দিচ্ছিল, তাদের দিল্লি পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে শাহ মনে করিয়ে দেন। তার পরেই বলেই, ‘‘বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ওদের ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত গিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়। সুপ্রিম কোর্টও ওদের দাবি খারিজ করে দিয়েছে।”
শাহের অভিযোগ, উত্তরবঙ্গে এমস তৈরির জন্য জমি আটকে রেখেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বাগডোগরার নতুন বিমানবন্দরও মমতা আটকে রেখেছেন। আটকে রেখেছেন রেলপ্রকল্প। শাহের কথায়, ‘‘চা শ্রমিকদের জন্য মোদীজি যা কিছু করেছেন, অসমে তা কার্যকর হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের চা শ্রমিকদের কোনও সুবিধা হয়নি। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের জমির মালিকানা দেওয়ার বদলে দেশলাই বাক্সের মতো ঘর দিতে চাইছেন।’’ শাহের ঘোষণা, ‘‘আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, অসমের মতো পশ্চিমবঙ্গেও চা শ্রমিকদের জমির অধিকার দেওয়ার কাজ করবে বিজেপি।”