অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
‘রামচরিতমানস’ লিখেছিলেন কবি তুলসীদাস। বিধানসভা ভোটের আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কি ‘বামচরিতমানস’ লেখা শুরু করেছেন?
বিগত চার মাসে অভিষেকের কর্মসূচি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, শব্দচয়ন, ইতিহাস টেনে আনার মধ্যে বাম ধাঁচ এবং ‘প্রগতিশীল বয়ান’ স্পষ্ট। যা সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের সর্বোচ্চ স্তরে দেখা যায়নি। সেই সূত্রেই প্রশ্ন, কেন অভিষেক এ হেন বামচরিতমানসে?
গত বছর নভেম্বরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুই সমকামী তরুণী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁদের সাহসকে কুর্নিশ জানাতে সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেছিলেন মথুরাপুরের তৃণমূল সাংসদ বাপি হালদার। তৃণমূলে এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বাপি ‘এবি’-র (অভিষেকের নাম-পদবির আদ্যক্ষর মিলিয়ে দলে তাঁকে এই বলেই সম্বোধন করা হয়) লোক। ফলে সেই আয়োজনের নেপথ্যে যে অভিষেক ছিলেন, তা-ও বুঝতে অসুবিধা হয়নি। বাপি আয়োজিত সংবর্ধনা মঞ্চে সমকামী দুই তরুণীকে ‘অচলায়তন’ ভাঙার জন্য ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন অভিষেক।
সেই শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন যে একেবারেই কাকতালীয় ছিল না, তা বোঝা গেল ফেব্রুয়ারির শেষে। যখন দেখা গেল, রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন পেলেন আইনজীবী তথা ‘এলজিবিটিকিউ প্লাস’-দের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সুপ্রিম কোর্টে যুগান্তকারী মামলার সওয়ালকারী মানেকা গুরুস্বামী। যিনি নিজে একজন ঘোষিত সমকামী। যিনি মনোনয়ন পাওয়ার পরে এক্স পোস্টে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন অভিষেককে।
এখানেই শেষ নয়। ফেব্রুয়ারির গোড়ায় যখন এসআইআর পর্ব শেষ পর্যায়ে, তখন সমাজমাধ্যমে অভিষেক একটি কবিতা লিখেছিলেন। লম্বা সেই কবিতার দু’টি পঙ্ক্তি ছিল, ‘আমি অস্বীকার করি রাষ্ট্রের নামে রক্তের ঋণ, আমি অস্বীকার করি রক্তের উপর কালির শাসন।’ যে ধরনের শব্দবন্ধ সাধারণত বাম বা অতিবাম লেখকদের লেখায় ধরা পড়ে, সেই সব শব্দেই নিজের কবিতা সাজিয়েছিলেন অভিষেক। বামেরা এখনও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘শোষণযন্ত্র’ হিসাবে তুলে ধরে। অভিষেকের কবিতাতেও বর্তমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সেই স্বর ছিল তীব্র। ঠিক তার পরেই সংসদে বাজেট বক্তৃতার শেষে বামপন্থী কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা উদ্ধৃত করে অভিষেক বলেছিলেন, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না।’
আরও আছে। রাজ্য বাজেটের পরে যখন সমগ্র তৃণমূল লক্ষ্মীর ভান্ডারের অর্থবৃদ্ধি এবং নতুন প্রকল্প ‘যুবসাথী’ নিয়ে সমাজমাধ্যম ভরিয়ে দিচ্ছিল, তখন অভিষেক তাঁর এক্স পোস্টে সবচেয়ে উপরে উল্লেখ করেছিলেন ভূমিহীন কৃষক তথা অসংগঠিত ক্ষেতমজুরদের জন্য ঘোষিত প্রকল্পকে। যেখানে ঘোষণা করা হয়েছিল, ক্ষেতমজুরেরা বার্ষিক ৪,০০০ টাকা করে সহায়তা পাবেন। তা ছাড়াও সাড়ে ২২ লক্ষ কৃষকের জন্য চাষের জল বিনামূল্যে সরবরাহ করা হবে। সবমিলিয়ে, দু’টি সিদ্ধান্তে রাজ্যের প্রায় ৭০ লক্ষ কৃষক উপকৃত হবেন। অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে ক্ষেতমজুরদের জন্য এমন কর্মসূচি গ্রহণের পুরোধা ছিলেন হরেকৃষ্ণ কোঙার। কৃষকদের শ্রেণিচরিত্রের সঙ্গে যে ক্ষেতমজুরদের শ্রেণিচরিত্রের ফারাক যে ক্রমশ প্রকট হচ্ছে, তা গত কয়েক দশক ধরেই নানাবিধ সমীক্ষায় উঠে আসছিল। তা মেনে নিয়ে সিপিএম-ও দলের কৃষকফ্রন্টের পাশাপাশি কয়েক বছর আগে পৃথক ভাবে ক্ষেতমজুর ফ্রন্ট চালু করেছে।
শেষ সেখানেও নয়। গত রবিবার, অর্থাৎ এসআইআরের চূড়ান্ত অথচ আংশিক তালিকা প্রকাশের পরের দিন তৃণমূল ভবনে দীর্ঘ সাংবাদিক বৈঠক করেন অভিষেক। সেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে নানাবিধ আক্রমণ শানাতে গিয়ে অভিষেক স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের (ব্যাটল অফ স্তালিনগ্রাদ) প্রসঙ্গ টানেন। যে সংঘাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যে যুদ্ধে হিটলারের নাৎসিবাহিনীকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছিল জোসেফ স্তালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। যে যুদ্ধকে সারা দুনিয়ার বামপন্থীরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানবতার জয় হিসাবে অভিহিত করেন। ঘটনাচক্রে, দেশের তথাকথিত বাম দলগুলি তো বটেই, সার্বিক ভাবে বিরোধীরাও কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলে আক্রমণ শানাচ্ছে। আর ধারাবহিক ভাবে অভিষেক জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে ‘বিজেপির সহকারী সংস্থা’ বলে আসছেন। সোমবার নজরুল মঞ্চে ছিল তৃণমূলের ‘তফসিলি সংলাপ’ কর্মসূচি। সেখানেও দীর্ঘ বক্তৃতার শেষে অভিষেক উচ্চারণ করেছেন সলিল চৌধুরীর কালজয়ী গানের কথা, ‘পথে এ বার নামো সাথী, পথেই হবে এ পথ চেনা’। যে গানের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বাম আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস।
এর মধ্যে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যাওয়া প্রতীক-উর রহমানকে দলে যুক্ত করার দিন অভিষেক তৃণমূলের প্রথম নেতা হিসাবে দলের মতাদর্শ ব্যাখ্যা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘‘অনেকে বিদ্রুপ করে বলেন, তৃণমূলের মতাদর্শ কী? আমি বলছি তৃণমূলের মতাদর্শ ‘ওয়েলফেয়ারিজ়ম’ (সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া)।’’ ঘটনাচক্রে, সিপিএম যখন তাদের সমাজবদলের বিপ্লবী কর্মসূচির মধ্যেই রাজ্যে রাজ্যে সরকার গঠনের লাইন নিয়েছিল, তখনও সাধারণ মানুষকে ‘রিলিফ’ বা স্বস্তি দেওয়ার কথাই বলেছিল। বলা হয়েছিল, এই সমাজব্যবস্থায় একটি অঙ্গরাজ্যে সরকার গঠন করলে ব্যবস্থার বদল হয়তো হবে না। কিন্তু মানুষকে সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে যথাসম্ভব রিলিফ দেওয়া যাবে। আবার সিপিএম থেকে তৃণমূলে যাওয়া নেতারা প্রায়শই বলেন, সরকারি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কী ভাবে ঘরে ঘরে ‘রিলিফ’ পৌঁছে দিয়েছে।
কেন অভিষেক এই আখ্যান তৈরি করছেন? তৃণমূলের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। তবে রাজনৈতিক মহল নানা আঙ্গিকে বিষয়টিকে দেখতে চাইছে। অনেকের বক্তব্য, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অভিষেক যা করছেন, তা মমতার পরম্পরা মেনেই। এক প্রবীণ সিপিএম নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘১৯৭৭ সালে আমরা ক্ষমতায় এসেছিলাম জমি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আর আমাদের সরকার থেকে চলে যেতে হয়েছে জমি আন্দোলনের কারণেই। যে আন্দোলনে মমতা ছিলেন ‘মুখ’। কিন্তু তাঁকে ঘিরে ছিল বামমনস্ক দল, গোষ্ঠী এবং ব্যক্তি।’’ সদ্যপ্রয়াত সমীর পুততুণ্ড থেকে দোলা সেন, পূর্ণেন্দু বসুরা তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিলেন সেই পর্বে। সরকার বদলের পরে পূর্ণেন্দু রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছিলেন। দোলা এখনও রাজ্যসভার সাংসদ। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মতো মতাদর্শগত ভাবে অতিবাম গায়কও তৃণমূলের সঙ্গে জুড়ে ছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত। কবীর সুমন তৃণমূলের সাংদ হয়েছিলেন। মইনুল হাসান, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রতীক-উরেরা সিপিএম থেকে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। তৃণমূলে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা। বাম আমলের মন্ত্রী আব্দুস সাত্তার সরাসরি তৃণমূলে যোগ না-দিলেও তাঁকে প্রশাসনে নিয়োগ করা হয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে মমতা তথা তৃণমূলের সঙ্গে বাম যোগের যে ধারাবাহিকতা, সেই নিরিখেই অভিষেকের এই প্রবণতার ব্যাখ্যা করছেন অনেকে।
সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর রাজ্য সম্পাদক তথা প্রয়াত নকশাল নেতা চারু মজুমদারের পুত্র অভিজিৎ মজুমদার অবশ্য অভিষেকের এই আখ্যান তৈরি সম্পর্কে কটাক্ষের সুরে বলেছেন, ‘‘এটাকে বলে সাংস্কৃতিক আত্মসাতের রাজনীতি।’’ তবে তিনি এ-ও জানিয়েছেন, এই প্রবণতা তৃণমূলে নতুন নয়। উদাহরণ দিতে গিয়ে অভিজিৎ বলেছেন, ‘‘আমাদের দলের রাজ্য সদস্য নীতীশ রায় ‘বলতে পারো কোথায় আছি, বেঙ্গলে না জঙ্গলে’ শীর্ষক একটি গান তৈরি করেছিলেন। সেই গান একটা সময়ে তৃণমূল ব্যবহার করত। আসলে পশ্চিমবঙ্গের সমাজে বামপন্থার সংস্কৃতি কতটা গভীরে প্রোথিত, এই প্রবণতা তারই প্রমাণ।’’
আবার গত চার মাস ধরে অভিষেক যে ভাবে বামেদের পাঠ্যক্রমের শব্দ এবং ইতিহাস বলছেন, তাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক প্রশান্ত রায় বলেন, ‘‘উনি খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এই কোলাজটি তৈরি করছেন। যা অনেকেরই নজর কাড়ছে। তবে আমার মনে হয়, অভিষেকের এই বলার নেপথ্যে আরও বেশ কিছু মস্তিষ্ক কাজ করে থাকতে পারে।’’
আনুষ্ঠানিক ভাবে না-হলেও আরও কয়েকটি ব্যাখ্যা উঠে আসছে। অনেকের বক্তব্য, যে বাম ভোট বিজেপিতে চলে গিয়েছে, কৌশলে সেই ভোট ফেরাতে চাইছেন অভিষেক। যদিও এর পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। সেই অংশের বক্তব্য, বামেদের দিক থেকে যে ভোট বিজেপির দিকে গিয়েছে, প্রথমে তাদের উদ্দেশ্য ছিল তৃণমূলকে সরানো। ক্রমে সেই তৃণমূল-বিরোধী ভোট রূপান্তরিত হয়েছে ‘হিন্দু ভোটে’। সেই অংশ স্তালিনগ্রাদ, সলিলের গান, নবারুণের কবিতা শুনে তৃণমূলের দিকে চলে আসবে, বিষয়টা এত সহজ-সরল নয়। আবার অন্য একটি অংশের বক্তব্য, অভিষেক সমকামীদের গুরুত্ব দেওয়া-সহ যা যা বলছেন বা করছেন, তা আসলে শহুরে শিক্ষিত অংশকে ছুঁতে চেয়ে। যে অংশের মধ্যে ১৫ বছর সরকার চালানোর পরে তৃণমূল সম্পর্কে স্থিতাবস্থা বিরোধিতার মনোভাব কাজ করছে। যে অংশ আরজি কর পর্বে নাগরিক আন্দোলনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। আবার এ-ও বাস্তব যে, এই নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে বিজেপি সম্পর্কেও ছুতমার্গ রয়েছে।
ব্যাখ্যা যা-ই হোক, ঘটনাপ্রবাহ বলছে, সচেতন ভাবেই অভিষেক ‘বামচরিতমানস’ লেখা শুরু করেছেন। তুলসী দাসের ‘রামচরিতমানস’ ভক্তি আন্দোলনের মাইলফলক। অভিষেকের আখ্যান বিধানসভা ভোট-আন্দোলনের মাইলফলক হয়ে উঠতে পারল কি না, স্পষ্ট হবে ভোটগণনার দিন।