—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
তথ্যগত অসঙ্গতির জন্য নোটিস পাওয়া ভোটারদের তালিকা প্রকাশ হবে। কিন্তু তাতে ভোটারদের হেনস্থা কমবে কি? বরং নির্বাচন কমিশন আজ যা ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে ভুয়ো ভোটার ধরার জন্য এই সংখ্যা আরও বাড়াতেপারে তারা।
সুপ্রিম কোর্ট সোমবার নির্দেশ দিয়েছে, তথ্যগত অসঙ্গতির জন্য পশ্চিমবঙ্গে যে ১.৩৬ কোটি ভোটারকে নির্বাচন কমিশন নোটিস পাঠিয়ে নথি-সহ শুনানির জন্য ডাকছে, তাঁদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। তাঁরা বিএলএ বা রাজনৈতিক দলের বু্থ স্তরের এজেন্টের মাধ্যমে নথি জমা দিতে পারেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তথ্যগত অসঙ্গতির ভিত্তিতে নোটিস পাঠানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বা স্থগিতাদেশ জারি করেনি। যে সব কারণে কমিশন তথ্যগত অসঙ্গতির নোটিস পাঠাচ্ছে, সেখানেও রদবদল করেনি। ফলে কমিশন যাঁদের তথ্যগত অসঙ্গতির জন্য চিহ্নিত করেছে, তাঁদের কাছে নোটিস যাবেই। তাঁদের শুনানির জন্যও যেতে হবে।
উদাহরণ, কমিশনের নিজের হলফনামা থেকেই দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ৬ জন সন্তান রয়েছে—এমন ২,০৬,০৫৬ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের তথ্যগত অসঙ্গতির জন্য নোটিস পাঠানো হবে। দশ জনের বেশি সন্তান রয়েছে, এমন ভোটারদের সংখ্যা ৮,৬৮২। তাঁরাও নোটিস পাবেন। বাবা-মা, সন্তানদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণ দিতে হবে। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য, এখন যাঁদের বয়স ৬০-এর বেশি, তাঁদের প্রজন্মে পাঁচ-ছ’টি ভাই-বোন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। তার জন্য এখন কেন নোটিস আসবে?
প্রশ্ন উঠছে, তা হলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোটারদের কী লাভ হল?
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজনৈতিক লাভ দেখলেও তৃণমূল নেতারা ঘরোয়া ভাবে মানছেন, এতে ভোটারদের বিশেষ লাভ হচ্ছে না। তৃণমূলের রাজ্যসভার উপদলনেত্রী সাগরিকা ঘোষের যুক্তি, ‘‘এতে গোটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে।’’ সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর যুক্তি, ‘‘তালিকা প্রকাশ করে লাভ হবে না। তথ্যগত অসঙ্গতির নামে যে হয়রানি হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে।’’ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার আজ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখে দাবি জানিয়েছেন, এই তথ্যগত অসঙ্গতির ভিত্তিতে নোটিস পাঠানো অবিলম্বে বন্ধ হোক।
কিন্তু কমিশন সূত্রে যা ইঙ্গিত, তাতে উল্টে তথ্যগত অসঙ্গতির ক্ষেত্রে জোর বাড়ানো হবে। কমিশন মূলত পাঁচটি ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’-র ভিত্তিতে নোটিস পাঠাচ্ছে। এক, এক জনের ছ’টি বা তার বেশি সন্তান। দুই, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের ফারাক ১৫ বছরের কম। তিন, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের ফারাক ৫০ বছরের বেশি। চার, ঠাকুর্দা-ঠাকুমার সঙ্গে বয়সের ফারাক ৪০ বছরের কম। পাঁচ, ২০০২-এর এসআইআর-এর সঙ্গে এখনকার ভোটার তালিকার নাম না-মেলা।
কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে, যে ৩২ লক্ষ আন-ম্যাপড ছিলেন, তাঁদেরও নোটিস পাঠানো হয়েছে বা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের লিখিত অর্ডারে কোথাও এই সব শর্ত লঘু করার কথা বলা হয়নি। বরং কমিশন আরও বেশি করে তথ্যগত অসঙ্গতির ভিত্তিতে ভুয়ো ভোটার ধরার উপরে জোর দিচ্ছে। তাই আজ পশ্চিমবঙ্গের জন্য আরও রোল-পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান প্রশ্ন তুলেছিলেন, কিসের ভিত্তিতে, কোন আইন বা বিধিনিয়মে এই সব শর্ত ঠিক হয়েছে? কে এ সব উদ্ভাবন করেছে? বিরোধীদের অভিযোগ, গত জুনে বিহারের বা গত অক্টোবরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১২ রাজ্যের যে এসআইআর বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল কমিশন, তাতে কোথাও এই তথ্যগত অসঙ্গতি বা ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’-র প্রসঙ্গ ছিল না।
তৃণমূলের দাবি, সংখ্যালঘুদের নাম কাটার লক্ষ্যেই এই সব শর্ত ঠিক হয়েছে। কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী যুক্তি দেন, পশ্চিমবঙ্গে ১০০ জনের বেশি সন্তান রয়েছে, এমন ৭ জন মিলেছে। কমিশনের হলফনামাও বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ২০০ জন সন্তান এমন ২ জন, ১০০ জন সন্তান এমন ৭ জন, ৫০ জন সন্তান এমন ১০ জন, ৩০ জন সন্তান এমন ১৪ জন, ২০ জন সন্তান এমন ৫০ জন মিলেছে। কমিশনের কর্তাদের বক্তব্য, এ থেকে স্পষ্ট ভুয়ো ভোটারদের নাম খসড়া তালিকায় ঢোকানো হয়েছে। তৃণমূল সূত্রের পাল্টা যুক্তি, মঠের সন্ন্যাসীরা সবাই বাবার নামের জায়গায় গুরুর নাম লেখেন। ফলে কাগজে-কলমে সেখানে এক জনের ২০০ জন সন্তান থাকতেই পারেন।
রাজনৈতিক ভাবে বিএলএ-দের শুনানি প্রক্রিয়ায় যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় তৃণমূল উল্লসিত। তারা মনে করছে, এতে তিনটি লাভ। এক, বিজেপির মদতে পরিকল্পিত ভাবে কাদের নাম কাটার চেষ্টা হচ্ছে, তা বোঝা যাবে। দুই, নোটিস পাওয়ার পরে কাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা যেতে পারে, তার একটা আগাম ছবিও মিলবে। তিন, নোটিসের ফলে যাঁরা ‘হেনস্থা’-র শিকার হচ্ছেন, তৃণমূল তাঁদের ‘পাশে দাঁড়াতে’ পারবে। এই ভোটারদের নিয়ে তৃণমূল প্রচারও করতে পারবে। কিন্তু অন্যান্য দলের আশঙ্কা, তালিকা প্রকাশের পরে উপকার করার মরিয়া চেষ্টায় তৃণমূলের বিএলএ-রা ভোটারদের বাড়িতে হাজির হয়ে শুনানিতে জমা দেওয়ার জন্য নথি চাইতে পারেন। ভোটাররা না চাইলেও তখন বিএলএ-দের হাতে নথি তুলে দিতে হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে