অপেক্ষা টেকনিশিয়ানের। পড়েই রয়েছে কনফোকাল মাইক্রোস্কোপ।
কোন প্রোটিনের অভাব রোগ ডেকে আনে, তা মোটামুটি ধরে ফেলেছেন বালিগঞ্জ বিজ্ঞান কলেজের তরুণ গবেষক। এখন শুধু বিভিন্ন প্রোটিনের মিশ্রণ থেকে যন্ত্রের সাহায্যে সেই বিশেষ প্রোটিনটিকে আলাদা করতে পারলেই কেল্লা ফতে। কিন্তু ‘মাস স্পেক্ট্রোমেট্রি’ নামে যে-যন্ত্র সেই পৃথক করার কাজ করে, সেটি চালানো যাচ্ছে না। কারণ টেকনিশিয়ান বাড়ন্ত! খবর নিয়ে ওই গবেষক জেনেছেন, যন্ত্রীর অভাবে মাস তিনেক ধরে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে মূল্যবান যন্ত্রটি। ফলে গবেষণায় অনেকটা এগিয়ে গিয়েও ওই তরুণের মতো ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’ দশা আরও অনেক গবেষকের।
বায়োটেকনোলজি বা জৈব প্রযুক্তি বিভাগের আইপিএলএস (ইন্টার ডিসিপ্লিনারি প্রোগ্রাম ইন লাইফ সায়েন্স) প্রকল্পের শুধু ওই যন্ত্রটিই নয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণাগারে এমন আরও অনেক যন্ত্রের দেখা পাচ্ছেন গবেষকেরা, যেগুলি দীর্ঘ অব্যবহারে প্রায় নষ্ট হতে বসেছে। এর ফলে তাঁদের গবেষণার কাজ অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। অনেকে জানাচ্ছেন, এ ভাবে বছর বছর বহু পড়ুয়া হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা ছাড়াই পিএইচডি ডিগ্রি পেয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর, বছর পাঁচেক আগে আইপিএলএস প্রকল্পে ১৫ কোটি টাকা এসেছিল। সেই টাকায় ‘মাস স্পেক্ট্রোমেট্রি’ ছাড়াও কেনা হয় ‘অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ’, ‘কনফোকাল লেসার স্ক্যানিং মাইক্রোস্কোপ’-এর মতো কয়েকটি বহুমূল্য যন্ত্র। প্রতিটির দাম কোটি টাকার উপরে। কিছু দিন চালানো হলেও টেকনিশিয়ানের অভাবে পরের দিকে যন্ত্রগুলি আর গবেষণার কোনও কাজেই লাগেনি।
কিন্তু টেকনিশিয়ান নেই কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ জানাচ্ছেন, প্রথম দিকে যাঁরা যন্ত্র চালাতেন, তাঁদের কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ছিলেন না। যন্ত্রগুলি যে-সংস্থা থেকে কেনা হয়েছিল, তারাই তিন বছরের চুক্তিতে টেকনিশিয়ান দিয়েছিল। মেয়াদ শেষে তাঁরা চলে যাওয়ার পরেই সমস্যা দেখা দেয়। কারণ বাইরের লোক দিয়ে কাজ চলে যাওয়ায় স্থায়ী ভাবে টেকনিশিয়ান নিয়োগ তো দূরের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ‘টেকনিশিয়ান’ পদটিই তৈরি করা হয়নি। এক শিক্ষক বলেন, ‘‘এত টাকা খরচ করে যন্ত্র কিনে ভবিষ্যতে সেগুলো কী ভাবে চালানো হবে, গোড়ায় তা ভাবা হয়নি। যন্ত্রগুলো উচ্চ মানের। তাই যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া অন্য কারও পক্ষে সেগুলো চালানো সম্ভবও নয়।’’
সমস্যার কথা মেনে নিয়েও আইপিএলএসের আহ্বায়ক তথা বালিগঞ্জ বিজ্ঞান কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বা জৈব রসায়ন বিভাগের প্রধান মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত জানান, চুক্তির ভিত্তিতে নেওয়া টেকনিশিয়ানেরা পরে ভাল বেতন পেয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। সেই জন্য সমস্যা হচ্ছে। শুধু আইপিএলএস প্রকল্প নয়, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক যন্ত্রই বেহাল। দেশের অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এই ধরনের সমস্যা আছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার ডেকে এমন মূল্যবান যন্ত্রগুলি বিশেষ কোনও সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই সংস্থাই দেখভাল করে যন্ত্রের। ‘‘এখানেও তেমনটা করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে,’’ বললেন মৈত্রেয়ীদেবী। তিনি জানান, বিষয়টি উপাচার্যকে জানানো হয়েছে। প্রশিক্ষিত লোকও চাওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম তিন বছর ওই যন্ত্রগুলি নিয়ে কাজ করার পরেও গবেষকেরা তা চালাতে শিখলেন না কেন? ‘‘প্রশিক্ষিত লোক ছাড়া অন্য কারও হাতে যন্ত্র ছাড়ার প্রশ্ন নেই। তা ছাড়া পড়ুয়ারা কোনও দায়িত্ব নিতে চায় না,’’ জবাব মৈত্রেয়ীদেবীর।
মৈত্রেয়ীদেবীর এই বক্তব্যের বিরোধিতা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ। তাঁরা জানান, যন্ত্র চালানোর জন্য তার সঙ্গে বন্ধুতা পাতানো দরকার। সব দেশেই পড়ুয়াদের এই ধরনের যন্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখানেই শুধু অন্য নিয়ম। ছেলেমেয়েদের যন্ত্র ব্যবহার শেখালে তাঁরা কাজ শেখার সুযোগ পেতেন। তাঁদের চাকরি পেতেও অনেক সুবিধে হতো। তার চেয়েও বড় কথা, টেকনিশিয়ানের অভাবে কাজ আটকে থাকত না।
তা হলে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব টেকনিশিয়ানের প্রয়োজন নেই?
উপাচার্য সুগত মারজিত জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক পদ আছে, যেগুলির কোনও দরকারই নেই। আবার বেশ কিছু পদের প্রয়োজন থাকলেও সেগুলো গড়াই হয়নি। ‘‘আমরা সমস্যার দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি। গবেষণা আটকে থাকবে, এটা কখনওই কাম্য নয়,’’ বললেন উপাচার্য।