আদৌ কাজ হবে কি, প্রশ্ন সংশোধনের পরেও

ওদের যাতে কাজ করতে না হয়, তার জন্য চাওয়া হয়েছিল সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু শিশুশ্রম বিরোধী আইনে সংশোধনের পরে দেখা গেল, ১৪ বছরের কমবয়সি শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিহীন তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ করানো যাবে। বুধবার মন্ত্রিসভায় শিশুশ্রম বিরোধী আইনে এই পরিবর্তনের পরে শিশু অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত কর্মীদের একটি বড় অংশ আপত্তি জানিয়েছেন।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৪ মে ২০১৫ ০৪:০৫
Share:

ওদের যাতে কাজ করতে না হয়, তার জন্য চাওয়া হয়েছিল সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু শিশুশ্রম বিরোধী আইনে সংশোধনের পরে দেখা গেল, ১৪ বছরের কমবয়সি শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিহীন তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ করানো যাবে। বুধবার মন্ত্রিসভায় শিশুশ্রম বিরোধী আইনে এই পরিবর্তনের পরে শিশু অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত কর্মীদের একটি বড় অংশ আপত্তি জানিয়েছেন।

Advertisement

সংশোধিত আইনে রয়েছে, ১৪-র কমবয়সী শিশুদের স্কুলছুটির পরে বা টানা ছুটির দিনগুলোয় ঝুঁকিহীন পারিবারিক ব্যবসা, বিনোদন শিল্প এবং খেলাধুলোর ক্ষেত্রে কাজ করানো যাবে। বিনোদন শিল্প বলতে বোঝানো হয়েছে, টিভি সিরিয়াল, ফিল্ম বা বিজ্ঞাপনে কাজ। এবং সার্কাস ছাড়া যে কোনও ধরনের খেলায় নেওয়া যাবে শিশুদের। কিন্তু এই সংশোধন নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

শিশুদের নিয়ে কাজ করেন এমন সমাজকর্মীরা চাইছিলেন, শিশুশ্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হোক। কিন্তু সরকারের যুক্তি, এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কথাও মাথায় রাখতে হবে। এই সংশোধনের পরে কী বলছেন সেই সমাজকর্মীরা?

Advertisement

১৪-র নীচে অন্তত সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের দূরে রাখা যাবে, সংশোধনের পরে এই টুকুই ইতিবাচক তাঁদের কাছে। সকলের জন্য শিক্ষার কথা যখন সরকার দাবি করেছে, সে ক্ষেত্রে এই সংশোধন সাধুবাদযোগ্য, বলছেন তাঁরা। কারণ কাজের সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে সংশোধনীতে, যাতে শিশুরা স্কুল যাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও রয়ে গিয়েছে কিছু প্রশ্ন।

একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফে কোমল গনোত্রা সে কথাই বলছিলেন। তাঁর বক্তব্য, পারিবারিক ব্যবসা যে সব সময় ঝুঁকিহীন, এটা কী ভাবে বলা যায়? অনেক সময়ে কৃষি ক্ষেত্রে পরিবারকে সাহায্য করার জন্য শিশুদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় মাঠে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা কাজ করে। স্কুলে যাওয়া শিকেয় ওঠে। স্কুলছুটদের সংখ্যা বাড়ে। তা ছাড়া কোমলের প্রশ্ন, শিশু যদি স্কুলছুটির সময়ে বা দীর্ঘ ছুটিতে কাজই করবে, তা হলে তার মানসিক বিকাশের কী হবে? শিশুর কি অবসরের দরকার নেই?

আর একটি বিষয়ও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। যে আর্থ সামাজিক পরিস্থিতির দোহাই দিচ্ছে সরকার, সমাজকর্মীদের প্রশ্ন, একটি শিশুকে কেন তা নিয়ে ভাবতে হবে? সরকার কেন উদ্ধার হওয়া শিশুদের দিকটি দেখবে না? কারণ সমাজকর্মীদের পর্যবেক্ষণ, অনেক সময়েই উদ্ধার হওয়া শিশুদের ফিরে যেতে হয় পুরনো পেশায়, পুরনো মালিকের কাছে। কারণ তার পুনর্বাসনের কোনও ব্যবস্থাই করা হয় না সরকারি ভাবে। সংশোধনে এ নিয়ে ভাবা দরকার ছিল বলে মন করছেন তাঁরা।

তবে শিশুশ্রমের জন্য শাস্তি এবং জরিমানা আরও বাড়ানো হয়েছে। নয়া সংশোধন প্রস্তাবে রয়েছে, শিশুশ্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর যাঁরা ১৪ বছরের কমবয়সি শিশুদের দিয়ে কাজ করাবেন, সেই মালিকদের বিরুদ্ধে সাজার মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। তিন বছর পর্যন্ত জেল এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার কথা বলা হয়েছে নয়া আইনে। তবে ১৪-র কমবয়সি শিশুকে যদি প্রথম বার বাবা-মা বা অভিভাবক কাজ করতে বাধ্য করেন, সে ক্ষেত্রে তাদের শাস্তি হবে না। তবে দ্বিতীয় বার একই কাজে ধরা পড়লে দশ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।

এই সংশোধন নিয়ে শুধু সমাজকর্মীরা নন, সরব হয়েছে বিরোধীরাও। কংগ্রেস নেতা আহমেদ পটেল টুইটে বলেছেন, ‘‘সরকারের এই পদক্ষেপ আসলে পিছিয়ে দিচ্ছে আমাদের। আংশিক বৈধতা দিয়েছে শিশুশ্রমকেই।’’ তাঁর মতে, এমন সংশোধনে শিক্ষার অধিকার আইনও লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

সরকারের অবশ্য বক্তব্য, বহু পরিবারে বিশেষ করে কৃষি বা মৃৎ শিল্পে শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করে। সেই সব পেশার খুঁটিনাটি রপ্তও করে। তাই শিক্ষার প্রয়োজনের পাশাপাশি আর্থিক অবস্থার কথাও ভাবা হয়েছে। স্কুলের পড়াশোনার ব্যাঘাত না ঘটিয়ে শিশু যাতে স্কুলছুটির পরে বা দীর্ঘ ছুটির সময় তার পারিবারিক ব্যবসায় সাহায্য করতে পারে, সেই কথা ভেবেই মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত।

কিন্তু পারিবারিক কাজেও বিভিন্ন ঝুঁকি থাকতে পারে বলে দাবি সমাজকর্মীদের। যাতে শিশুর স্বাস্থ্য ও পড়াশোনা— দু’টোতেই প্রভাব পড়ার আশঙ্কা। বিনোদন শিল্পও সমালোচনার বাইরে নয়। শিশু মনস্তত্ববিদদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা জোর করে নানা টিভি শো বা খেলাধুলোর অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দেন। এর বিরূপ প্রভাব পড়ে শিশুদের মনে। তাই সেই দিকগুলি বিবেচনা করার পরিসর রয়েই গেল বলে মনে করছেন শিশু অধিকারের জন্য সরব আন্দোলনকারীরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement