দিন কেমন যাবে, তা নাকি সকাল দেখেই বোঝা যায়।
ভোট কেমন যাবে, তা-ও নাকি এখন ভোর দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আলো ফুটতেই হাটে-বাজারে, রাস্তার মোড়ে, আড়মোড়া ভাঙা স্টেশনে, গাঁয়ের ঘরে উঁকি দিচ্ছেন ওঁরা। মানে, প্রার্থীরা।
এত তাড়া কেন? অনেকগুলো কারণে। একটা বড় কারণ অবশ্যই গরম। রোদ চড়ার আগে, পাঞ্জাবি-টিশার্ট ঘামে ভিজে জবজবে হওয়ার আগেই ঘরে-বাইরে হাসিমুখটি দেখিয়ে রাখতে চাইছেন প্রার্থীরা। তা ছাড়া, ভোর-ভোর হাজির হতে পারলে ভোটারদের সকলের সঙ্গে দেখা হওয়া নিশ্চিত। আর ভোরবেলা কাজকম্মো শুরুর আগে মানুষের মনও কিঞ্চিৎ বেশি প্রফুল্ল থাকে। ভোরের হাত ধরে জনমনের এই বাড়তি উষ্ণতাটুকু পেতে চাইছেন প্রার্থীরা।
মুর্শিদাবাদ শহরের মতিঝিলে তখনও রাতের আড় ভাঙেনি। মহিলারা মাটির উঠোন নিকাতে ব্যস্ত। কেউ বা সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে বাড়ির সামনে দাঁত মাজছেন। হঠাৎই উদয় হলেন তৃণমূল প্রার্থী মহম্মদ আলি। পরনে ধোপদুরস্ত পাজামা-পাঞ্জাবি। গাড়ি থেকে নেমেই ঢুকে পড়লেন এ বাড়ি-ও বাড়ি। “বেলা বাড়লে ঘোরা কঠিন। তা ছাড়া দুপুরে অনেককে পাওয়াও যায় না। সকালটাই ভাল” বলেই হাঁটা দিলেন আলি।
সাতসকালে প্রচারে বেরিয়ে পড়েছিলেন বাদুড়িয়ার কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুর রহিম দিলুও। সঙ্গে দলীয় কর্মী-সমর্থকেরা। হঠাৎ ঢুকে পড়লেন এক গেরস্তের হেঁসেলে। গৃহকর্ত্রী উঠে দাঁড়ানার সময়টুকুও পাননি। বরং দিলুই সোজা গিয়ে তাঁর পাশে বসে পড়লেন “বৌদি, আমি আপনাদেরই লোক। আশীর্বাদ করুন, যাতে দিল্লিতে গিয়ে আপনাদের অভাব-অভিযোগের কথা বলতে পারি।” বৌদি বললেন, “আশীর্বাদ তো করবই। আগে একটু গ্লুকোজ জল খেয়ে নিন।”
রোদের তেজ নেই। তবু প্রচারে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে এক গ্লাস জল চাইছেন জয়নগর কেন্দ্রের এসইউসি প্রার্থী তরুণ মণ্ডল। আগের বার তাঁর প্রতীক ছিল টর্চ। তৃণমূল জোটের ব্যাটারি ভরা। আলোও জ্বলেছিল। এ বার যে তাঁর প্রতীক জলের গ্লাস, এক-একটা চুমুকেই জানিয়ে দিচ্ছেন তরুণ।
গত বার কলকাতা উত্তরে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে হেরে এ বার রায়গঞ্জে দীপা দাশমুন্সির ডেরায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সিপিএমের মহম্মদ সেলিম। এতটা পথ চলে তিনি হাঁটার মর্ম হাড়ে-হাড়ে বুঝেছেন। সকাল হতেই তাই বেরিয়ে পড়ছেন প্রাতর্ভ্রমণে। সকালে হাঁটা তাঁর অনেক দিনের অভ্যেস। উত্তর দিনাজপুরে তিনি ডেরা নিয়েছেন ইসলামপুরে বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটি লজে। সকাল ৬টার মধ্যেই ১০-১২ জন কর্মীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন। কোনও দিন আশপাশের পাড়া, তো কোনও দিন কিলোমিটার দুয়েক দূরে আলুয়াবাড়ি স্টেশন। প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে চায়ের দোকানে আড্ডা। ট্রেন ধরতে এসে অবাক সমীরণ মণ্ডল-তাহের আলিরা কেউ হেসে মাথা নাড়ছেন, কেউ বাড়িয়ে দিচ্ছেন হাত। দলের কর্মীরা পরিচয় করিয়ে দিতে গেলে ট্রেন থেকে নেমে আসা মামণি সরকার, মৃদুল সাহারা বলে উঠছেন “চেনাতে হবে না। টিভিতে দেখেছি।”
রবিবার সকালে বাসে উঠে প্রচার চালালেন জয়নগরের বামপ্রার্থী সুভাষ নস্কর। অবশ্য তিনিই প্রথম নন। দিন কয়েক আগে প্রচারের জন্য বাস ধরেছিলেন হাওড়া সদরের তৃণমূল প্রার্থী প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ক’দিন আগেই সকালে ট্রেনে উঠে প্রচার চালান বনগাঁর বিজেপি প্রার্থী কে ডি বিশ্বাস। কাকভোরে কালনা স্টেশনে কাটোয়া-হাওড়া লোকাল ধরতে আসা প্রার্থীদের সামনে করজোড়ে হাজির হয়েছিলেন পূর্ব বর্ধমানের সিপিএম প্রার্থী ঈশ্বরচন্দ্র দাস। প্রায়ই সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে হাজির হচ্ছেন সিপিএমের পুলিনবিহারী বাস্কেও। সেখানে চক্কর দিয়ে যাচ্ছেন সব্জিবাজারে। মাঝে-সাজে দাঁড়িপাল্লার সামনে দাঁড়িয়ে দরস্তুরও করেছেন। “প্রতিটি ভোটারের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করতে চাই। তাই সকালের বাজারে এসেছি” জানিয়ে দিলেন পোড় খাওয়া নেতা। একই ছকে খেলছেন তমলুকের বিজেপি প্রার্থী বাদশা আলম বা মেদিনীপুরের সিপিআই প্রার্থী প্রবোধ পান্ডারাও। বাঁকুড়ার সিপিএম প্রার্থী বাসুদেব আচারিয়া বা পুরুলিয়ার ফব প্রার্থী নরহরি মাহাতোরা অবশ্য এখনও সকালের শুরুটা মূলত কর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তার জন্যই রেখে দিয়েছেন।
প্রথম দু’দিন বিকেলে প্রচার চালানোর পরে শনিবারই প্রথম সকালে চণ্ডীতলার পথে বেরোন শ্রীরামপুরের বিজেপি প্রার্থী বাপ্পি লাহিড়ী। যদিও বেশির ভাগ সময়ে তিনি থেকেছেন গাড়িতে। হেঁটেছেন সামান্যই। বিজেপি-র আর এক তারকা প্রার্থী জর্জ বেকারও হাওড়া কেন্দ্রে প্রচারে বেরিয়েছেন সকাল-সকাল। মুচকি হেসে বলেছেন “রোদকে ভয় কী? পুড়লে কালো তো হব না। বড় জোর গোলাপি হয়ে যাব!”
ভোট গেলে কে কত সূর্যোদয় দেখবেন আর প্রাতর্ভ্রমণ বেরোবেন, খোদায় মালুম। তবে তারকা হোন বা আম আদমি, মন্ত্র আপাতত একটাই।
ভোট এল, দোর খোলো, খুকু-খোকা ওঠো রে...