রাজ্যের মোট পঁয়তাল্লিশটি সরকারি কলেজের একটল্লিশটিই চলছে স্থায়ী অধ্যক্ষ ছাড়া। স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগে টালবাহানা নিয়ে ইতিমধ্যেই সরকারের দিকে আঙুল তুলেছে বিরোধী দলগুলি। এবার শূণ্যপদে নিয়োগ ঘিরে বেনিয়মের অভিযোগ উঠল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিরুদ্ধে।
রাজ্যের সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির অভিযোগ, সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগের নিয়ম না মেনেই পাবলিক সার্ভিস কমিশন শূণ্যপদে নিয়োগ সেরে ফেলতে চেয়েছিল। ৪১ টি কলেজে স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য আবেদনের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল পাবলিক সার্ভিস কমিশন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমেই সেই শূণ্যপদে প্রার্থীদের ইন্টারভিউও ডাকা হয়। দেখা যায় আসন সংখ্যা ৪১ হলেও কমিশনের বিচারে যোগ্যতার মাপকাঠি উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৮ জন।
অভিযোগ, কমিশনের এই মাপকাঠিতে আদতে লঙ্ঘন করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশিকাকে। ২০১০ সালে ইউজিসির জারি করা নির্দেশে বলা হয় সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগে আবশ্যিক যোগ্যতামান নির্ণয় করতে হবে চারটি বিষয়কে মাথায় রেখে। প্রথমত আবেদনকারীর পিএইচডি মান আবশ্যিক। স্নাতকোত্তর স্তরে ন্যূনতম ৫৫ শতাংশ নম্বর এবং কমপক্ষে ১৫ বছরের কলেজে অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এছাড়া অন্যতম আবশ্যিক যোগ্যতা হল আকাদেমিক পারফরমেন্স ইন্ডিকেটর বা এপিআই। যাকে কেন্দ্র করেই নিয়োগে বেনিয়মের অভিযোগ উঠেছে পিএসসি-র বিরুদ্ধে।
কী এই এপিআই?
যোগ্যতামানের তিন নম্বর ধারা অনুযায়ী গবেষণাপত্র, গবেষণার বই প্রকাশ, বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প সহ মোট পাঁচটি বিষয় মাথায় রেখে সেই এপিআই নির্ধারণ করা হয়। সেই অনুযায়ী এপিআইতে ন্যূনতম ৪০০ নম্বর না পেলে আবেদনই করা যাবে না অধ্যক্ষ পদের জন্য। সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির অভিযোগ, কমিশনের তালিকায় যাঁরা যোগ্য নির্বাচিত হয়েছেন তাদের কারও ওই ৪০০ নম্বরের এপিআই নেই, অথচ সেটা না থাকলে আবেদন গ্রাহ্যই হওয়ার কথা নয়। তাঁদের আরও অভিযোগ যে আটজনকে নির্বাচন করা হয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রে এই আবশ্যিক যোগ্যতার কোনও কাগজপত্র আদতে খতিয়েই দেখা হয়নি। অথচ খোদ কমিশনের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতেও স্পষ্ট করে জানানো হয়েছিল এই আবশ্যিক যোগ্যতার কথা।
তাহলে কীসের ভিত্তিতে এই নির্বাচন?
সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অনিন্দ্য সেনগুপ্ত প্রশ্ন তোলেন, আবেদনকারীদের অধিকাংশেরই ওই ৪০০ নম্বরের এপিআই নেই। কিন্তু যে কজনের আছে তাদের নির্বাচন না করে যাদের নেই তাদের নাম কমিশনের ওয়েবসাইটে তুলে দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
একেই রাজ্যের বেশিরভাগ সরকারি কলেজগুলোতে স্থায়ী অধ্যক্ষই নেই, যদি বা তা নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছিল তাতেও উঠল বেনিয়মের অভিযোগ। এই অবস্থায় ওই আট নির্বাচিত প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের দাবি তুলেছে সরকারি কলেজের শিক্ষক সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি দেবাশিস সরকার বলেন, ‘‘ইউজিসির নির্দেশিকা, সরকারের নির্দেশিকা, এবং কমিশনের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতেই যে আবশ্যিক যোগ্যতামান উল্লেখ করা হয়েছিল তার বিচ্যুতি ঘটিয়েছে খোদ কমিশন। নিয়ম বহির্ভূত এই নির্বাচন পদ্ধতি বাতিল এবং নতুন করে বিজ্ঞপ্তি জারির দাবি জানিয়েছি আমরা।’’ সেপ্টেম্বর মাসেই দু’বার উচ্চশিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে এই দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন তাঁরা। দাবি পৌঁছেছে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান সইদুল ইসলামের কাছেও।
যদিও পিএসসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে বলেন, ‘‘আমরা সমস্ত নথি খতিয়ে দেখেই নাম নির্বাচন করেছি। একথা ঠিক যে সমস্ত ফাঁকা আসন আমরা পূরণ করতে পারিনি, তবে যে অভিযোগ উঠছে তা সত্য নয়।’’ বাকি শূণ্য আসনগুলোর ভবিষ্যত নিয়ে অবশ্য এখনই কোন পরিকল্পনা করা হয়নি। তবে উচ্চশিক্ষা দফতরের তরফে নির্দেশ এলেই নতুন করে জারি হবে বিজ্ঞপ্তি—জানান সইদুলবাবু।