কথা আর চিঠি ফ্লপ, এ বার সরকার অভিযোগ নেবে ইমেল-এসএমএসে

পুজোর প্রণামী জমা করার বাক্সের মতো রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় রাখা বড় বড় ‘কমপ্লেন বক্স’। প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ বা বিশেষ কিছু মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি জানাতে হলে সেটা লিখে বাক্সে ফেলতে হবে। এমনটা চালু করেছিলেন শিবাজী রাও। বাস্তবে নয়, ‘নায়ক’ ছবিতে।

Advertisement

তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০১৫ ১৯:১৩
Share:

পুজোর প্রণামী জমা করার বাক্সের মতো রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় রাখা বড় বড় ‘কমপ্লেন বক্স’। প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ বা বিশেষ কিছু মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি জানাতে হলে সেটা লিখে বাক্সে ফেলতে হবে। এমনটা চালু করেছিলেন শিবাজী রাও। বাস্তবে নয়, ‘নায়ক’ ছবিতে।

Advertisement

আর কতকটা যেন সেই ঢঙেই এ বার বাস্তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার নাগরিকদের সুষ্ঠু পরিষেবা দিতে চেয়ে তাঁদের কাছ থেকে ই-মেল ও এসএমএস মারফত অভিযোগ গ্রহণ করতে চাইছে। রাজ্য সরকার জানাচ্ছে, সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে ত্রুটি ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ থাকলে কেউ banglarmukh.gov.in এ ই-মেল করতে কিংবা ১৬৬ নম্বরে এসএমস করতে পারেন, যেখানে অভিযোগকারীর নাম, ঠিকানা-সহ বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করা থাকবে।

বিধানসভা নির্বাচন যখন আসন্ন, তখন হঠাৎ এই ব্যবস্থা চালু করতে চলেছে কেন তৃণমূল সরকার?

Advertisement

নবান্ন সূত্রের খবর, প্রশাসনের সদর দফতরে বসে সরকার চালাবেন না, সে কথা জানিয়ে গত সাড়ে চার বছরে জেলায় জেলায় বৈঠক করায় মুখ্যমন্ত্রী সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন। কিন্তু তার পরেও আমজনতার কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছনো তো দূরের কথা, অনেক সময়েই সেটা সংশ্লিষ্ট দফতরের চৌকাঠ পর্যন্ত পেরোচ্ছে না। তাই, সাইবার দুনিয়ায় এক রকম জন অভিযোগ সেল খুলতে চাইছে রাজ্য সরকার।

কিন্তু প্রশাসনের অন্দরেই প্রশ্ন, এটা আদৌ কার্যকর হবে কি?

Advertisement

কারণ, সরকারের একটি সূত্রের বক্তব্য, ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে নিয়মিত জনতার দরবার বসত। যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের আধিকারিকেরা হাজির থেকে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনতেন। এখন মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের দু’-এক জন যান বটে, কিন্তু জনতার দরবারে জনতাই উপস্থিত থাকে না বললে চলে। কারণ, বার বার বলেও সুরাহা না হওয়ায় তাঁরা যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন বলে প্রশাসনের কর্তাদের একাংশই স্বীকার করে নিচ্ছেন। আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পরই সিএমও-তে যে রকম চিঠির পাহাড় জমত, তাতেও ভাটা পড়েছে। আবার তথ্য জানার অধিকার আইনে চিঠি দিয়েও হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে হচ্ছে বহু মানুষকে।

অর্থাৎ চালু এই সব ব্যবস্থার মাধ্যমেই যেখানে আমজনতার বিভিন্ন অভিযোগে সরকার তেমন আমল দিতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে, সেখানে শুধু এসএমএস আর ই-মেলে সেই একই ধরনের অভিযোগ পেয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কী ভাবে দূর হবে, তা নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে।

তবে অক্টোবর মাসে রাজ্যের তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের সচিব অত্রি ভট্টাচার্য জন অভিযোগ পেলে সুরাহা দিতে কী করতে হবে, সেই সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে জানিয়েছেন অন্যান্য দফতরকে। কারণ, রাজ্য সরকারের ওয়েবসাইট ‘বাংলার মুখ’-কে ঢেলে সাজাচ্ছে তথ্য-সংস্কৃতি দফতর এবং এসএমএস ও ই-মেলে অভিযোগ গ্রহণ তারই অঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর রয়েছে।

তথ্য-সংস্কৃতি সচিবের চিঠিতে বলা হয়েছে, ই-মেল, এসএমএসে আসা সব অভিযোগ পত্রপাঠ খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর ওই দফতরের নোডাল অফিসার বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় সচিবের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হবেন। নির্দিষ্ট যে বিষয়ে অভিযোগ, সেই বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের বক্তব্যও নিতে হবে। যে দফতরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা পরিষেবা নিয়ে অভিযোগ, সেই দফতরই উত্তর দেবে অভিযোগকারীকে।

তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের সচিব লিখেছেন, ‘সংশ্লিষ্ট দফতরকে চারটি কাজের দিনের মধ্যেই অভিযোগের প্রাথমিক জবাব দিতে হবে। তার মধ্যে সমস্যা না মিটলে অভিযোগকারীকে জানিয়ে দিতে হবে, কত দিনের মধ্যে সমস্যা মেটানো যাবে।’

ক্ষমতায় এসে ২২টি দফতরে বিভিন্ন পরিষেবা নিয়ে জন পরিষেবা আইন চালু করেছিলেন মমতা। যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল, দ্রুত সরকারি পরিষেবা জনতার কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু তাতে আশানুরূপ ফল মেলেনি বলে প্রশাসনের কর্তাদের একাংশ স্বীকার করছেন।

কিন্তু অভিযুক্ত কোনও বিভাগ সময় মতো উত্তর দিতে না পারলে বা সুরাহা না দিতে পারলে তার কর্তাদের কোনও রকম শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে কিনা, সেই বিষয়ে অত্রি ভট্টাচার্যের চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ নেই।

এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশাসনের কর্তাদের একাংশের পাশাপাশি বিরোধীরাও সন্দিহান।

সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিমের কথায়, ‘‘যে সরকার কোনও সমালোচনাই শুনতে চায় না, তারা আবার কী অভিযোগের সমাধান করবে?’’ বিজেপি বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘‘মানুষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ তোলাবাজ বা মস্তানরাজের বিরুদ্ধে। আগে তো সে সব নিয়ন্ত্রণে আনুক সরকার।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement