আমার পড়শি

খেলে ফেরার পথে ভূতের ভয়ে রামনাম

আমার জন্ম উত্তর কলকাতার টালা এলাকায়। ১৯৫০ সালে। শৈশব কেটেছে পাইকপাড়ায় ভাড়াবাড়িতে। ঠাকুমা, বাবা-মা, পাঁচ ভাই আর এক বোনের সংসার। বাবার ছোট একটা গয়নার দোকান ছিল। সেই খরচে আমাদের পড়াশোনা থেকে সংসার চালানো সব করতে হত। অসচ্ছ্বল ছিল আমাদের পরিবার।

Advertisement

সুধীর কর্মকার

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০১৬ ০৩:০০
Share:

পেলের আলিঙ্গনে সুধীর।

আমার জন্ম উত্তর কলকাতার টালা এলাকায়। ১৯৫০ সালে। শৈশব কেটেছে পাইকপাড়ায় ভাড়াবাড়িতে। ঠাকুমা, বাবা-মা, পাঁচ ভাই আর এক বোনের সংসার। বাবার ছোট একটা গয়নার দোকান ছিল। সেই খরচে আমাদের পড়াশোনা থেকে সংসার চালানো সব করতে হত। অসচ্ছ্বল ছিল আমাদের পরিবার। ছোটবেলায় আর পাঁচটা ছেলের মতোই ইস্কুল যাওয়া, দুষ্টুমি করা— সবই ছিল।

Advertisement

তখন পাইকপাড়ার যুগের যাত্রী ক্লাবের খুব নামডাক। ৮-১০ বছর বয়সে সেখানেই ফুটবলের হাতেখড়ি। ক্লাবের সেক্রেটারি নিশীথ বন্দ্যোপাধ্যায় এক দিন বল পেটানো দেখে আমাকে ক্লাবে নিয়ে যান। মুশকিলটা হল, বাবা খেলাধুলো পছন্দ করতেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল, হয় পড়া, না হলে কাজ। বাবা কাজে গেলে পাশের মাঠে গিয়ে আমি আর দাদা সুশীল কর্মকার খেলতাম। প্রায়ই বাবা মাঠে গিয়ে কান ধরে বাড়ি নিয়ে যেত। ছোট থেকে ফুটবলটাই ভাল লাগত। সবাই এক আনা-দু’আনা দিয়ে বল কিনতাম। অকৃতদার নিশীথদা আমাদের দুই ভাইকে ছেলের মতো ভালবাসতেন। বুট, প্যান্ট কিনে দিতেন। টিফিন খাওয়াতেন। রেডিওতে খেলার রিলে শুনতাম। শৈলেন মান্না, চুনি গোস্বামী, জার্নেল সিংহ, তুলসিদাস বলরামদের খেলা। আমরা নিজেদের মধ্যে চুনি-বলরাম-জার্নেল সেজে খেলতাম। রেডিওতে মান্নাদার খেলার বর্ণনা শুনে দারুন লাগত। ওঁর মতো দূর থেকে অভ্রান্ত নিশানায় বল মারার শখ হত। তাই আমি মান্নাদা সাজতাম। ছোটদের ফুটবল খেলতে কলকাতা-সহ নানা জায়গায় গিয়েছি। আমাদের খেলা থাকলে চন্দননগরের মাঠ ফেটে পড়ত। মান্নাদা একটা টুর্নামেন্টে অতিথি হয়ে এসেছিলেন। তিনি আমাকে ম্যাচের বেস্ট প্লেয়ার নির্বাচিত করেন। পাইকপাড়ায় যেখানে থাকতাম, তার চারপাশে সব দোতলা-তিনতলা বাড়ি। আমাদের ভাড়াবাড়িটাই শুধু টিনের চাল, মাটির দেওয়ালের। একটা ঘরেই সবাই মিলে থাকতাম। ১৬ টাকা বাড়িভাড়া।

১৯৬৪ সালে রিষড়ার ৩ নম্বর নতুনগ্রামে ১০ কাঠা জমি কেনেন বাবা। তখন পাকাপকি ভাবে এখানে চলে আসি। আমরা পূর্ববঙ্গের মানুষ। আদিবাড়ি ঢাকায়। রিষড়ার বাড়িটা খেজুর আর লেবু গাছে ভর্তি ছিল। খেজুরবাগান বললেই রিকশাচালক নিয়ে আসতেন। আমি পাইকপাড়ার স্কুলেই পড়তাম। বাড়ি থেকে হেঁটে স্টেশনে যেতাম। কাঁচা রাস্তা। স্টেশনের একটু আগে পাকা রাস্তা। তার পরে ট্রেনে চেপে হাওড়া।

Advertisement

ফেরার সময়ে শোভাবাজারে বাবার দোকানে চলে যেতাম। কোনও দিন একটু আগে হলে একা ফিরতাম। তাতে অবশ্য ঝুঁকি ছিল। কারণটা হল বাড়ির সামনের বাঁশঝাড়। বাড়িতে ঠাকুমা গল্প বলতেন। দেশের বাড়ির গল্প। তাতে অবধারিত ভাবে ভূতের প্রসঙ্গ আসত। চোখ ছানাবড়া করে শুনতাম। একা ফেরার সময় সে সব কানে বাজত। ফাঁকা এলাকা। রাস্তায় আলোও ছিল না। সন্ধের পরে জনপ্রাণী থাকত না। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর বাঁশঝাড়ে সাংঘাতিক ভয় করত। ভূতের ভয়। স্টেশন ছেড়ে কিছুটা এগিয়েই কার্যত চোখ বুজে হনহন করে হাঁটতাম। দু’পাশে ভুলেও তাকাতাম না। ঠাকুমা শিখিয়ে দিয়েছিল, ভূতের ভয় লাগলে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ বলতে। জোরে জোরে তাই বলতাম। বাড়ির অনেকটা আগে চেঁচিয়ে মাকে ডাকতে শুরু করতাম।

তখন স্কুল-গেমস খেলছি। গেম টিচার হীরামোহন মুখোপাধ্যায়ের কাছে আমার আর দাদার সাত খুন মাফ ছিল। বলতেন, ‘জান দিয়ে খেল। পাশ করা নিয়ে ভাববি না।’ স্কুল শেষে মাঠে প্র্যাকটিস করে তবে বাড়ি ফিরতাম। স্যার একটা মিষ্টির দোকানে বলে রেখেছিলেন। দুপুরে সেখানে খেয়ে নিতাম। পাইকপাড়া থেকে হাওড়া বাসভাড়া ছিল ২ আনা। পয়সা না থাকলে স্যার দিয়ে দিতেন। রিষড়ায় আমাদের বাড়ির চারপাশে ধানখেত ছিল। খাটাল ছিল। বাড়িতে থাকলে এক বন্ধুকে নিয়ে জয়শ্রীর মাঠে চলে যেতাম। ওকে গোলে দাঁড় করিয়ে দুমদাম শট মারতাম। মান্নাদার মতো মারতে চাইতাম। ওই মাঠে রিষড়া অরোরা ক্লাব প্র্যাকটিস করত। এক দিন আমি আর দাদা ওদের প্র্যাকটিস দেখছি। একটা বল বাইরে এলে দাদা এমন ভলি করল, সে দিনই ওরা দাদাকে ডেকে নিল। নিশীথদার কথায় উত্তরপাড়ার সিএ ক্লাবে খেলি। সেটা ’৬৫ সাল। পরের বছর আমিও অরোরায় ঢুকি। ক্লাব-সেক্রেটারি শ্যামসুন্দরদা আমাদের খুব ভালবাসতেন। নানা ব্যাপারে সাহায্য করতেন। সাব-ডিভিশনে চান্স পেয়ে গেলাম। চুঁচুড়া মাঠে আমার ছোটখাট চেহারা দেখে ক্যাপ্টেন পাত্তা দিতে চাননি। মাঠে অবশ্য ভালই খেলেছিলাম। একটা ম্যাচের পরে রাইফেল ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ডেকে চাকরি দেন। আড়াইশো টাকা মাইনে। গঙ্গা পেরিয়ে যেতে হবে বলে বাবা-মা অবশ্য প্রথমে আপত্তি করেছিলেন। সে বার জোনাল চ্যাম্পিয়ন হই। চুঁচুড়ায় হগলি জেলা দলের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের খেলা ছিল। ইস্টবেঙ্গল টিম নিয়ে এসেছিলেন জ্যোতিষ গুহ। আমার খেলা দেখে সে দিনই বাড়িতে লোক পাঠিয়েছিলেন আগরতলায় প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে নিয়ে যাবেন বলে। পাকেচক্রে অবশ্য যাওয়া হয়নি।

’৬৭ সালে কলকাতা লিগের ফার্স্ট ডিভিশনের টিম বালি প্রতিভায় নাম লেখাই। সে বার দলবদলের এক মাস আগে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব থেকে এক জন বা দু’জন রোজ আমাদের বাড়িতে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতেন। মনে ইস্টবেঙ্গল খেলার স্বপ্ন। কিন্তু বালি প্রতিভার সিনিয়ররা বুঝিয়েছিলেন, বড় ক্লাবে জুনিয়রদের চান্স পাওয়া কঠিন। দলবদলের প্রথম দিনই বালি প্রতিভায় সই করি। বাড়িতে এসে দেখি জ্যোতিষদা লোক পাঠিয়েছেন। তার পরে ইস্টবেঙ্গল আর ডাকল না। ভেবেছিলাম আর বোধ হয় ডাকবে না। পরে (১৯৬৯ সাল) ইস্টার্ন রেল ট্রেনে গার্ডের চাকরির অফার দিল। জানতে পেরে জ্যোতিষদা ফের লোক পাঠালেন। বললেন হাফে খেলানো হবে আমাকে। টাকা নিয়ে ভাবিনি। ওই বছর থেকে টানা ’৭৬ সাল পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গলে খেলি। পরের তিন বছর মোহনবাগানে। ’৮০ সালে ইস্টবেঙ্গলে ফিরে আসি। অবসর নিই ’৮৩ সালে।

রিষড়ার লোক আমাকে চিনল ইস্টবেঙ্গলে সই করার পরে। আমার খেলা থাকলে বাবাও রেডিও হাতে বসে থাকতেন। তখনও সময় পেলে গুলতি হাতে বেরিয়ে পড়ি। পায়রা মেরে মাংস খাই। বন্ধুদের সঙ্গে সতঘড়া পর্যন্ত চষে বেরিয়ে গাছে উঠে আম, আমড়া, ডাব পেড়ে খাই। তখন বাড়িতে কারেন্ট ছিল না। হ্যারিকেনই ভরসা। সন্ধ্যায় পড়ার ফাঁকে খেজুর গাছে উঠে হাঁড়ি থেকে রস খেতাম। সন্ধ্যার খেজুর রস যাঁরা খেয়েছেন, তাঁরাই এর মহিমা জানেন। টিনের চালের ঘরে গরমে শুতে কষ্ট হত। পেয়ারা গাছ বেয়ে চালে উঠে শুতাম। ভূতের ভয়টা শুধু জয় করতে হত। সে জন্য পাশের তালগাছের দিকে তাকাতাম না। বর্ষায় রাস্তাঘাট জলে ভরে যেত। প্যান্ট গুটিয়ে জুতো হাতে নিয়ে হাঁটতে হত। তবে বাড়িতে থাকলে অন্য মজা। গামছা দিয়ে মাছ ধরতাম। শোল, ল্যাটা এই সব। ’৭১ সালে বাড়িতে বিদ্যুৎ আসে।

ম্যাচ জিতে ফিরলে স্টেশনের সামনে মালা হাতে লোক দাঁড়িয়ে থাকত। যত রাতই হোক। হারলে অবশ্য রাত করে ফেরা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। ট্রেনে খবরের কাগজ পড়ার ছলে মুখ লুকোতে হত। তখন আমরা হাতে স্লিপ লিখে দিলে সমর্থকেরা তা দেখিয়ে ইস্টবেঙ্গল মাঠে খেলা দেখতে ঢুকতে পারতেন। গেটম্যানরা বলতেন, আমিই নাকি সবচেয়ে বেশি স্লিপ পাঠাই। দলবদলের দিন মোহনবাগানের গজু বসু বাড়িতে ধর্না দিতেন। বলতাম, ডবল টাকা দিন, তবে ইস্টবেঙ্গল ছাড়ব। পরে অবশ্য ওই ক্লাবে খেলেছি। সে জন্য পেলের বিপক্ষেও খেলতে পেরেছি। আমার উচ্চতা খুব বেশি না হলেও মাঠে হেড করতে সমস্যা হত না। কেন না, আমার স্পট জাম্প খুব ভাল ছিল। ঘরে টিনের চালের নীচে মাচায় ঘরকন্নার জিনিস থাকত। মাচাটা আমার থেকে এক-দেড় ফুট উঁচুতে ছিল। লাফিয়ে ওখানে মাথা ছোঁয়ানোর চেষ্টা করতাম।

এক বার ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক থাকার সময়ে মাংস খেয়ে ফুড পয়জন হয়েছিল। হেঁচকি উঠছিল। ভোরবেলা ডাক্তার মৈনাক চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে এলেন। বললাম, ডাক্তারাবু আমাকে ফিট করে দিন। যে করেই হোক খেলতে হবে। ডাক্তার বললেন, এই অবস্থায় খেলা সম্ভব নয়। মাথায় বাজ পড়ল। ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল সেক্রেটারি অজয় শ্রীমানি বাড়িতে চলে এলেন। ডাক্তার এবং বাড়ির লোকের নির্দেশ অমান্য করেই মাঠে নেমেছিলাম। মৈনাকবাবু আমার সঙ্গে মাঠে গিয়েছিলেন। মোহনবাগান জানত, অসুস্থ থাকায় মাঠে নামতে পারব না। আমাকে মাঠে দেখে ওরা অবাক হয়ে যায়। ম্যাচটা ২-০ জিতেছিলাম।

(সঙ্গের ছবিটি সুধীর কর্মকারের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement