ফিল্মি কায়দায় পাকড়াও সারদার আর এক কর্তা

ব্যবসার কাজে শনিবার দুপুরে হাওড়ার সাঁতরাগাছি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎই একদল লোক তাঁকে ঘিরে ঘাড় ধরে নিমেষে গাড়িতে তুলে নিয়ে রওনা দিল কলকাতার দিকে। কার্যত ফিল্মি অপহরণের কায়দাতেই সারদা রিয়েলটি সংস্থার প্রাক্তন ডিরেক্টর শিবনারায়ণ দাসকে গ্রেফতার করল সিবিআই। সিবিআই জানাচ্ছে, সারদার দায়িত্ব ছেড়ে শিবনারায়ণ নিজে ‘সিলিকন’ নামে একটি অর্থলগ্নি সংস্থা খুলেছিলেন।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৫ ০৩:২২
Share:

ধৃত সারদা-কর্তা শিবনারায়ণ দাস। —নিজস্ব চিত্র।

ব্যবসার কাজে শনিবার দুপুরে হাওড়ার সাঁতরাগাছি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎই একদল লোক তাঁকে ঘিরে ঘাড় ধরে নিমেষে গাড়িতে তুলে নিয়ে রওনা দিল কলকাতার দিকে। কার্যত ফিল্মি অপহরণের কায়দাতেই সারদা রিয়েলটি সংস্থার প্রাক্তন ডিরেক্টর শিবনারায়ণ দাসকে গ্রেফতার করল সিবিআই।

Advertisement

সিবিআই জানাচ্ছে, সারদার দায়িত্ব ছেড়ে শিবনারায়ণ নিজে ‘সিলিকন’ নামে একটি অর্থলগ্নি সংস্থা খুলেছিলেন। যদিও এ দিন তাঁকে সারদা রিয়েলটি মামলাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার মুখপাত্র কাঞ্চন প্রসাদ জানিয়েছেন, সারদা রিয়েলটি মামলায় শিবনারায়ণকে খোঁজা হচ্ছিল। তাঁকে নোটিস দেওয়া হলেও হাজির হননি। তাই তদন্তকারীদের একটি দল তাঁর উপরে নজর রাখছিল। এ দিন তাঁকে পাকড়াও করে সিজিও কমপ্লেক্সে সিবিআই দফতরে আনা হয়। সেখানেই গ্রেফতার করা হয় শিবনারায়ণকে। সিবিআই জানিয়েছে, সারদার ওই প্রাক্তন ডিরেক্টরের কাছ থেকে একটি গুলি ভর্তি রিভলভার মিলেছে।

হাওড়ার পাশাপাশি এ দিন সিবিআই তল্লাশি চালায় উত্তর ২৪ পরগনাতেও। ‘উইন রিয়েলকন’ নামে একটি অর্থলগ্নি সংস্থার ডিরেক্টরদের খোঁজে ব্যারাকপুরে ওই সংস্থার সদর দফতর-সহ ন’টি জায়গায় তল্লাশি করেন গোয়েন্দারা। কিন্তু কাউকেই ধরা যায়নি। তদন্তকারীরা বলছেন, উইন রিয়েলকন নামে সংস্থাটি ২০১১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে তৈরি হয়। বন্ধ হয়ে যায় ২০১৩ সালে। ওই দু’বছরে তারা বাজার থেকে কত টাকা তুলেছিল তার হিসেব অবশ্য সিবিআই দেয়নি।

Advertisement

হাওড়ার ধাড়সা মনসাতলার বাসিন্দা শিবনারায়ণ যে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। তাঁরা জানান, বছরখানেক আগেই ঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকা ছাড়েন সিলিকন-কর্তা।

কে এই শিবনারায়ণ দাস? পুলিশ বলছে, ২০১৩ সালে কলকাতা ছেড়ে পালানোর আগে সারদা-কর্তা সুদীপ্ত সেন সিবিআইকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তাতে শিবনারায়ণকে তিনি অর্থলগ্নি ব্যবসায় নিজের গুরু বলে কবুল করেছিলেন। সুদীপ্ত সিবিআইকে জানান, শিবনারায়ণই তাঁকে ওই ব্যবসায় নিয়ে আসেন। সারদা রিয়েলটি ও ওই সংস্থার ম্যানেজমেন্টও শিবনারায়ণেরই হাতে তৈরি। পরে অবশ্য সারদা ছেড়ে নিজেই অর্থলগ্নি সংস্থা খুলে বসেন।

সিবিআই সূত্রের খবর, সারদার ডিরেক্টর হওয়ার আগে শিবনারায়ণ অর্থলগ্নি সংস্থাতেই কাজ করতেন। সেই সূত্রে বেশ কিছ রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগ ছিল তাঁর। নিজের সংস্থা তৈরিতে তিনি সেই প্রভাবশালীদেরই কাজে লাগান বলে সিবিআই সূত্রে খবর। তদন্তকারীদের একাংশ বলছেন, শিবনারায়ণের সঙ্গে হাওড়া আদালতের এক আইনজীবী ও ওই জেলারই এক তৃণমূল নেতার ঘনিষ্ঠতা ছিল। অর্থলগ্নি কারবারে ওই দু’জনের কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখবে সিবিআই।

গোয়েন্দারা জেনেছেন, সুদীপ্ত সেনের মতো শিবনারায়ণও বছর তিনেক আগে সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায় নেমেছিলেন। সেখানে হাওড়া আদালতের ওই আইনজীবীকে উচ্চ পদে বসিয়েছিলেন তিনি। হাওড়া পুলিশের একটি সূত্র বলছে, শিবনারায়ণের গাড়ির ব্যবসাও ছিল। এ দিন সেই ব্যবসার সূত্রেই গাড়ি ভাড়ার টাকা নিতে তিনি সাঁতরাগাছি স্ট্যান্ডে এসেছিলেন। শিবনারায়ণ যে টাকা নিতে আসবেন সে খবর আগেই পেয়েছিল সিবিআই। সেই মতোই ছক কষেছিল তারা।

হাওড়ায় শিবনারায়ণকে ধরতে পারলেও উত্তর ২৪ পরগনায় সিবিআই যাওয়ার আগেই উইন রিয়েলকনের সকলে গা ঢাকা দেন। এ দিন উত্তর হাবরার অরবিন্দ রোডে জয় ভৌমিকের বাড়ি গিয়ে তাঁর দেখা মেলেনি। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার জয়কে সিজিও কমপ্লেক্সে দেখা করতে বলেছে সিবিআই। স্থানীয় সূত্রের খবর, জয়কে প্রতিবেশীরা কট্টর তৃণমূল কর্মী হিসেবেই জানেন। বহু মিটিং-মিছিলেও তাঁকে দেখা গিয়েছে। জেলাস্তরের এক নেতার ঘনিষ্ঠ বলেও পরিচিত জয়। এমনকী, উইন রিয়েলকন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগেও এক বার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছিল।

দেখা মেলেনি ওই সংস্থার অন্য দুই ডিরেক্টর হাবরার বুড়ির মাঠ এলাকার বাসিন্দা রাজু দে এবং কামারথুবার রাজীব দেবনাথেরও। ওই দু’জনের পরিবার এ নিয়ে কথা বলতে চাননি। তবে স্থানীয় সূত্রে খবর, রাজীব দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখন কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বুড়ির মাঠ এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, উইন রিয়েলকন ছাড়াও আরও একটি অর্থলগ্নি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রাজু। এ দিনই টিটাগড়ে উইন রিয়েলকনের আর এক ডিরেক্টর রণবীর দাসের বাড়িতেও হানা দেয় সিবিআই। তাঁরও খোঁজ মেলেনি।

সারদা কেলেঙ্কারিতে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার সময় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, এই মামলায় বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের খোঁজ করতে হবে। সিবিআই বলছে, সেই লক্ষ্যেই শিবনারায়ণ ও রিয়েলকনের ডিরেক্টরদের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তদন্তকারীদের একটি অংশ বলছে, ২০১১ থেকে রাজ্যের নানা প্রান্তে বহু ভুঁইফোড় অর্থলগ্নি সংস্থা গজিয়ে উঠেছিল। সারদার ধারেকাছে পৌঁছতে না পারলেও বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা তুলেছিল ওই সংস্থাগুলি। সারদার ঝাঁপ বন্ধ হতেই পাততাড়ি গুটোয় তারাও। তদন্তকারীদের সন্দেহ, সারদার মতো বড় সংস্থার টাকা পাচারের জন্যই একাধিক ছোট সংস্থা খোলা হয়েছিল। সেটাই এ বার খতিয়ে দেখবে সিবিআই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement