—ফাইল চিত্র।
ফড়েদের বাগে আনতে কিসান মান্ডি তৈরি করে চাষিদের সরাসরি আলু আর সব্জি বিক্রির সুযোগ করে দিতে চেয়েছিল রাজ্য সরকার। রাজ্যে এখন মোট মান্ডির সংখ্যা ১৮০টি। কাজ শেষ হয়ে চালু হয়ে গিয়েছে ১০৫টি। বাকিগুলি নির্মীয়মাণ।
কিন্তু বিধি বাম। খোলা বাজারে আলুর দাম বাড়লেও তা চাষির পকেটে ঢুকছে কোথায়?
সোমবার ৫০ কিলোর বস্তা পিছু জ্যোতি আলুর দর গিয়েছে ৪০০ টাকা। চাষিদের দাবি, উৎপাদনের খরচ ধরে জ্যোতি আলু বিক্রি করে বস্তা পিছু ৫০ থেকে ৬০ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। যদিও এখন কলকাতা থেকে বর্ধমান, মালদহ থেকে শিলিগুড়ি, খোলা বাজারে জ্যোতি আলুর দাম প্রতি কিলোয় ১০ টাকা থেকে ১৪ টাকায় ঘোরাফেরা করছে। গত কয়েক সপ্তাহে জ্যোতি আলুর দাম বাড়লেও তার সুবিধা পাচ্ছেন না চাষিরা। বর্ধমানের জামালপুরের চাষি কল্যাণ দে-র আক্ষেপ, ‘‘শুধু আলুর দাম নয়, আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে হিমঘরে রাখা আলুর কাগজের (বন্ড) দামও। কিন্তু ফড়েরাই লাভের গু়ড় খেয়ে যাচ্ছে।’’
রাজ্যের কৃষি বিপণন মন্ত্রী অরূপ রায় বলেন, ‘‘আলুর বাজার এখন আগের থেকে অনেকটাই উঠেছে। চাষিরা যাতে দাম পান সেই লক্ষ্যেই কৃষক মান্ডি তৈরি হয়েছে। ফালাকাটা বা পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরে কৃষক মান্ডি সফল ভাবে কাজ করছে। তবে বাম আমল থেকেই আলুর বিপণনের যে চালু ব্যবস্থা আছে তা তো এখনও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবু আমরা চেষ্টা করছি।’’
মন্ত্রী যতই আশ্বাসই দিন, কিসান মান্ডি এড়িয়েই কিন্তু লাভের কড়ি ফড়েদের পকেটে যাচ্ছে। চাষিদের আক্ষেপ, খোলা বাজারে আলুর দাম বাড়লেও তাঁদের লাভ নেই। চলতি মরসুমে মাঠে আলু বিক্রি করে দাম মেলেনি। হিমঘরে আলু রেখে বন্ড বিক্রি করেও এক পরিস্থিতি। বর্ধমানে কালনা ১ ব্লকের চাষি প্রদীপ ঘোষ, মেমারির তক্তিপুরের গিয়াসুদ্দিন শেখরা বলেন, “মাঠ থেকে আলু বিক্রি হয়েছিল ১৩০-১৪০ টাকা প্রতি প্যাকেট (৫০ কেজি)। আট-ন’মাস পরে সেই আলুর বন্ড বিক্রি করতে গিয়ে দাম পাওয়া গিয়েছে ১৫৫-১৭৫ টাকা।” এখন এই কম দামেই বন্ড বিক্রি না করলে পরে তা আদৌ বিক্রি হবে কি না তা নিয়েও উদ্বিগ্ন চাষিরা।
রাজ্য হিমঘর সমিতির অন্যতম সম্পাদক পতিতপাবন দে বলেন, “চাষিরা এখনও পর্যন্ত আলু বিক্রি করে লাভের মুখ দেখতে পাননি।’’ সোমবার হুগলির খোলা বাজারে জ্যোতি আলুর ৫০ কিলোর বস্তার দাম ছিল ৪০০ টাকা। কিন্তু চাষিরা আলু বিক্রি করছেন ২৫০-৩০০ টাকা বস্তা দরে। ধনেখালির আলু ব্যবসায়ী কৃশানু সিমলাই বলেন, ‘‘কিছু দিন আগে দেড়শো টাকায় কাগজ (বন্ড) বিক্রি করেছি। আজ করলাম ৩১০ টাকায়। তাতেও আমার আলুর বস্তা প্রতি ৫০ টাকা ক্ষতি হল।’’
কেন এই পরিস্থিতি?
বন্ডের হাতবদল রোখা যাচ্ছে না বলেই চাষির পকেটে কড়ি ঢুকছে না, বলছেন অভিজ্ঞ চাষিরা। রাজ্যের হিমঘরগুলিতে এখন মূলত চাষিদেরই আলু আছে। কেননা, গত বার অতিরিক্ত ফলন হওয়ায় এ বার আলু ব্যবসায়ীরা ক্ষতির আশঙ্কায় আলুর পিছনে টাকা লগ্নি করেননি। জলদি আলু সে ভাবে চাষ হয়নি। হিমঘরে মজুত আলু দিয়েই ঘাটতি মেটানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে, অসম, ও়ড়িশা-সহ অন্যান্য পড়শি রাজ্যে, এমনকী চোরাপথে বাংলাদেশেও পশ্চিমবঙ্গের আলু ঢুকছে।
আর, তার ফলেই আলু ব্যবসায়ী ও ফড়েরা চটজলদি পয়সা লাগিয়ে কিছু লাভ করে নেওয়ার চেষ্টায় বন্ড কিনছেন। তাই বাজারে আলুর বন্ডের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। অভিজ্ঞ চাষি কাশীনাথ পাত্র বলেন, ‘‘বাজারে ওরা এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে, যে সেখানে ছোট চাষিদের ঘেঁষতে দেওয়া হয় না। আলু হিমঘর থেকে বের করে তা শুকোনো, বাছাই ও বস্তাবন্দি করার একটা বড় প্রক্রিয়া রয়েছে। সেখানে ছোট বা প্রান্তিক চাষিদের ঠাঁই নেই।’’ তাঁর আক্ষেপ, ‘‘আলুর বিক্রির এই ‘মার্কেট চেন’-এর বাইরে কেউ যেতে পারে না। চাষিরা এই ব্যবস্থার শিকার।’’
আলু ব্যবসায়ী সমিতিগুলি অবশ্য দাবি করছে, হিমঘর থেকে আলু বাজারে পৌঁছনোর জন্য প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। চাষির কাছ থেকে ‘ফ্রি-বন্ড’ কেনার পরে হিমঘর বাবদ ৭৪ টাকা ৭৫ পয়সা দিতে হয়। তার পরে ৫০ কিলোর বস্তা প্রতি ১ টাকা মজুরি। আলু শুকোনো এবং বাছাইয়ে প্রতি বস্তায় ৫ টাকা খরচ। প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য কমিটির সদস্য সুনীল ঘোষের দাবি, “আলুর কিনে ব্যবসায়ীকে অন্তত ১১০-১২০ টাকা খরচ করতে হয়। খুচরো ব্যবসায়ীরা বেশি লাভ রেখে আলু বিক্রি করেন।”
খুচরো ব্যবসায়ীদের পাল্টা বক্তব্য, “আমাদের কাছে যে বস্তা আসে তাতে ছোট-বড় নানা মাপের আলু থাকে। বাছতে হয়। না হলে ক্রেতারা নিতে চান না। তাই ওইটুকু লাভ রাখতেই হয়।”
ছবিটা অতএব পাল্টায়নি। আলুর দাম পড়ুক বা উঠুক, ছোট চাষিদের লোকসান আর মেটে না।