বিডিও কল্লোল আত্মঘাতীই, কমিশন রিপোর্টে উলটপুরান

বিরোধী দল হিসাবে তাদের অভিযোগ যে ঠিক ছিল না, শাসক দল হয়ে তা মেনে নিতে হল তৃণমূলকে!

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৫:৩৪
Share:

বিরোধী দল হিসাবে তাদের অভিযোগ যে ঠিক ছিল না, শাসক দল হয়ে তা মেনে নিতে হল তৃণমূলকে!

Advertisement

নন্দীগ্র্রাম-উত্তর পর্বে তখন উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। সাত বছর আগে সেই পর্বেই নতুন তাপ যোগ করেছিল এক ডব্লিউবিসিএস অফিসারের অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংবাদ। তৎকালীন শাসক দল সিপিএমের নেতা-বিধায়ক এবং জেলার পুলিশ-প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের কাঠগড়ায় তুলে প্রচারে নেমেছিলেন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সভার পরে সভা করে অভিযোগ করা হতো, অন্যায় কাজে সামিল হতে না চাওয়ায় খুন করা হয়েছে বিডিও কল্লোল শূরকে।

ক্ষমতায় এসে সেই হত্যা-রহস্যের কিনারা করতে প্রাক্তন বিচারপতি গীতেশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে কমিশন গড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। ‘কমিশনস অফ এনক্যোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫২’ অনুযায়ী ওই কমিশন গড়ার কথা ২০১১ সালের ৪ নভেম্বর বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যসচিব সমর ঘোষ। তদন্ত শেষে বিধানসভায় যে রিপোর্ট জমা দিয়েছে ভট্টাচার্য কমিশন, তাতে বলা হয়েছে বিডিও কল্লোল আত্মহত্যাই করেছিলেন। আত্মহত্যার জন্য কাউকে দায়ী করার মতো তথ্যপ্রমাণও কমিশন পায়নি। এবং রিপোর্টের এই বক্তব্য মেনে নেওয়া হচ্ছে বলেই অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে।

Advertisement

কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ২৬ জনের সঙ্গে (তদন্তের পরিভাষায় ‘সাক্ষী’)কথা বলে এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখে কল্লোলের মৃত্যুকে আত্মহত্যাই বলতে হচ্ছে। রিপোর্টের বক্তব্য, ‘ওই মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করার মতো কোনও তথ্য যে হেতু নেই, তাই কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করারও প্রশ্ন নেই’। তবে তরুণ ওই আধিকারিকের অকাল মৃত্যুতে তাঁর পরিবারের যা ক্ষতি হয়েছে, তাতে প্রলেপ দিতে রাজ্য সরকার চাইলে তাদের ইচ্ছামতো অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে পারে বলে কমিশনের সুপারিশ।

দাসপুর-২ ব্লকের বিডিও কল্লোলের ঝুলন্ত দেহ তাঁর দফতর থেকেই উদ্ধার হয়েছিল ২০০৮ সালের ৯ এপ্রিল সকালে। ঘটনার জন্য সিপিএম নেতা পুলিনবিহারী বাস্কে, বিধায়ক সুনীল অধিকারী, পশ্চিম মেদিনীপুরের তদানীন্তন জেলাশাসক নারায়ণ স্বরূপ নিগম, পুলিশ সুপার রাজারাম রাজশেখরনের দিকে আঙুল তোলা হয়েছিল তখন। সাত বছর পরে ভট্টাচার্য কমিশনের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরে স্বভাবতই বিষয়টি নিয়ে সরব হওয়ার সুযোগ ছাড়ছে না সিপিএম। দলের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের মন্তব্য, ‘‘মিথ্যাচারের রাজনীতির আরও একটা অধ্যায় উন্মোচিত হল! মুখ্যমন্ত্রী এর জন্য নিশ্চয়ই লজ্জিত নন!’’ কংগ্রেস বিধায়ক মনোজ চক্রবর্তীও বলছেন, ‘‘আগুপিছু না ভেবে যে কোনও কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়ার রাজনীতি করতে গেলে এমন ধাক্কা খেতে হতেই পারে! রাজ্য সরকার এখন নতুন কমিশন গঠন করবে?’’

Advertisement

সরকারি সূত্রে অবশ্য আবার নতুন কমিশনের কোনও ইঙ্গিত নেই। বরং, ভট্টাচার্য কমিশনের রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়েছে বলেই বিধানসভায় জানিয়ে দিয়েছেন পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, ‘‘কমিশন যা পেয়েছে এবং জানিয়েছে, সরকার তা গ্রহণ করেছে।’’ যদিও বিরোধী দলনেতা সূর্যবাবুর প্রশ্ন, ‘‘৩৪ বছরের বাম সরকারের ভুল ধরার জন্য মুখ্যমন্ত্রী যত কমিশন গড়েছিলেন, তার সবগুলো সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য ওঁরা জানাবেন কি? আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি! সিপিএম এবং নিরুপম সেনকে ফাঁসানোর জন্য যেমন সাঁইবাড়ি কমিশন হয়েছিল। তার কী হল?’’

প্রসঙ্গত, ভট্টাচার্য কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, মৃত্যুর সময়ে বিডিও কল্লোল মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সে বছরের ২ এপ্রিল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কলকাতায় বাড়ি চলে এসেছিলেন সেই জন্যই। ঘাটালের তৎকালীন মহকুমাশাসক গৌতম মজুমদার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে কল্লোল কিছু দিন বিশ্রাম চেয়েছিলেন। কিন্তু মহকুমাশাসক কল্লোলের কাজের চাপ কমানোর জন্য এক জন প্রবেশনারি অফিসারকে তাঁর সহায়তার ভার দিয়েছিলেন। কমিশনের মতে, পূর্ণ বিশ্রাম পেলে কল্লোলের জীবনে তখনই হয়তো যবনিকা নেমে আসত না! তবে মহকুমাশাসক যে কল্লোলের উপকারই করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর ভিন্ন কোনও উদ্দেশ্য ছিল না, সে কথাও স্পষ্ট বলা হয়েছে রিপোর্টে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement