বাপিকে ধরা নিয়ে বিতর্ক তৃণমূলেই

ফেসবুক-কাণ্ডে দলের হরিশ্চন্দ্রপুরের যুবক বাপি পালকে গ্রেফতারের ঘটনা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরেই নানা বিতর্ক দানা বাঁধছে। দল সূত্রের খবর, তৃণমূল যুবার মালদহ শাখার জেলা স্তরের একাধিক নেতা বাপির পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের অনেকে জানতে পেরেছেন, সম্প্রতি টিএমসিপির উত্তরবঙ্গের এক নেতার বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন এক সদ্য স্নাতক হওয়া ছাত্রী। দলের একাধিক নেতানেত্রী ওই ছাত্রীর অভিযোগের কথা জানলেও পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেননি।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০১৪ ০৩:২৫
Share:

মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে মন্তব্য করার পরে ধৃত বাপি পালের বাড়ি।

ফেসবুক-কাণ্ডে দলের হরিশ্চন্দ্রপুরের যুবক বাপি পালকে গ্রেফতারের ঘটনা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরেই নানা বিতর্ক দানা বাঁধছে। দল সূত্রের খবর, তৃণমূল যুবার মালদহ শাখার জেলা স্তরের একাধিক নেতা বাপির পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের অনেকে জানতে পেরেছেন, সম্প্রতি টিএমসিপির উত্তরবঙ্গের এক নেতার বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন এক সদ্য স্নাতক হওয়া ছাত্রী। দলের একাধিক নেতানেত্রী ওই ছাত্রীর অভিযোগের কথা জানলেও পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেননি। এমনকী, ওই তরুণীকে পুলিশের কাছে অভিযোগ করার পরামর্শও কোন তৃণমূল নেতা দেননি। বরং দলের নেতানেত্রীদের একাংশ বাড়ি গিয়ে ওই ছাত্রীকে ‘যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে’ বলে চেপে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ।

Advertisement

তৃণমূল যুবার মালদহের এক নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, “ওই ছাত্রীটি ফেসবুকে যে অভিযোগ করেছে তাতে ওই টিএমসিপি নেতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কিন্তু, দলের নেতারা সব জেনেও ছাত্রীটির পাশে দাঁড়াননি। সেখানে ফেসবুক-কাণ্ড নিয়ে সকলে নীরব। মালদহে এতটা সরব। একই দলের দুরকম নীতি হবে কেন?” ঘটনাচক্রে, তৃণমূল নেতা তথা উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেবও ফেসবুকে এক তরুণীর টিএমসিপি নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলার বিষয়টি জেনেছেন। সেটা নিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন বলে দল সূত্রের খবর। মালদহের তৃণমূল যুব নেতাদের একাংশ জানান, ওই ছাত্রীটির অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দলের তরফে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তাঁরা আইনের দ্বারস্থ হবেন।

এই ঘটনায় তৃণমূল ও রাজ্য পুলিশের সমালোচনায় সরব হয়েছে বিরোধী সব দলই। উত্তর মালদহের সাংসদ মৌসম বেনজির নূরের অভিযোগ, “পুলিশ যে একপেশে কাজ করছে তা বহু ঘটনাতেই স্পষ্ট। কিন্তু আদালতে ওই রকম একটি ঘটনায় ধৃতের হয়ে কোনও আইনজীবী দাঁড়ালেন না তা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে।” তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে অশালীন মন্তব্য মানা যায় না। কিন্তু তাকে ধরতে পুলিশ যতটা তত্‌পরতা দেখিয়েছে তা সব ক্ষেত্রে হলে আইনশৃঙ্খলার ভোল বদলে যেত। ধৃত বাপি পাল যে অপরাধ করেছে তার থেকে অনেক বেশি অপরাধের ক্ষেত্রে আইনজীবীরা তাদের হয়ে মামলা লড়েন। এক্ষেত্রে যা হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে শাসকদল এখন আদালতেও নাক গলাতে শুরু করেছে। আইনজীবীদের উপরে চাপ সৃষ্টি করছে। এটা ভাল লক্ষ্মণ নয়।”

Advertisement

চাঁচলের কংগ্রেস বিধায়ক আসিফ মেহবুব মনে করেন ফেসবুকে কিছু লেখা নিয়ে অভিযোগ হলে তদন্ত না করে গ্রেফতার করাটা ঠিক নয়। তিনি বলেন, “শুধু এ রাজ্যে নয়। দেশজুড়েই ফেসবুকে নানা চর্চা হয়ে থাকে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তো পুলিশের এমন সক্রিয়তা দেখা যায় না। ওই যুবক যা করেছে তা নিন্দনীয়। কিন্তু বিচার পাওয়ার অধিকার তো সবার রয়েছে। সেক্ষেত্রে আইনজীবীরা তার হয়ে কেন দাঁড়ালেন না তা বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে চাপের কাছে তাদের নতিস্বীকার করতে হয়েছে।”


হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে বাপিবাবুরই কাকা সুশীল পাল।

হরিশ্চন্দ্রপুরের ফরওয়ার্ড বিধায়ক তজমূল হোসেন পুলিশের এতটা সক্রিয়া কেন সেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কথায়, “মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্কে কু কথা বলায় ওই যুবকের বিরুদ্ধে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে ভাল কথা। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই প্রশাসনের এমন সক্রিয়তা দেখা যায় না। ফেসবুক খুঁজলে এমন বহু নেতা-মন্ত্রী বা সম্মানীয় ব্যক্তিদের জড়িয়ে কুমন্তব্য করা হয়ে থাকে দেখা যায়, তাদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কই।” হরিশ্চন্দ্রপুর-১ পঞ্চায়েত সমিতির সিপিএমের সভাপতি জামিল ফিরদৌস জানান, খুনে খুনে অভিযুক্তের হয়েও আদালতে মামলা লড়েন অনেক আইনজীবী। তা হলে ক্ষেত্রে কী হয়েছে তা বুঝতে পারছি না। জানকীনগরেই বাড়ি হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েতর সিপিএম প্রধান মহাবীর ওঁরাওয়ের বাড়ি। তিনি বলেন, “বাপি এলাকায় ভালো ছেলে হিসাবেই পরিচিত। কিন্তু ও যা করেছে বলে শুনেছি তা অন্যায়। কিন্তু পুলিশ তাকে ধরতে যে সক্রিয়তা দেখিয়েছে তা অনেক সময়েই দেখা যায় না। আর আইনজীবীরা ওর হয়ে না দাঁড়ানোয় ওকে জেল হাজতে যেতে হল। ও কী দেশদ্রোহী নাকি। দেশদ্রোহীর হয়েও তো আইনজীবীদের দাঁড়াতে দেখা যায়।” বিজেপির জেলা সহ সভাপতি সুভাষকৃষ্ণ গোস্বামী দলতন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন। তাঁর অভিযোগ, “দলতন্ত্র চলছে বলেই সাংসদ তাপস পালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বাপির মতো যুবক গ্রেফতার হলে আইনজীবী মেলে না।”

ছবি: বাপি মজুমদার।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement