চেন্নাইয়ের দুর্যোগ মোকাবিলায় তাঁদের স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন খুব কাজে এসেছিল বলে জানাচ্ছেন হ্যাম-রেডিও অপারেটরেরা। মণিপুরে রবিবার শেষ রাতের দুর্যোগের খবর পেয়েই তাঁরা তার সাহায্যে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য আদানপ্রদান শুরু করে দিয়েছিলেন।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় সামাল দেওয়ার কাজে এ ভাবেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে তথ্যপ্রযুক্তি। প্রকৃতি কখন কী ভাবে আঘাত হানবে, তা ঠেকানো হয়তো সম্ভব নয়। তবে তার ঘা সামলাতে তথ্যপ্রযুক্তি নয়া হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলে রবিবার জোকার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে আয়োজিত ‘করডিম’ নামে এক অনুষ্ঠানে জানান প্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকেরা। ঘটনাচক্রে সেই অনুষ্ঠানের ২৪ ঘণ্টা পেরোতে না-পেরোতেই ভূমিকম্প হয়ে গেল মণিপুরে। এতে বিপর্যয় সামাল দিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়টি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বলে বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন।
বিপর্যয় মোকাবিলায় তথ্যপ্রযুক্তি কী ভাবে হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে বছর দুয়েক আগেই গবেষণা শুরু হয়েছে। তাতে যুক্ত আছে আইআইএম-কলকাতা, আইআইটি-খড়্গপুর, আইআইইএসটি-শিবপুর, এনআইটি-দুর্গাপুর, কল্যাণীর গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং কলকাতার হেরিটেজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। তথ্যপ্রযুক্তি কী ভাবে বিপর্যয়ের মোকাবিলা করবে?
রবিবারের অনুষ্ঠানে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক জানান, স্মার্টফোনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিপর্যয়ের পরে উদ্ধারকাজ চালানো যেতে পারে। কী ভাবে? ওই গবেষকদলের তরফে অমিতকুমার গুপ্তের ব্যাখ্যা, বিপর্যয়ের পরে অনেকেই ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়েন। বেঁচে থাকলেও বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। বিকল হয়ে পড়ে ফোনের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও। এই পরিস্থিতিতে মোবাইলের মধ্যে থাকা জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে আটকে পড়া লোকজনকে খুঁজে বার করা সম্ভব। কিন্তু জিপিএস প্রযুক্তি মোবাইলের ব্যাটারির চার্জ তাড়াতাড়ি শেষ করে দেবে। তাই তাঁরা স্মার্টফোনে থাকা ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা ভাবছেন। গবেষণাও শুরু হয়েছে।
অমিতবাবুর মতে, ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির মাধ্যমে মেসেজ পাঠানো যাবে। তেমনই কোন এলাকা থেকে ওয়াই-ফাই সংযোগ হচ্ছে, সেটা দেখেও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে থাকা লোকেদের চিহ্নিত করা সম্ভব।
তথ্যপ্রযুক্তি যে বিপর্যয় মোকাবিলার কাজে ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠছে, সে-কথা মেনে নিয়েছেন বিপর্যয় মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজনও। যেমন বিপর্যয়ে সাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেলে হ্যাম-রেডিওর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। বিভিন্ন রাজ্যে হ্যাম-রেডিও অপারেটরদের সংগঠনও রয়েছে। এ রাজ্যের হ্যাম-রেডিও অপারেটর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অম্বরীশ নাগবিশ্বাস জানান, রেডিও সেটের পাশাপাশি হ্যাম-রেডিও অপারেটরদের জন্য নিজেদের একটি স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে। চেন্নাইয়ের সাম্প্রতিক মহাদুর্যোগের ক্ষেত্রে সেটি খুব কাজে এসেছিল। মণিপুরের ভূমিকম্পের বিভিন্ন তথ্যও তাঁরা একই ভাবে আদানপ্রদান করছেন বলে জানান হ্যাম-রেডিও অপারেটরেরা।
স্মার্টফোনের সঙ্গে সঙ্গে জিওগ্র্যাফিক্যাল ইনফর্মেশন সিস্টেমস (জিআইএস) প্রযুক্তিও বিপর্যয় মোকাবিলার কাজে আসতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা। রবিবার আইআইএমের অনুষ্ঠানে টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের গবেষক বালমুরুগণ গুরু জানান, বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রে কোনও এলাকার মাটি কী রকম, বনাঞ্চল কতটা আছে, নদীনালা কী রয়েছে— এই সব ‘স্পেসিয়্যাল’ তথ্য জরুরি। একই ভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা কত, তার মধ্যে মহিলা-পুরুষ অনুপাত কী— এ-সব তথ্যও জানা দরকার। জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে এই দু’ধরনের তথ্য একযোগে সংগ্রহ করা যেতে পারে। তাতে বিপর্যয় মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি উপকার পাওয়া সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।