কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অভিযোগকারী বিডিও জানিয়ে দিলেন, পুলিশের তদন্তে কোনও আপত্তি নেই তাঁর। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিরোধীদের বিষ দিয়ে মারার কথা বলে নির্বাচনী বিধি ভাঙার যে মামলায় নাম জড়িয়েছিল তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলের, তা খারিজ হয়ে গেল।
আদালতের সিদ্ধান্ত শুনে সোমবার সন্ধ্যায় বীরভূমের জেলা তৃণমূল সভাপতি তথা মঙ্গলকোট, কেতুগ্রাম, আউশগ্রামের পর্যবেক্ষক অনুব্রত বললেন, ‘‘আমি আদালতকে সব সময় শ্রদ্ধা করি।’’ যদিও সকালেই নলহাটির তৃণমূলের সভায় স্বমহিমায় দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ভরা মঞ্চ থেকে বীরভূমের ছেলেমেয়েদের জন্য ৫০০ জুনিয়র কনস্টেবল পদে নিয়োগের আশ্বাস ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তিনি।
২০১৪ সালের ৯ মার্চ লোকসভা ভোটের আগে মঙ্গলকোটের কৈচর হাটতলায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিরোধীদের ‘ইঁদুরের বাচ্চা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন অনুব্রত। দলের কর্মীদের বলেছিলেন, “শান্তিতে থাকতে হলে ওদের বিষ দিয়ে মারুন।” এর তিন দিন পরে তৎকালীন বিডিও সুশান্তকুমার মণ্ডল মঙ্গলকোট থানায় অনুব্রতর বিরুদ্ধে নির্বাচনী বিধি ভাঙার অভিযোগ দায়ের করেন। তবে বিডিও-র অভিযোগ পাওয়ার পরেও মঙ্গলকোট থানা মামলা রুজু করেনি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী কমিশনের চাপে পড়ে ৩ এপ্রিল মঙ্গলকোট থানা জনপ্রতিনিধি আইনে উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখার জন্য মামলা দায়ের করে। এর আগে বোলপুর লোকসভা কেন্দ্রের নির্বাচন আধিকারিক মঙ্গলকোটের ওই বক্তব্যের জন্য ‘শো কজ’ করেছিলেন অনুব্রতকে। জবাবে কেষ্ট জানিয়েছিলেন, এ ধরনের কথা তিনি বলেননি।
আগেও ২০১৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটের মুখে পাড়ুইয়ের কসবায় প্রকাশ্য সভায় অনুব্রতকে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে পুলিশকে বোমা মারার ও বিরোধীদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিতে শোনা গিয়েছিল। তার পরে এলাকায় একাধিক নির্দল প্রার্থীর (বিক্ষুব্ধ তৃণমূল) বাড়িতে হামলা, বোমাবাজির ঘটনা ঘটে। প্রশাসনকে অনুব্রতর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন। পুলিশ তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে লঘু ধারায় মামলা রুজু করে। যদিও বীরভূমের তৎকালীন সিজেএম রাজেশ চক্রবর্তী ওই ঘটনায় পাড়ুই থানাকে জামিন-অযোগ্য ধারায় মামলা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার পরেও পুলিশ মামলার চূড়ান্ত রিপোর্টে জামিন-অযোগ্য সেই সব ধারা প্রয়োগ করেনি। গোটা তিনেক জামিনযোগ্য ধারা দেয়। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছিলেন, শাসকদলকে সন্তুষ্ট করতেই পুলিশ অনুব্রতকে বাঁচাতে চাইছে। আর তাই লঘু ধারা প্রয়োগ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সব রাস্তাই বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলকোটের ঘটনার পরেও শাসকদলের সঙ্গে পুলিশের আঁতাতের অভিযোগ তুলছে বিরোধীরা। সিপিএমের বর্ধমান জেলা সম্পাদক অচিন্ত্য মল্লিকের কটাক্ষ, “উঁচুতলার পুলিশ হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে অনুব্রতর বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস দেখাচ্ছে না। সেখানে নিচুতলার পুলিশ কী ভাবে তদন্ত করে সত্য ঘটনা তুলে ধরবে?’’
কিন্তু কোন গ্রহের ফেরে খারিজ হল মামলা?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলকোটের ওই মামলার তদন্তকারী অফিসার প্রণব নন্দী প্রায় বছর খানেক আগে তদন্ত শেষ করে আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেন। সেখানে তিনি জানান, অভিযোগের সারবত্তা খুঁজে পাননি তিনি। তাঁর আরও দাবি, কৈচরের এক বাসিন্দার কাছ থেকে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই সিডি কলকাতার পার্ক সার্কাসের একটি ফরেন্সিক ল্যাবরেটরিতেও পাঠানো হয়। ওই ল্যাবরেটরির কর্তারা কিছু প্রশ্ন করলে তার উত্তরও পাঠান তাঁরা। কিন্তু তারপরেও ওই ফরেন্সিক রিপোর্ট আসেনি। তদন্তকারী অফিসার আদালতে দাবি করেন, বিডিও-র অভিযোগে ঘটনা সম্পর্কে তথ্যগত ভুল রয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, অভিযোগকারী বিডিওকে পাঁচ বার সমন পাঠানো হয়। কিন্তু গত এক বছর ধরে নানা অজুহাতে আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত সোমবার মঙ্গলকোটের তৎকালীন বিডিও সুশান্তকুমার মণ্ডলকে চরমপত্র দিয়ে ডেকে পাঠায় আদালত। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, অভিযোগকারীকে পুলিশের রিপোর্ট পড়ে শোনানো হয়। বিচারক পুলিশের রিপোর্ট নিয়ে তাঁর বক্তব্যও জানতে চান। অভিযোগকারী জানান, তাঁর কোনও বক্তব্য নেই। কোনও আপত্তিও নেই। কাটোয়ার এসিজেএম সৌমেন সরকারের নির্দেশে বক্তব্য লিখিত ভাবে জমাও দেন তিনি। এরপরেই মামলা খারিজের কথা জানিয়ে দেন বিচারক।
সুশান্তবাবু পরে বলেন, ‘‘শেষ পর্যন্ত আদালতে কী হয়েছে বলতে পারব না। তবে আমরা আমাদের মতো কাজ করেছি। পুলিশ পুলিশের মতো রিপোর্ট দিয়েছে।” অনুব্রতও বলেন, ‘‘আইন আইনের পথে চলছে।’’
বিরোধী নেতাদের শুধু আক্ষেপ, ‘‘আমরা মুখ খুললেই যত দোষ।’’