ভিভিআইপি করদাতা! তাই তাঁদের থেকে মূল্যযুক্ত কর (ভ্যাট) আদায়ে নির্ঝঞ্ঝাট ব্যবস্থা শুরু করল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসন।
সরকারের যুক্তি, এটি হল ভ্যাট আদায়ে সংস্কার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপ। যার নেপথ্য নীতি হল, ‘যে গরু দুধ দেয়, তাকে যত্নে রাখা’। অর্থাৎ, ভিভিআইপি করদাতাদের শুভবুদ্ধির উপর ভরসা রেখে তাঁরা যে কর দিচ্ছেন, তাকেই সঠিক বলে ধরে নেওয়া। এই নীতির উপর ভিত্তি করে অর্থ দফতরের সিদ্ধান্ত, যে সব সংস্থা মোটা টাকা ভ্যাট দেয়, কর আধিকারিকরা এখন থেকে চাইলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন না। উঁচুতলার অনুমতি লাগবে।
রাজ্যের বাণিজ্য কর কমিশনার বিনোদ কুমার গত ২৪ জুলাই বিজ্ঞপ্তি জারি করে লার্জ ট্যাক্স পেয়ার ইউনিট (এলটিইউ) নামে একটি বিশেষ ইউনিট তৈরি করেছেন। এই ইউনিটে রয়েছেন প্রায় ৭০০টি সংস্থা। অর্থ দফতর জানিয়েছে, এই সংস্থাগুলির ব্যবসা এবং প্রদেয় করের পরিমাণ নিয়ে সাধারণ কর আধিকারিকেরা কোনও তদন্ত চালাতে পারবেন না। সে জন্য ওই সংস্থায় তল্লাশি চালানো বা সংস্থার গাড়ি আটকানোরও কোনও অধিকার তাঁদের থাকবে না। কমিশনার তাঁর বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, এই ধরনের করদাতাদের বিষয়ে আলোচনা করার বা কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকারী হবেন এলটিইউ-এর নোডাল অফিসার। যিনি পদমর্যাদায় হবেন এক জন যুগ্ম কমিশনার বা সিনিয়র যুগ্ম কমিশনার।
কারা এই হয়রানি-মুক্ত কর ব্যবস্থার মধ্যে আসবেন? সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ব্যবসা করা সংস্থা বা তিন কোটির বেশি ভ্যাট দেয় এমন সংস্থাকেই বিশেষ গোত্রে রাখা হয়েছে। ভ্যাট দেয় এমন সংস্থার সংখ্যা এ রাজ্যে এখন ২ লক্ষ ৪০ হাজার। তা হলে মাত্র ৭০০ সংস্থাকে কেন বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে?
অর্থ দফতরের এক কর্তা জানাচ্ছেন, ২০১৪-’১৫ সালে ভ্যাট আদায়ের মোট পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। তার মধ্যে ১৩ হাজার ৫০ কোটি টাকাই দিয়েছে এই ৭০০টি সংস্থা। যা মোট আদায়ের ৫৬%। সেই কারণেই বড় করদাতাদের যাতে কোনও রকম ঝঞ্ঝাটের মুখে পড়তে না হয়, তা দেখা হচ্ছে। ওই কর্তার দাবি, ‘‘এলটিইউ-এর মাধ্যমে বড় করদাতাদের উপরই কর দেওয়ার ভার ছেড়ে দেওয়ার ফলে ২০১৫-’১৬ আর্থিক বছরে এদের থেকে আদায়ের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। যা হবে সম্ভাব্য মোট আদায়ের ৬৩%।’’
তবে সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশাসনিক মহলের একাংশের মধ্যে ভিন্ন মতও দেখা দিয়েছে। অর্থ দফতরের কেউ কেউ বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে শিল্পপতিদের সরকার বলে কটাক্ষ করেছেন। তৃণমূলের সাংসদরা এ নিয়ে সংসদে বিক্ষোভ পর্যন্ত দেখিয়েছেন। সে সময় তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, শিল্পপতিদের অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিতেই নীতি প্রণয়ন করছে মোদী সরকার। আর এই সংস্কারের মধ্য দিয়ে তৃণমূল সরকার কি বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার পথেই হাঁটছে না, প্রশ্ন ওই আধিকারিকদের।
অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের অবশ্য সাফ কথা, ‘‘কাউকে সুবিধা দিতে নয়, আমরা চেয়েছি যাতে বড় করদাতা, শিল্প সংস্থাগুলি ভ্যাট দিতে গিয়ে যেন কোনও দীর্ঘসূত্রতার শিকার না হয়। এক দিকে পরিষেবা দেওয়া অন্য দিকে সংস্থাগুলির ‘ট্রানজ্যাকশন কস্ট’ কমানোর জন্যই বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।’’ তাঁর দাবি, কর আদায় বাড়াতেই এই সংস্কার করা হয়েছে। পরিষেবা উন্নত এবং সহজ হলে আদায়ের পরিমাণ বাড়তে বাধ্য।
বাণিজ্য কর বিভাগ সূত্রের খবর, সমস্ত ভ্যাট ডিলারকে এখন ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় রিটার্ন দাখিল করতে হয়। এর পরে ১৮টি সূচকের ভিত্তিতে সন্দেহজনক ডিলারদের কারবার, বার্ষিক বিক্রয় ইত্যাদি খতিয়ে দেখেন কর আধিকারিকরা। প্রয়োজনে তাদের অফিস, ব্যবসাস্থলে তল্লাশি চালানো হয়। ডিলারদের ঘোষিত করের পরিমাণ অডিটও করা হয়।
অর্থ দফতর সূত্রের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার ফলে কর ফাঁকি দেওয়া আটকানো যায়। কর আদায়ের পরিমাণও বাড়ে। যদিও এহেন ইনস্পেক্টর রাজ শিল্পমহলে বহু সমালোচিত। তাদের অভিযোগ, কর আধিকারিকেরা নানা ছুতোনাতায় তল্লাশি চালান, অকারণে হেনস্থা করেন। হেনস্থার এড়াতে অনেক সময় ইনস্পেকটরদের বেআইনি ‘দাবিদাওয়া’ও মেটাতে হয় বলে শিল্পমহলের অভিযোগ। ‘‘একটা সময় ছিল যখন বিক্রয় কর আধিকারিক আর রঘু ডাকাতকে এক করে দেখা হতো’’— মেনে নিচ্ছেন কর কর্তাদের একাংশ। তবে একই সঙ্গে তাঁদের দাবি, ‘‘সেই পরিস্থিতি আর নেই। এখন বৈদ্যুতিন কর আদায় প্রক্রিয়া চালু করে ইন্সপেক্টর রাজ প্রায় খতম করা হয়েছে।’’ তবে তার হয়রানির নানা অভিযোগ শিল্পমহলের তরফ থেকে উঠছিল। কর কর্তারা জানাচ্ছেন, সেই ক্ষোভ কাটাতেই বড় করদাতাদের বাড়তি সুবিধা দিতে হচ্ছে। যা সাধারণ ভ্যাট দাতাদের দেওয়া হয় না।
এলটিইউ তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলি কী কী সুবিধা পাবে?
বাণিজ্য কর কমিশনারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নোডাল অফিসারের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনও কর আধিকারিক এই ৭০০টি সংস্থার অফিস, কারখানা বা ব্যবসাস্থলে যেতে পারবেন না। সামান্য কারণে এই সব সংস্থার গাড়িও আটকানো যাবে না। এই করদাতাদের ফাইলপত্র সরাসরি নোডাল অফিসারই দেখবেন। নীচের স্তর থেকে সাধারণ ভাবে ফাইল চালাচালির রীতি এ ক্ষেত্রে মানা হবে না। সংস্থাগুলি যে ভ্যাট দেবে, সাধারণ ভাবে তার কোনও অডিট করা হবে না। যদি কোনও কারণে কারচুপি করা হয়েছে বলে সন্দেহ হয়, তবেই অডিট হবে। এর পরেও যদি হয়রানির অভিযোগ ওঠে তা হলে এলটিইউ সেলই তার সুরাহা করবে।