হাসপাতালে জখম সুদীপ্তবাবু।— নিজস্ব চিত্র।
পারিবারিক এক বন্ধুকে বাড়িতে ডেকে বেধড়ক মারধর করার অভিযোগ উঠল মা ও ছেলের বিরুদ্ধে। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা রাজ্যের এক পুলিশকর্তার স্ত্রী ও পুত্র। বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে বেলুড়ে। ঘটনার পর থেকেই ওই পুলিশকর্তার ছেলে বেপাত্তা। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তদের নাম কস্তুরী চট্টোপাধ্যায় ও সশীষ চট্টোপাধ্যায়। অন্য দিকে, আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁদের পারিবারিক বন্ধু সুদীপ্ত ঘোষ নামে ওই যুবককে কলকাতার এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, বেলুড় কাবুলিকুঠির প্রফেসর পাড়ার বাসিন্দা, রাজ্য পুলিশের ডিআইজি (আর্মড পুলিশ) শুভাশিস চট্টোপাধ্যায়ের পারিবারিক বন্ধু সুদীপ্তবাবু। বছর চৌত্রিশের ওই যুবক বালি বাদামতলার বাসিন্দা। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে কস্তুরীদেবীর নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। পাশাপাশি, ওই পুলিশকর্তার বাড়ির গাড়িও চালাতেন। এমনকী, সুদীপ্তবাবুর গাড়ি রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদে ভাড়া খাটানোর কাজেও ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন শুভাশিসবাবু।
সুদীপ্তবাবুর স্ত্রী মিতালিদেবীর অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকালে ডিউটি করে বাড়ি চলে আসার পরে ফের দুপুরে তাঁকে বা়ড়িতে ডেকে পাঠান কস্তুরীদেবী। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেলেও বাড়ি না ফেরায় ওই যুবকের বাড়ি থেকে ফোন করা হলে সশীষ জানান, সুদীপ্তবাবু ব্যস্ত রয়েছেন। পরে কথা বলা যাবে। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ সুদীপ্তবাবুর বাড়িতে ফোন করে কস্তুরীদেবী জানান, বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে যাওয়ায় ওই যুবককে বাইপাসের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মিতালিদেবী বলেন, ‘‘খবর পেয়ে হাসপাতালে যেতেই সুদীপ্ত জানান, ধার নেওয়া টাকা ফেরত না দেওয়ায় ওঁকে চেয়ারে বেঁধে ও বাথরুমে ঢুকিয়ে মারধর করেন সশীষ।’’ সুদীপ্তবাবুর মাথায় মোট পাঁচটি সেলাই পড়েছে। ওই রাতেই তাঁর পরিবারের তরফে বালি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। তাঁদের মূল অভিযোগ সশীষের বিরুদ্ধে। পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ এনেছে।
শুভাশিসবাবুর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে কস্তুরীদেবীর থেকে টাকা ধার নিতেন সুদীপ্তবাবু। মোট পাঁচ লক্ষ টাকা পাওনা হলেও এক টাকাও শোধ করেননি তিনি। এ নিয়ে মাঝেমধ্যেই সুদীপ্তবাবুর সঙ্গে ঝামেলা হত কস্তুরীদেবীর। ওই দিনও তা নিয়েই বচসা হয়। শুভাশিসবাবু বলেন, ‘‘উত্তেজিত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সুদীপ্ত। পরে ফিরে আসে এবং মাথা ঘুরে পড়ে যায়। ওকে মারধর করা হয়েছে, এটা বলা ঠিক নয়।’’ কস্তুরীদেবী বলেন, ‘‘ওঁকে টাকা শোধ দিতে বলা হয়েছিল। তা নিয়েই কথা কাটাকাটি হয়। আর তাতেই উত্তেজিত হয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায়।’’ তবে পুলিশকর্তার গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বালি-বেলুড় এলাকায় ‘দাদাগিরি’ করে বেড়ানোর একগুচ্ছ অভিযোগ রয়েছে সশীষ ও সুদীপ্তবাবুর বিরুদ্ধে। এমনকী, দুর্গাপুজোর সময়ে ঘোলা এলাকায় পুলিশকে হেনস্থা ও মারধর করার অভিযোগ উঠেছিল সশীষের বিরুদ্ধে। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশকর্তার ছেলে এবং ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে কাউকেই মান্য করতেন না সশীষ ও সুদীপ্তবাবু। যদিও এ নিয়ে তিনি কিছু জানতেন না বলেই দাবি শুভাশিসবাবুর।
তবে প্রশ্ন হল, পুলিশকর্তার বাড়ি থেকে সুদীপ্তর বাড়ির দূরত্ব হাঁটা পথে ১০ মিনিট। এমনকী, বেলুড় থেকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলেও বাদামতলার উপর দিয়েই যেতে হয়। ওই যুবক যদি মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে গিয়েই আঘাত পান, তা হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর বাড়িতে কেন খবর দেওয়া হল না? কেনই বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে জানানো হল না? যদিও এ বিষয়ে কোনও সদুত্তর মেলেনি অভিযুক্তদের থেকে। এমনকী, পুলিশকর্তা শুভাশিসবাবুর দাবি, ‘‘সুদীপ্ত আমাদের পারিবারিক বন্ধু। ওর স্নায়ুর রোগ ছিল। তাই মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছিল। ওকে আগে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল।’’ হাওড়া সিটি পুলিশের ডিসি (উত্তর) ভাস্কর মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সুদীপ্তর পরিবারে অভিযোগের ভিত্তিতে খুনের চেষ্টার মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু হয়েছে।’’