শিল্পায়নে পিছিয়ে। লগ্নি টানায় পিছিয়ে। বিনিয়োগের উপযুক্ত জমি-নীতি তৈরিতে পিছিয়ে।
যে রাজ্য এই বিষয়গুলিতে পিছিয়ে, তারা যে বেকারত্বে এগিয়ে থাকবে, তাতে আর সন্দেহ কি! পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও সেটাই সত্যি।
কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, দেশের অধিকাংশ রাজ্যের চেয়েই পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। প্রতি ১ হাজার জনের মধ্যে ৫২ জন সারা বছর আয়ের কোনও উপায় জোটাতে পারছেন না। গ্রামের থেকে শহরে বেকারত্বের হার আরও বেশি।
নতুন শিল্প বা কারখানা হচ্ছে না। তাই বেকার ভাতা পাওয়ার আশায় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম লেখাচ্ছেন সকলে। পরিসংখ্যান বলছে, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম লেখানোর বেকার যুবক-যুবতীদের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে গোটা দেশে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে। পশ্চিমবঙ্গে ৭০ লক্ষ ৮৬ হাজার চাকুরিপ্রার্থী এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম লিখিয়েছেন।
বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম কোন রাজ্যে? সঠিক আন্দাজের জন্য কোনও পুরস্কার নেই। গুজরাতে। হাজার জনে মাত্র ১২ জন বেকার সেখানে। গুজরাত যে শুধুই ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাত’ করেই থেমে থাকছে না, সেখানে লগ্নি আসছে, কর্মসংস্থানও হচ্ছে, সেই তথ্যই উঠে এসেছে সমীক্ষায়। কর্নাটক, অন্ধ্র, ছত্তীসগঢ়, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু এই সব রাজ্যেই বেকারত্বের হার পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক কম। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র বারবার দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক বৃদ্ধির হার জাতীয় হারের থেকে বেশি। কিন্তু শ্রম মন্ত্রকের সমীক্ষা বলছে, গোটা দেশে বেকারত্বের হার পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে কম। রাজ্যে যেখানে হাজার জনে বেকারের সংখ্যা ৫২ জন, গোটা দেশে ৪৯।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ঘটা করে ‘গ্লোবাল বিজনেস সামিট’-এর আসর বসালেও বাস্তব তথ্য হল, পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে কেউ লগ্নি করতে আসছেন না। ইনফোসিসের ক্যাম্পাস তৈরি হলে ৪০ হাজার কর্মসংস্থান হবে বলে রাজ্য সরকারই দাবি করেছিল। সেই ইনফোসিস এখন পাট গোটাচ্ছে। জিন্দলরাও কারখানার জমি ফেরত দিচ্ছেন। এক দিকে জমি নীতির কারণে বড় শিল্প আসছে না। অন্য দিকে শাসক দল তৃণমূলের মদতপুষ্ট সিন্ডিকেটের দাপটে ছোট ছোট শিল্পপতিরাও কারখানার ঝাঁপ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কলকাতার শিল্প সম্মেলনে গিয়ে অরুণ জেটলি শিল্পের জন্য মানানসই জমি নীতির পক্ষে সওয়াল করেন। জেটলি সাবধানবাণী শুনিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে কারখানা হলে তবেই কর্মসংস্থান হবে। তার আগে কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী বন্দারু দত্তাত্রেয় কলকাতায় গিয়ে রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, “বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা খোলার চেষ্টা করতে হবে। নতুন কারখানার জন্য বিনিয়োগ দরকার। তার জন্য উপযোগী ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তা হলেই কর্মসংস্থান হবে।”
কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী কলকাতায় গিয়ে বলেছিলেন, তিনি রিপোর্ট ঘেঁটে দেখেছেন গত দু’বছরে কারখানার লক-আউটে শীর্ষে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। বিশেষ করে চা বাগানগুলির শোচনীয় অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন এআইটিইউসি-র সাধারণ সম্পাদক গুরুদাস দাশগুপ্তও মোদী সরকারের এই মতকে সমর্থন করছেন। তাঁর বক্তব্য, “চা, চট ও বস্ত্রঐতিহাসিক ভাবে এগুলিই পশ্চিমবঙ্গের প্রধান শিল্প ছিল। সেগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায়, বেকারত্ব তো বাড়বেই।” গুরুদাসের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে একটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন শিল্প আসছে না। কৃষিতেও বৃদ্ধি হচ্ছে না। যার ফলেই অন্য রাজ্যের থেকে বেকারত্বের হার পশ্চিমবঙ্গে বেশি। শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, বছর দু’য়েক আগে প্রাথমিক শিক্ষক পদে চাকরির জন্য শূন্য পদের দশগুণ আবেদন জমা পড়েছিল। এ থেকেই স্পষ্ট, বেসরকারি ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ না পেয়ে যে কোনও সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় ঝাঁপিয়ে পড়ছেন বেকার যুবক-যুবতীরা। না হলে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। কী বলছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সান্ত্বনা হল, আগের বছরগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের হার কমেছে। ২০১১-’১২-য় রাজ্যে হাজার জনের মধ্যে ৭৮ জন বেকার ছিলেন। পরের বছর (২০১২-’১৩) তা কমে দাঁড়ায় ৫৯-এ। ২০১৩-’১৪-য় সেটাই কমে দাঁড়িয়েছে ৫২-য়। কিন্তু এখনও গুজরাতের মতো রাজ্যগুলির তুলনায় অনেক পিছিয়ে পশ্চিমবঙ্গ। বিহার, ওড়িশা, অসম, কেরল, পঞ্জাবের মতো হাতে গোনা রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের থেকে পিছিয়ে। রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক বলেন, “গুজরাতের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না। গুজরাতে কিন্তু আর্থিক বৃদ্ধির হার কমছে। আমাদের বাড়ছে। তাই বেকারত্বের হারও কমছে।” বেকারত্বের জন্য বাম সরকারের ৩৪ বছরের শাসনকেও দায়ী করছেন তিনি। মলয়বাবু বলেন, “বাম আমলে ৫৪ হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা নতুন কারখানা তৈরির চেষ্টা করছি। বন্ধ হয়ে থাকা কারখানাগুলোও খোলার চেষ্টা করছি।”
তা হলে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে এত জন নাম লেখাচ্ছেন কেন? মলয়বাবুর যুক্তি, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেকার ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। বেকারদের জন্য নানা প্রকল্প রয়েছে। তাছাড়া এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছে। এক্সচেঞ্জে নাম লেখানো বেতারদের তথ্য বেসরকারি সংস্থার জন্যও খুলে দেওয়া হচ্ছে। কাজেই শুধু সরকারি চাকরি বা বেকার ভাতা নয়, বেসরকারি চাকরির জন্যও সবাই এক্সচেঞ্জে নাম লেখাচ্ছেন।”