র্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তা দৃষ্টান্তমূলক না হওয়াতেই র্যাগিংয়ের প্রবণতা রোখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন অভিভাবকেরা। গৌড় মহাবিদ্যালয়ের ঘটনার পরে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলি ফের এ ব্যাপারে সরব হয়েছে। তাদের অভিযোগ, দোষীদের কড়া শাস্তি না হওয়াতেই উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গৌড় মহাবিদ্যালয়, একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে।
বহাল তবিয়তে
সম্প্রতি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার অব কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন বিভাগের প্রথমবর্ষের কয়েকজন ছাত্র র্যাগিংয়ের জেরে হস্টেল ছেড়ে, এমনকী, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়েও চলে যান। তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দিলে শাস্তিও ঘোষণা করা হয়। ৩২ জন ছাত্রকে হস্টেল থেকে বার করে দেওয়া হয়। তার মধ্যে ২৬ জন মূল অভিযুক্তের ক্ষেত্রে একটি করে সেমেস্টারে এক বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের কোনও ঘটনা ঘটেনি বলে তৃণমূল নিয়ন্ত্রিত ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়। তবে খোদ সাধারণ সম্পাদকের মদতেই র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ তোলে ছাত্র পরিষদ। তদন্ত কমিটি অভিজিৎকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছিল। কোর্স শেষ হওয়ার পরেও ওই ছাত্র কী করে হস্টেলে রয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধী ছাত্র সংগঠনের একাংশ। তবে তিনি এখনও হস্টেলে রয়েছেন।
অভিজিতের অবশ্য দাবি, ‘‘ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলে থাকতে পারি। তাই এ নিয়ে সমস্যা কিছু দেখছি না।’’ আদৌ ওই ছাত্র থাকতে পারেন কি না তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের তরফে অবশ্য কোনও সদুত্তর নেই। তা ছাড়া অভিযুক্ত ছাত্রদের বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণা করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হস্টেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অথচ সেই ছাত্ররাই হস্টেল ছাড়া দূরের থাক, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক ভবনে তালা মেরে অচল করে দেয়। তাতেও কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেননি বলে অভিযোগ। এক সপ্তাহ পরেও অনেকে হস্টেল ছাড়েননি বলে বিরোধীরা ক্ষোভ জানিয়েছিল। তাতেও লাভ কিছু হয়নি। গৌড় মহাবিদ্যালয়ের ঘটনা সে কথাই প্রমাণ করেছে বলে তাদের দাবি।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার স্বপন রক্ষিত বলেন, ‘‘র্যাগিংয়ের ঘটনা আমরা কোনও সময়ই সমর্থন করি না। অভিযোগ উঠলেই তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরাও ৩২ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি।’’
উত্তর নেই
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের নামে অভিযোগ ওঠার পরেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোর্স শেষের পরেই বা কী ভাবে ওই ছাত্র হস্টেলে রয়েছেন? ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বলেন, ‘‘তদন্ত কমিটি ওই ছাত্রের বিরুদ্ধে কোনও রিপোর্ট দেয়নি।’’ মালদহ কলেজের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে তা তদন্ত করে খতিয়ে দেখা দরকার বলে তিনি জানিয়েছেন। অভিয়োগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশ মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে সেখানে অভিযুক্তদের বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে বার করে দেওয়া এমনকী অন্যত্র যাতে ভর্তি হতে না পারেন সে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও রয়েছে। কিন্তু সেই শাস্তি নেওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কেন পিছপা তা নিয়ে তিনি অবশ্য স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
নেতাকে বাঁচাতে
বিরোধীদের অবশ্য দাবি, শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকে বাঁচাতেই শাস্তি দেওয়া হয়নি। ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি রোনাল্ড দে বলেন, ‘‘র্যাগিংয়ের ঘটনায় ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক যে যুক্ত আমরা সে কথা বারবার বলেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষের একাংশ তাকে বাঁচিয়ে দিতে তৎপর হয়। মুখ খুললে সাধারণ ছাত্রদের মুশকিল আছে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেই ভয়েই তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে সাহস পায়নি।’’ তাঁর দাবি, হস্টেল থেকে বের করে দিলেই হল না মূল অভিযুক্তদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া উচিত। র্যাগিং রুখতে কঠোর ব্যবস্থার দাবি তারা বরাবরই করেছে বলে জানান। এসএফআইয়ের জেলা নেতৃত্বও মনে করছেন কিছু ছাত্রকে বাঁচিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখাতে তা ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে ভুল বার্তা যাবে। তাই কোনও ভাবেই তা করা কাম্য নয়।
আশঙ্কার দিন
গৌড় মহাবিদ্যালয়ের ঘটনা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে বলে ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের একাংশের অনুমান। মালদহ গৌড় কলেজের সংস্কৃত বিভাগের প্রথম বর্ষের ওই ছাত্র পরিচয়পত্র আনতে গেলে বৃহস্পতিবার তাঁকে সিনিয়র ছাত্রদের একাংশ তাঁকে ঝোপে নিয়ে গিয়ে মদ খাওয়াতে বাধ্য করে বলে অভিযোগ। তা না খেতে চাইলে তাকে সিগারেটের ছ্যাঁকাও দেওয়া হযেছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় ছাত্রটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় মালদহ মেডিক্যাল কলেজে তাঁকে ভর্তি করতে হয়েছে। ঘটনার পর গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের তরফেও আলাদা কমিটি করে ঘটনা খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হবে তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। কেন না পুলিশে অভিযোগ জানানোর পরেও শুক্রবার কাউকে ধরা হয়নি। আশঙ্কা তাই রয়েই যাচ্ছে।