মাস কয়েক আগে, অ্যাসিড আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল মুখটা। পরিচিতরা বলছেন, ‘‘কী মিষ্টি দেখতে ছিল। চেনাই যায় না এখন।’’ সেই হারানো মুখ ওড়নায় ঢেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের সদ্য তরুণী আজ, বুধবার পুলিশের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা নেবেন। দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশে এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক তিন লক্ষ টাকা। নারী নির্যাতন বিরোধী দিবসে ওই সদ্য তরুণীর প্রাপ্তি ওইটুকুই। ঘটা করে এ কথা জানাচ্ছে পুলিশই।
অথচ পাঁচ বছরে কতগুলি অ্যাসিড হামলার ঘটনা হয়েছে? প্রশ্ন শুনে মাথা চুলকেছেন প্রায় সব জেলার পুলিশ কর্তারা। ভেবেচিন্তে দু’বছরের যে পরিসংখ্যান তাঁরা খাড়া করছেন, বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দাবি, সংখ্যাটা তার তিনগুণ। কেন এই হাল, অ্যাসিড হামলার মতো মারাত্মক একটা অপরাধের ক্ষেত্রে এমন নথি-হীন অবস্থা কেন আইনরক্ষকদের?
সমস্যাটি বুঝিয়ে দিচ্ছেন হাইকোর্টের এক বিচারপতি। তাঁর দাবি— অ্যাসিড হামলার মতো ঘটনাগুলি আগে অন্য অপরাধের তালিকায় ঢুকে যেত। সাজার ক্ষেত্রে তা কখনও জুড়ে যেত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারা (খুনের চেষ্টা) কখনও বা সরাসরি ৩০২ (খুন) ধারায়। ফলে আলাদা করে অ্যাসিড হামলার পরিসংখ্যান মেলা ছিল দুষ্কর। তার উপর, জেলার বেশিরভাগ হাসপাতালে বার্ন-ওয়ার্ড নেই। নেই প্লাস্টিক সার্জারির ব্যবস্থা। ফলে সেখানও তথ্য মেলা প্রায় অসম্ভব।
বারাসত আদালতের সরকারি কৌঁসুলি শান্তময় বসু বলছেন, ‘‘আগে অ্যাসিড হামলার সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে আলাদা ধারা ছিল না। ভারতীয় দণ্ডবিধির (আইপিসি) ৩২৬ ধারাতেই অ্যাসিড হামলা অর্ন্তভুক্ত হতো।’’ তিনি জানাচ্ছেন, ওই ধারায় শুধু অ্যাসিডই নয়, যে কোনও কিছু নিয়ে হামলা যেমন, লাঠি, রড-সহ একাধিক বিষয় অর্ন্তভুক্ত ছিল। ওই ধারায় সাজা ছিল সাকুল্যে ৩ বছর। জামিন মিলতেও অসুবিধা হতো না। ছিল না জরিমানার রেওয়াজ। কিন্তু অ্যাসিড হামলার মতো ঘটনা, যা আক্রান্তর আস্ত জীবনটাই নষ্ট করে দিতে পারে সে ব্যাপারে আরও সংবেদনশীল আইনের প্রয়োজনীয়তা ছিল না? প্রশ্ন উঠছিল বেশ কিছু দিন ধরেই। সেই সূত্রেই নয়া আইন। যে আইনে বলা হচ্ছে— এই ধরনের হামলায় মৃত্যু না হলেও আক্রান্ত অনেক সময়ে পঙ্গু হয়ে যান। ২০১৩ সালের অ্যাসিড হামলা সংক্রান্ত ওই ধারা তৈরি হয়। ৩২৬ ধারার সঙ্গে সংযোজতি হয় ৩২৬-এ ধারা।
যে ধারায় বলা হয়েছে, অ্যাসিড হামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় অপরাধীকে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেফতার করতে হবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সেশন কোর্টে বিচার করতে হবে। মামলায় ন্যূনতম সাজা হবে কমপক্ষে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। এ ছাড়াও, অপরাধীকে জরিমানাও করতে হবে মোটা অঙ্কের। অনাদায়ে থাকবে অতিরিক্ত হাজতবাসের নির্দেশ। পাশাপাশি ৩০৭ ধারায় খুনের চেষ্টার অভিযোগে সাজাও দিতে হবে। আর আক্রান্তর মৃত্যু হলে সরাসরি ৩০২ ধারায় খুনের অভিযোগ এনে সাজা দিতে হবে।
কিন্তু এ তো গেল সাজার কথা। আক্রান্ত হওয়ার পরে করণীয় কী?
অ্যাসিড হামলার একাধিক ঘটনার তদন্ত এবং অপরাধীকে গ্রেফতারের পর সাজার ব্যবস্থাও করেছেন মহিলা থানার পুলিশ অফিসার সীমা দত্তরায়। কিছু মামলা এখনও বিচারাধীন। তিনি জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধী আক্রান্তের পরিচিত হয়। প্রথমেই যে এফআইআর (অভিযোগ) করা হবে সেটা সাজার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় আক্রান্তের বয়ান নিয়েও সুয়োমোটো (স্বতঃপ্রবৃত্ত) মামলা দায়ের করা হয়। এ সবের ভিত্তিতেই তদন্ত করে প্রমাণ-সহ তদন্তকারী অফিসার চার্জশিট দেন। তার ভিত্তিতে আদালত চার্জ ফ্রেম (অপরাধ প্রমাণের পরে যে যে ধারায় শাস্তি হবে) করে। এই প্রতিটি ধাপেই আক্রান্ত, তাঁর পরিবার এবং তদন্তকারী অফিসারের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। না হলে ঘটনাটি লঘু করে দেখিয়ে অপরাধী সর্বোচ্চ সাজা থেকে ছাড় পেয়ে যেতে পারে।