নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনের পরে দু’জনের পথ আলাদা হয়ে গিয়েছিল। আবার তাঁদের পথ মিলে যাচ্ছে শহিদ মিনার ময়দানে! রাজ্য রাজনীতিতে এই প্রথম এক মঞ্চে আসছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। নেপথ্যে সেই ভোটের অঙ্ক!
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বাৎসরিক সমাবেশে এ বার মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সিদ্দিকুল্লারা। মুখ্যমন্ত্রী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। সিদ্দিকুল্লাকে রবিবার ফোন করে তিনি জানিয়েও দিয়েছেন, বৃহস্পতিবার শহিদ মিনার ময়দানে উপস্থিত জমিয়তে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বক্তৃতা করবেন। গত বছর জমিয়তের এই সমাবেশ ঘিরেই পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল মধ্য কলকাতা। আর এ বার মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই পুলিশি নিরাপত্তায় সমাবেশ সফল করার যাবতীয় বন্দোবস্ত থাকছে। পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে ইতিমধ্যে স্বয়ং সিদ্দিরকুল্লার বৈঠকও হয়ে গিয়েছে।
জমিয়তের এই সমাবেশের প্রধান লক্ষ্য, দেশ জুড়ে অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ইসলাম ধর্মের নামে ফ্রান্সে যে সন্ত্রাস চালানো হয়েছে, তার প্রতিবাদও তারা করছে। তার জন্য ফরাসি কনস্যুলেটে গিয়ে আলোচনা সেরে এসেছেন সিদ্দিকুল্লা। সেই সঙ্গেই সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত যাতে রাজ্য সরকার ঠিকমতো কার্যকর করে, সেই দাবিও মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তুলতে চান তাঁরা। কিন্তু নন্দীগ্রামে ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’তে তৃণমূল-জমিয়তে এক সঙ্গে থেকেও যে মমতা-সিদ্দিকুল্লা কখনও একমঞ্চে আসেননি, তাঁদের মিলিয়ে দেওয়ার আসল কারণ নির্বাচনী সমীকরণই। সাম্প্রতিক পুরভোটে শাসক দলের বিপুল সাফল্যের মধ্যেও তাদের সংখ্যালঘু সমর্থনে কিছু চিড়ের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তার পাশাপাশিই তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভিতে ভাঙন ধরাতে তৎপর হয়েছেন দলে অধুনা ‘ব্রাত্য’ নেতা মুকুল রায়। আবার কংগ্রেস-বাম কাছাকাছি এলেও সংখ্যালঘু সমর্থনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে শাসক দলে। এই অঙ্ক থেকেই সিদ্দিকুল্লাদের হাত ধরে সংখ্যালঘুদের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছতে চাইছেন মমতা। আর সিদ্দিকুল্লার উদ্দেশ্য, প্রথমে জমিয়তের মঞ্চে মমতাকে এনে পরে রাজনৈতিক ভাবেও তৃণমূলের সঙ্গে দোস্তি করে বিধানসভা ভোটে কিছু আসন ঘরে তোলা। তবে সিদ্দিকুল্লাদের এই সিদ্ধান্তে আবার ক্ষুব্ধ অন্য কিছু সংগঠন। ‘অনুদানহীন মাদ্রাসা বাঁচাও কমিটি’ যেমন ঠিক করেছে, সিদ্দিকুল্লার সমাবেশের দিনই তারা শহরে বিক্ষোভ-অবরোধ করে মুখ্যমন্ত্রীকে দাবিপত্র পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করবে।
সিদ্দিকুল্লা অবশ্য দাবি করছেন, বিভিন্ন রাজ্যেই জমিয়তের সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রীদের ডাকা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তাঁরা সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সম্মতি নিয়েছেন। সিদ্দিকুল্লার কথায়, ‘‘তবে এ রাজ্যে স্বাধীনতার পরে এই প্রথম কোনও মুখ্যমন্ত্রী জমিয়তের মঞ্চে আসছেন। এটা ঐতিহাসিক ঘটনা!’’ কিন্তু তাঁরা অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যাদের নেত্রীকে ডাকছেন, তাঁর দলই তো এ রাজ্যে অসহিষ্ণু হয়ে বিরোধীদের উপরে হামলা চালানোয় অভিযুক্ত? সিদ্দিকুল্লার জবাব, ‘‘রাজনৈতিক সন্ত্রাস এ রাজ্যে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এই সমাবেশ সে কথা বলার মঞ্চ নয়। পরে প্রয়োজনে আমরা এই নিয়ে কথা বলতে পারি।’’ আর তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য, ‘‘অসহিষ্ণুতার পথে দেশ জুড়ে বিভাজন সৃষ্টির বিরুদ্ধে একটা সমাবেশে আমাদের নেত্রী যোগ দিচ্ছেন। অন্য বিষয়কে টেনে এনে এই প্রতিবাদকে লঘু করা ঠিক নয়!’’ শহিদ মিনারের মাঠে জমিয়তের সর্বভারতীয় সভাপতি কারী মহম্মদ ওসমান, সাধারণ সম্পাদক মেহমুদ আসাদ মাদানি এবং কিছু বিদ্বজ্জনেদেরও থাকার কথা।