সরগরম মুর্শিদাবাদ

জেলা ভাগ হওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে তরজা চলছে জেলার নানা মহলে। কান পাতল আনন্দবাজার।কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলে একই কথা বলবেন মান্নান হোসেন, মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য ও অধীর চৌধুরী? উত্তরটি হল মুর্শিদাবাদ ভেঙে পৃথক জেলা তৈরি। এই বিষয়ে ওই তিন জনেই মনে করেন, জেলা ভাগ হলে উন্নয়ন আরও ভাল হবে।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০১৫ ০১:০১
Share:

কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলে একই কথা বলবেন মান্নান হোসেন, মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য ও অধীর চৌধুরী?

Advertisement

উত্তরটি হল মুর্শিদাবাদ ভেঙে পৃথক জেলা তৈরি। এই বিষয়ে ওই তিন জনেই মনে করেন, জেলা ভাগ হলে উন্নয়ন আরও ভাল হবে। গত শুক্রবার উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালিতে এক সরকারি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে নতুন চারটি জেলা ঘোষণার পরে ফের জেলা ভাগের দাবিতে সরব হয়েছেন জঙ্গিপুর-ফরাক্কা-সহ মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ। দুয়ারে বিধানসভা নির্বাচন। আর সেই আবহে এই একটা দাবিতে অন্তত একমত জেলার সব দলের নেতারাও।

কিন্তু জেলা ভাগ করার ব্যাপারে এত হইচই কেন?

Advertisement

আর কত দূর

জেলা ভাগের কারণ হিসাবে যে বিষয়টি সবার আগে উঠে আসছে সেটি দূরত্ব। মুর্শিদাবাদের উত্তরে শেষ প্রান্ত হল ফরাক্কার বেওয়া ও বাহাদুরপুর পঞ্চায়েত। আর দক্ষিণের শেষ প্রান্ত ছুঁয়েছে রেজিনগর। দুই প্রান্তের ব্যবধান প্রায় দেড়শো কিলোমিটার। বেওয়া গ্রামের কথাই ধরা যাক। জেলা প্রশাসনের দফতর কিংবা আদালত-সহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ অফিসে প্রায়ই আসতে হয় বেওয়া, বাহাদুরপুর, কলাইডাঙা-সহ বিভিন্ন এলাকার লোকজনকে। প্রত্যন্ত ওই এলাকা থেকে জেলা সদর বহরমপুরের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। নানা ঝক্কি সামলে যাতায়াত করতে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। তারপরেও যদি আদালতে কাজ না হয়ে পরের তারিখ ধরিয়ে দেওয়া হয়, কিংবা প্রশাসনের ব্যস্ত কোনও কর্তা বলে বসেন, ‘কাল একবার সকাল সকাল চলে আসুন’, তাহলে গোটা দিনটাই পথে মারা যায়। বেওয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কংগ্রেসের মল্লিকা দাস বিবি বলছেন, ‘‘বাড়ি থেকে একশো মিটার দূরে ঝাড়খণ্ডের বাজার। আর জেলা প্রশাসনের দফতর ১৩০ কিলোমিটার দূরে। এরপরেও যদি জেলা ভাগ নিয়ে কারও কোনও সংশয়, প্রশ্ন, দ্বিধা থাকে তাহলে আমাদের কিছু বলার নেই।’’

হাওয়া উত্তরে

জেলার উত্তর প্রান্তের বাসিন্দাদের মতো স্থানীয় নেতারাও চাইছেন জেলা ভাগ হলে উত্তর- দক্ষিণেই হোক। সেক্ষেত্রে রঘুনাথগঞ্জ শহরকে সদর করে জেলা ভাগ হলে উত্তরের সব এলাকার মানুষেরই সুবিধা হবে বলে দাবি করছেন রাজনীতির কারবারিরাও। তাঁদের মত, দূরত্ব ও ভৌগোলিক কারণে সবথেকে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় জেলার উত্তরাংশের বাসিন্দাদের। এই দাবিও কিন্তু নতুন নয়। জেলার এক বিধায়ক জানাচ্ছেন, বাম আমলে বিভিন্ন জেলার বিভাজন নিয়ে রাজ্যে প্রথম বাম সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্রকে প্রধান করে প্রশাসনিক কমিটি গড়া হয়। সেই কমিটি মুর্শিদাবাদ-সহ বেশ কয়েকটি জেলা ভাঙার পক্ষে মত দেয়। তারপর ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ২০০৪ সালে রাষ্ট্রপতি তথা জঙ্গিপুরের প্রাক্তন সাংসদ প্রণব মুখোপাধ্যায়ও এই ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তারপরেও জলপাইগুড়ি ভাগের সময়েও সোচ্চার হয়েছিল এই এলাকা। অভিযোগ, বাম সরকার যেমন সেই দাবিকে উপেক্ষা করেছে। তেমনই একই পথে হাঁটছে বর্তমান সরকারও।

ব্রাত্য কেন

চোখের সামনে একটির পরে একটা নতুন জেলা হল। ১৯৮৬ সালে ভেঙেছে চব্বিশ পরগনা, ১৯৯২ সালে দিনাজপুর, ২০০২ সালে ভাগ হয় মেদিনীপুর। ২০১৪ সালে জলপাইগুড়ি ভেঙে তৈরি হয় আলিপুরদুয়ার (২০ তম জেলা)। গত ২৭ নভেম্বর সন্দেশখালিতে মুখ্যমন্ত্রী সুন্দরবন, আসানসোল, বসিরহাট ও ঝাড়গ্রাম আলাদা জেলা হবে বলেও ঘোষণা করেন। প্রশ্ন উঠছে, মুর্শিদাবাদই বারবার বাদ পড়ছে কেন? এলাকার বাসিন্দারা জানান, জেলা সদরের দূরত্ব-সহ যে যে সমস্যার কারণে অন্য জেলাগুলোকে ভেঙে আলাদা করা হয়েছে সেগুলির থেকে অনেক বেশি সমস্যা রয়েছে মুর্শিদাবাদে। অথচ এই জেলাই বারবার বাদ পড়ছে! রাজ্যের পরিষদীয় দলনেতা মহম্মদ সোহরাবের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে তাঁকে ও বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র-সহ সব দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন। সেখানে জলপাইগুড়ি ও মুর্শিদাবাদ জেলা ভাগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয়। তখনও এই জেলা উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ হবে বলেই কথা হয়েছিল। ফরাক্কার বিধায়ক কংগ্রেসের মইনুল হকও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একই দাবি জানিয়েছিলেন। জঙ্গিপুরের প্রাক্তন পুরপ্রধান তথা সিপিএমের জেলা সম্পাদক মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের দাবি, রাজনৈতিক কারণেই এই জেলাকে ভাগ করা হচ্ছে না।

দুয়ারে প্রশাসন

ফরাক্কার একটি প্রত্যন্ত এলাকায় রমরমিয়ে শুরু হয়েছিল বোইনি পোস্তচাষ। লোকমুখে খবর পেয়ে সেই চাষের কথা যখন জেলা প্রশাসনের কর্তাদের কানে পৌঁছয় তখন পোস্ত গাছ প্রায় কোমর সমান। সেই ফেব্রুয়ারিতে পোস্তগাছ নষ্ট করার সময়ে ওই গ্রামে পা পড়েছিল অতিরিক্ত জেলাশাসকের (ভূমি ও ভূমি সংস্কার)। সেই একবারই! তারপরে না বিডিও, না এসডিও কেউই আর ওই গ্রামে যাননি।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার এক বাসিন্দা বলছেন, ‘‘ভাগ্যিস কিছু লোকজন পোস্ত চাষ করেছিল। তাই গ্রামের লোকও বহু বছর পরে প্রশাসনের কোনও কর্তাকে গ্রামে দেখলেন। এলাকার মানুষের দাবি, জেলা ভাগ হলে জেলা সদরও হবে কাছেই। সেক্ষেত্রে রঘুনাথগঞ্জে জেলা সদর হলে সবদিক থেকেই সুবিধা হবে বলে মনে করছেন ওই এলাকার বাসিন্দারাও। সেক্ষেত্রে প্রশাসনও থাকবে বাড়ির কাছে। সুবিধা অসুবিধায় হাজির হবেন প্রশাসনের কর্তারা। মুর্শিদাবাদের মতো বড় জেলায় প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে, মানছে শাসক-বিরোধী দুই পক্ষই।

উন্নয়নের দিশা

এলাকার সিংহভাগ বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরে থাকায় জেলার দক্ষিণ প্রান্তে যে ভাবে উন্নয়নের কাজ হয়, ওই এলাকার লোকজন যে ভাবে প্রশাসনের কর্তাদের কাছে গিয়ে উন্নয়নের ব্যাপারে তদ্বির করতে পারেন, সেটা এই এলাকায় সম্ভব হয় না। আর সেই কারণে পৃথক জেলা হলে আরও ভাল উন্নয়ন হবে। জেলার এই প্রান্তে রয়েছে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও এমডিআই’য়ের মতো জাতীয় মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রয়েছে ফরাক্কা ব্যারাজ, এনটিপিসি ও পিডিসিএলের মতো বিদ্যুৎ কেন্দ্র, দু’টি সিমেন্ট ও শতাধিক বিড়ি কারখানা। কেন্দ্রের ‘আমরুট’ প্রকল্পে জঙ্গিপুরের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা। সেই কাজ শুরু হলেও শহরের ভোল অনেকটাই বদলে যাবে। জঙ্গিপুরের এক স্বাস্থ্য কর্তা জানাচ্ছেন, শহরে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। তৈরি হচ্ছে নার্সিং কলেজ। এগুলি পুরোদমে চালু হলে জেলা হাসপাতালের মতো কাজ করতে পারবে। জেলার উত্তরাংশের প্রধান শিল্প বিড়ি। বিড়ি মালিক সংগঠনের সম্পাদক রাজকুমার জৈনের দাবি, এই এলাকার প্রায় ৮০টি বিড়ি কারখানায় ১০ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু তাদের জন্য সে ভাবে কিছুই হয়নি। রঘুনাথগঞ্জকে কেন্দ্র করে পৃথক জেলা হলে সকলেই লাভবান হবেন।

তবে জেলা ভাগ নিয়ে উত্তরের দাবিকে মান্যতা দিলেও পৃথক জেলা হলে আদৌ কতটা সুফল মিলবে তা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন জেলার অনেকেই। বহরমপুরের সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, যে সময়ে রাজ্যে প্রশাসন বলেই কিছু নেই, সেখানে আদৌ কতটা কী সুফল মিলবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। জেলার আইনজীবী পীযূষ ঘোষ জানান, পৃথক জেলা হলে জেলা জজ আদালত থেকে জেলাশাসক, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা হাসপাতাল, কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার তৈরি করা কীভাবে সম্ভব? যেখানে রাজ্য সরকারের ভাঁড়ে মা ভবানী!

তবে এখনই এসব নেতিবাচক ভাবনা ভাবতে রাজি নয় জঙ্গিপুর, ফরাক্কা, রঘুনাথগঞ্জ। ওই এলাকার লোকজনের দাবি, একদিনেই তো আর সবকিছু তৈরি হয় না। সবটাই আস্তে আস্তে হবে। কিন্তু সবার আগে দরকার মুখ্যমন্ত্রীর সদিচ্ছা। জঙ্গিপুরের সাংসদ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের মত, জেলা ভাগ হলে তার পরিকাঠামো তৈরিতে খরচ বাড়ে এটা ঠিক। কিন্তু সার্বিক উন্নয়নের জন্য জেলা ছোট হলে দ্রুত কাজ করা যায়। উন্নত হয় নাগরিক পরিষেবাও। সাগরদিঘির তৃণমূল বিধায়ক সুব্রত সাহা বলছেন, ‘‘উন্নয়নের স্বার্থে জেলা বিভাজন জরুরি। সেই কারণেই মুখ্যমন্ত্রীর এমন পদক্ষেপ। মুর্শিদাবাদের বিষয়টিও তাঁর মাথায় রয়েছে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement