হাসপাতালে ঠাঁই নেই, মৃত্যু ছেলের

শহর কলকাতায় একের পর এক সরকারি হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসা মেলেনি। ক্যানসারে ধুঁকতে থাকা ছেলেকে কলকাতা থেকে ট্রেনে জলপাইগুড়ি ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বাবা। বাড়ি অবশ্য পৌঁছতে পারেননি। পথেই মারা যায় ছেলে।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:৫৬
Share:

গোকুল দাস

শহর কলকাতায় একের পর এক সরকারি হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসা মেলেনি। ক্যানসারে ধুঁকতে থাকা ছেলেকে কলকাতা থেকে ট্রেনে জলপাইগুড়ি ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বাবা। বাড়ি অবশ্য পৌঁছতে পারেননি। পথেই মারা যায় ছেলে। দেহ নিয়ে বাড়ি ফেরেন বাবা। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি মতো স্বাস্থ্য পরিষেবা আদৌ কতটা রোগীস্বার্থমুখী বা মানবিক হয়েছে সেই প্রশ্নই তুলে দিয়েছে এই ঘটনা।

Advertisement

জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের বারোপাটিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের মদন সিংহ পাড়ার গোকুল কয়েক মাস থেকে গলা ব্যথায় ভুগছিল। ব্যথা বেড়ে চলায় গত ৬ অক্টোবর তার বাবা পেশায় ভ্যানরিকশা চালক মইলেন দাস তাকে জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালের আউটডোরে নিয়ে যান। সেখানে তিন সপ্তাহ চিকিৎসার পরে গোকুলকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। গত ২৩ নভেম্বর রোগীকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে বায়োপসি পরীক্ষায় ক্যানসার ধরা পড়ায় ১ ডিসেম্বর কলকাতায় নীলরতন সরকার হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়।

আর্থিক সাহায্যের জন্য স্থানীয় তৃণমূল পঞ্চায়েত প্রধানের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি কিছু টাকা দেন। সাংসদ তহবিল থেকেও সাহায্যের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। আত্মীয়রা এগিয়ে আসে। গত ৩০ নভেম্বর ছেলেকে নিয়ে কলকাতায় রওনা দেন। সঙ্গে নেন ছোট ভাই জয়দেবকে।

Advertisement

মইলেনবাবু বলেন, “১ ডিসেম্বর কলকাতায় নেমে সোজা নীলরতন সরকার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাই। লম্বা লাইন। ছেলে হাঁফাচ্ছে। অনেককে বলেও তাড়াতাড়ি দেখানোর ব্যবস্থা করাতে পারিনি। অবশেষে যখন সামনে গেলাম বলা হল ৬ নম্বর ঘরে যেতে। সেখানে যেতে চিকিৎসক জানালেন আজ কিছু হবে না বৃহস্পতিবার যেতে হবে।”

ওই পরিস্থিতি দেখে রাতেই তাঁরা আরজিকর হাসপাতালে চলে যান। অভিযোগ, সেখানে চিকিৎসক ক্যানসার বিভাগে যোগাযোগের কথা বলে ছেড়ে দেন। গোকুলের কাকা জয়দেব দাস বলেন, “কোথায় ক্যানসার বিভাগ খুঁজে না পেয়ে হোটেলে ফিরে যাই। ২ ডিসেম্বর যাই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক জানান, পরের দিন আসতে হবে।”

Advertisement

৩ ডিসেম্বর গোকুলকে নিয়ে তাঁরা ফের মেডিক্যাল কলেজে যান। বাবা মইলেনবাবু বলেন, “চিকিৎসক সব দেখে বলেন ছ’ মাস চিকিৎসা করালে ছেলে সুস্থ হবে। এ জন্য প্রায় ৭ লক্ষ টাকা খরচ করতে হবে। চিকিৎসা শুরু করতে এখনই ২ লক্ষ টাকা জোগাড় করতে হবে। শুনে আমার মাথা ঘুরতে শুরু করে। এর পরে ছেলেকে নিয়ে স্টেশনের দিকে চলে যাই।”

৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭ টা নাগাদ গোকুলকে নিয়ে তার বাবা ও কাকা উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে বসেন। বাবা জানান, ট্রেন ছাড়তে ছেলের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ট্রেন বর্ধমান স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছলে সে মারা যায়। এর পরে সেখান থেকে দেহ ময়না তদন্তের জন্য বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

গোকুলের গ্রামে এখন একই প্রশ্ন ফিরেছে— গ্রামের গরিব মানুষের কি সরকারি হাসপাতালে কোন চিকিৎসা মিলবে না? স্থানীয় তৃণমূল সাংসদ বিজয়চন্দ্র বর্মনের দাবি, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য টাকা চাওয়া হয়েছে এটা ওঁরা জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যেত। টাকার অভাবে চিকিৎসা হবে না এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

কেন কলকাতার একাধিক মেডিক্যাল কলেজে গোকুলকে ভর্তি করা গেল না? কেন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠল? নীলরতন মেডিক্যালের অধ্যক্ষ দেবাশিস ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘এই রকম কোনও অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। আসলে নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখা হত।’’

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অঙ্কোলজির বিভাগীয় প্রধান শিবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘টাকা কেউ চাইতেই পারে না। অভিযোগ ভিত্তিহীন।’’ রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় এ ব্যাপারে কোনও ম ন্তব্য করতে চাননি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement