Iran-Israel Situation

আমাদের বাড়িতেই এসে পড়েছিল ড্রোন

জন্মসূত্রে রানাঘাটের হলেও গত কয়েক মাস ধরে কর্মসূত্রে বাহরিনের রাজধানী শহর মানামায় বসবাসকারী এক বাঙালি দম্পতি আমরা। নতুন দেশে নিজেদের সংসার পুরোপুরি গোছানোর আগেই এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হল আমাদের।

পৃথ্বীশ দাশগুপ্ত, মানামা (বাহরিন)

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৭:২৫
Share:

—ফাইল চিত্র।

জীবন মানেই প্রতিনিয়ত লড়াই। কিন্তু দেশ থেকে অনেক দূরে, পারস্য উপসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র বাহরিনে আমাদের যে এ রকম এক লড়াইয়ের সামনাসামনি পড়তে হবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি।

জন্মসূত্রে রানাঘাটের হলেও গত কয়েক মাস ধরে কর্মসূত্রে বাহরিনের রাজধানী শহর মানামায় বসবাসকারী এক বাঙালি দম্পতি আমরা। নতুন দেশে নিজেদের সংসার পুরোপুরি গোছানোর আগেই এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হল আমাদের। সেটা ছিল একটা ছুটির দিন— শনিবার, ২৮শে ফেব্রুয়ারি। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের শব্দে আমাদের বহুতলটি কেঁপে উঠল। ১৫-২০ মিনিট পরে ফের বিকট আওয়াজ, জানলা-দরজা ঝনঝন করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে নীচে নেমে আসি। শুনলাম, কিছুটা দূরেই আমেরিকার সেনাঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হানা চালিয়েছে ইরান।

জানা গেল, মানামার জুফেয়ার অঞ্চলেই মূলত আক্রমণ চালানো হচ্ছে। তাই ওই এলাকা ছাড়াটা তখন জরুরি হয়ে পড়ে। দেখছিলাম, আমাদের বহুতল-সহ আশপাশের সব বাড়ি থেকে মানুষ দ্রুত অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। নতুন দেশ, চেনা মানুষ বিশেষ নেই। এ সব দেখে আমরাও বেশ ভয় পেয়ে যাই। দরকারি কাগজপত্র, পাসপোর্ট এবং কিছুটা নগদ অর্থ নিয়ে আমরা বাড়ি ছেড়ে আমার অফিসে আশ্রয় নিই। ভেবেছিলাম, রাতে পরিস্থিতি শান্ত হলে ফিরে আসব।

কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতেই থাকে। বাইরে ক্রমাগত বিস্ফোরণের শব্দ, সাইরেন, মোবাইলে ক্রমাগত ‘ইমার্জেন্সি অ্যালার্ট’ আসছে— এই পরিস্থিতিতে সে দিন রাতে আমরা আর অফিস ছেড়ে বেরোনোর সাহস পাইনি। পরের দিন ভোরবেলা, মানে ১ মার্চ, পরিবেশ একটু শান্ত মনে হলে বাড়ি ফিরে দেখি রাতে ড্রোন হামলা হয়েছে আমাদের বাড়িতেই! চারদিকে ভাঙাচোরা সিমেন্টের চাঙড় পড়ে, কয়েকটা গাড়ি একদম গুঁড়িয়ে গিয়েছে। বাড়ি পুরো খালি করে দিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ড্রোন হামলা হয়েছিল একদম উপরের তলায়, অর্থাৎ, ৩১ তলায়। আমরা থাকতাম ২৫ তলায়।

ফ্ল্যাটে ফেরার রাস্তা বন্ধ, লিফ্‌ট বন্ধ, চারদিকে ভাঙাচোরা, এই সব দেখে আমাদের ভয় আরও বাড়ে। বাড়ি বন্ধ, বিমানবন্দর বন্ধ, অর্থাৎ দেশে ফিরে যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ। এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক রাতের মধ্যে সব কিছু অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।

তবু, ভেঙে পড়লে তো চলবে না। স্থানীয় এক দম্পতি আমাদের গাড়ি করে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিলেন। বুঝলাম কয়েক দিন জুফেয়ার এলাকা থেকে দূরেই থাকতে হবে। শহরের অন্য এক এলাকায় গিয়ে একটা হোটেলে আশ্রয় নিই, সঙ্গে শুকনো খাবার-জল যতটা পারি নিয়ে রাখি।

বাহরিন সরকার ও প্রশাসন বাসিন্দাদের নিরন্তর সাহায্য করে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন থেকে আক্রান্ত এলাকা থেকে মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায়, সরকারি স্কুল বা শিবিরে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে খাবার ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দেওয়া, প্রশাসনের তরফ থেকে সব কিছুই করা হচ্ছে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমার অফিসও। আমার ও আমার স্ত্রীকে এক সপ্তাহের জন্য থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল অফিসের তরফ থেকেই।

নিয়মিত ভারতীয় দূতাবাস ও বাহরিন সরকারের প্রতিটি অ্যালার্ট ও ঘোষণা ফলো করছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আপাতত আগের বাড়িতে ফেরা সম্ভব নয়। তাই নতুন ঘর খোঁজা শুরু করি। পুরনো বাড়িতে গিয়ে শুধু নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসি। লিফ্‌ট বন্ধ থাকায় সিঁড়ি দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে ২৫ তলা উঠি, যতটা সম্ভব দরকারি জিনিস ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে আবার সিঁড়ি দিয়েই নেমে আসি। এখন আমরা নতুন একটা বাড়িতে থাকছি, নিরাপদেই রয়েছি। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরছি। তবে চারপাশের পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, জানি না।

পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের থেকে অসংখ্য ফোন ও মেসেজ আসছে। আমি ও আমার স্ত্রী শাশ্বতী বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে একটি পেজের মাধ্যমে আমাদের পরিস্থিতি ও জীবনের লড়াইয়ের মুহূর্তগুলি শেয়ার করছি। উদ্দেশ্য, চেনা ও অচেনা সবাইকে বার্তা দেওয়া— হাল ছেড়ো না। কারণ জীবনটাই সব থেকে দামি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন