রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। —ফাইল চিত্র।
ডুইসবুর্গের ইস্পাত-স্মৃতিবাহী অন্ধকার শিল্পপ্রাঙ্গণে, যেখানে একদা আগুন ও ধাতুর গর্জনে ইউরোপের আধুনিকতার শরীর গঠিত হয়েছিল, সেই ল্যান্ডশাফ্টস্পার্ক ডুইসবুর্গ-নর্ড-এর গেবলেজেহালেতে গত বুধবার সন্ধ্যায় যেন অন্য এক ধাতু গলল— শব্দের, স্মৃতির এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের।
জার্মান ভূখণ্ডের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কও ছিল গভীর বৌদ্ধিক ও আত্মিক আদানপ্রদানের রসায়ন। বিশ শতকের গোড়াতেই জার্মানিতে তাঁর কবিতার অনুবাদ বিপুল সাড়া ফেলেছিল; হেরমান হেসে, কাউন্ট হেরমান কাইজ়ারলিং বা টমাস মানের মতো ইউরোপীয় মনীষীরাও তাঁর ভাবজগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে তাঁর জার্মানি-ভ্রমণ, বক্তৃতা ও সংবর্ধনাগুলি ছিল এক অর্থে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের আত্মিক পুনর্গঠনের সন্ধানে প্রাচ্যেরএক কবিস্বরের আবির্ভাব। ডুইসবুর্গে‘টেগোর সং নাইট’ নামের এই বিশেষ সঙ্গীতসন্ধ্যা তাই নিছক একটি অনুষ্ঠান হয়ে ওঠেনি, বরং ছিল সেই শতবর্ষপ্রাচীন সাংস্কৃতিক সংলাপেরই এক নতুন প্রতিধ্বনি, যেখানে রবীন্দ্রনাথের ইউরোপযাত্রা ফিরে এল সুরের এক বহুস্বরিক স্থাপত্য হয়ে।
ডুইসবুর্গ ফিলহারমনির সুনিষ্ঠ আয়োজনে ও প্রযোজনায় আইগেনৎসাইট ফেস্টিভাল ২০২৬-এর রূপকার কমলিনী মুখোপাধ্যায়। এই আয়োজন ছিল এক অর্থে “গেজাম্টকুন্স্টভের্ক”—জার্মান নন্দনতত্ত্বের সেই বহুচর্চিত ধারণা, যেখানে সঙ্গীত, কবিতা, নাট্য ও অনুভব মিলেমিশে হয়ে ওঠে এক সমগ্র শিল্পরূপ। রবীন্দ্রনাথের গানকে ঘিরে এই কাঠামো কোনও আরোপিত ধারণা হিসেবে নয়, বরং একটি কার্যকর মঞ্চভাষা হিসেবে উপস্থিত হয়।
সন্ধ্যার সূচনায় পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত জার্মান সঙ্গীততত্ত্ববিদ ও রবীন্দ্রগবেষক লার্স-ক্রিশ্চিয়ান কখ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত ও কাব্যভুবন নিয়ে এক প্রাঞ্জল বক্তৃতা দেন, যা ইউরোপীয় শ্রোতাদের জন্য অনুষ্ঠানের প্রেক্ষিত নির্মাণ করে দেয়। এই সন্ধ্যার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ভারতীয় ও অভারতীয় শিল্পীদের বিস্তৃত সমাবেশ। সন্ধ্যার অন্তরঙ্গ পর্বে সরোদ, বাঁশি ও কণ্ঠ মিলিয়ে ‘আমার প্রাণের পরে’ এবং ‘সমুখে শান্তি পারাবার’ পরিবেশিত হয়। আয়োজকদের ভাষায়, এই দু’টি গান রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির দুই ভিন্ন প্রান্তকে স্পর্শ করে— যেখানে একটি তরুণ বিচ্ছেদ-বেদনা, অন্যটি প্রায় অন্তিম দর্শনের সুরভাষা বহন করে আনে। এ ছাড়া, ‘বহে নিরন্তর’, ‘জাগে নাথ জোছনারাতে’, ‘আমি মারের সাগর’, ‘বিরস দিন’, ‘সুখহীন নিশিদিন’— প্রতিটি গান যেন পৃথক সুরভাষা, পৃথক ভাবজগৎ বহন করেছে। কোথাও নিবেদন, আবার কোথাও অন্তিম মানবিক নিঃসঙ্গতা। অনুষ্ঠানের শেষে জার্মানির নুরেমবর্গে শতবর্ষ পূর্বে রচিত রবীন্দ্রগান ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ পরিবেশিত হয়ে সমগ্র সন্ধ্যার সমাপ্তি ঘটে, যা এক ধরনের আধ্যাত্মিক উপসংহার হিসেবে চিহ্নিত হয়।
অনুষ্ঠান-পরবর্তী আলোচনায় ডুইসবুর্গ ফিলহারমনির এক সদস্য নিকোলাই মন্তব্য করেন, মঞ্চে শিল্পীদের পারস্পরিক আবেগ, গতিশীলতা ও নিবেদন তাঁর কাছে এক ‘ভিন্ন ধরনের শিল্পচর্চা’র অনুভূতি এনে দিয়েছে। তাঁর কথায়, শিল্পীদের প্রত্যেকের সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিজগতের এক আন্তরিক ও ব্যক্তিগত সংযোগ ছিল— যেন প্রত্যেকেই নিজেদের স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা ও ব্যাখ্যা নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং পরিবেশনার মধ্য দিয়েই সেই ব্যক্তিগত গল্পগুলি প্রকাশ পেয়েছে।
আগামী ২২ মে ‘ডে অ্যান্ড নাইট’ শীর্ষক পরবর্তী সঙ্গীতসন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ডুইসবুর্গ ফিলহারমনির বর্তমান আবাসিক শিল্পী ইজ়রায়েলি ম্যান্ডোলিন বাদক আভি আভিতাল, সরোদ ও স্ট্রিং কোয়ার্টেটের সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের নতুন বিন্যাস উপস্থাপিত হবে। এ ছাড়া, চারটি রবীন্দ্রগানের বিশেষ সুরযোজনায় নিযুক্ত করা হয়েছে গ্রিক সঙ্গীত নির্দেশক কনস্তানৎসিয়া গুর্ৎসি, গ্র্যামি-বিজয়ী আমেরিকান সঙ্গীত নির্দেশক ও চেলো-শিল্পী ব্যারি ফিলিপস এবং ইরানী সঙ্গীত নির্দেশক মহান মিরারাবরকে— যা একটি জার্মান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছে।
এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ডুইসবুর্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে এক ক্রমবর্ধমান সুরসংলাপের পরিসর— একশো বছর পরেও রবীন্দ্রনাথের ইউরোপযাত্রা শেষ হয়নি। তাঁর গান এখনও পথ চলেছে, নতুন ভাষা, নতুন মঞ্চ, নতুন মানুষের উদ্দেশ্যে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে