রমনার বটমূলে ছায়ানট আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। মঙ্গলবার। ছবি: তানজীর আহমেদ।
কারা যেন বার বার পোড়াতে চেয়েছে সুরের যন্ত্র। তবু আবার জয় হল সুরের আগুনেরই। আজ ঢাকায় মেঘ-বোলানো আকাশে তখনও আগুন-লাল আভা। ভোর সওয়া ৬টা। রমনার বটমূলে প্রায় দু’শো শিল্পী একসুরে গাইছেন ‘জাগো আলোক-লগনে’। অজয় ভট্টাচার্যের লেখা, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সুর করা এই গানেই আজ সূচনা হল ‘ছায়ানট’ আয়োজিত বাংলাদেশের পয়লা বৈশাখের প্রভাতী অনুষ্ঠানের।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পরে গত বছরের ১৮ই ডিসেম্বর গভীর রাতে একদল দুষ্কৃতী ঢাকার ধানমণ্ডিতে ছায়ানট ভবন তছনছ করে আগুন লাগিয়েছিল। নির্বিচারে ভাঙা হয়েছিল হারমোনিয়াম-তবলা। কিন্তু পরের দিনই রাস্তায় টেবিল পেতে গান গেয়েছিলেন সংস্থার শিল্পীরা। বরাবরের পয়লা বৈশাখের রেওয়াজে আজও তাঁরা একটানা গেয়ে গেলেন। কখনও রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘এ কী সুগন্ধহিল্লোল বহিল’, ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো’, ‘বাজাও আমারে বাজাও’। কখনও কাজী নজরুল ইসলামের ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী’, ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘আজি গাও মহাগীত’, লালন সাঁইয়ের ‘বড় সঙ্কটে পড়িয়া দয়াল’। কখনও আবার জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের ‘এসো মুক্ত করো’, সলিল চৌধুরীর ‘সে দিন আর কত দূরে’। ৮টিসমবেত ও ১৪টি একক সঙ্গীত, দু’টি পাঠে গাঁথা হয়েছিল অনুষ্ঠান। ছিল সলিলের কবিতা ‘এক গুচ্ছ চাবি’ও। এক সময়ে বটমূল প্রাঙ্গণ পূর্ণ করে রমনা পার্কের অন্যত্রও বয়েযেতে থাকে ভিড়। মহিলাদের অধিকাংশেরই পরনে লাল-সাদাশাড়ি। ছেলেদের পাজামা-পাঞ্জাবিতেও লাল-সাদারই ছোঁয়া। ছোটদেরকারও কারও গালে আলপনায় লেখা ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩’। ছিলেন বিদেশিরাও। কখন পেরিয়ে যায় দু’টো ঘণ্টা। সব শেষে জাতীয় সঙ্গীত। গোটা এলাকায় কড়া পাহারা ছিলনিরাপত্তা বাহিনীর।
‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’, এ-ই ছিল ছায়ানটের এ বারের আয়োজনের মূল ভাবনা। অনুষ্ঠানের শেষ লগ্নে ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলীর বক্তৃতায় উঠে এল ২০০১ সালের বিস্ফোরণ থেকে গত বছরের হামলার স্মৃতি। বললেন, ‘‘যে সঙ্গীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা-মিলন-বিরহ-সঙ্কটের সঙ্গী, মুক্তিযুদ্ধ থেকে সকল অধিকার অর্জনের অবলম্বন, সকল ধর্ম-জাতির মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে, কোনও অপশক্তি ভয় দেখিয়ে সেই সঙ্গীত থেকে শান্তিপ্রিয় মানুষকে নিরস্ত করতে চায়।’’
বাংলাদেশের পুলিশেরই একটি পরিসংখ্যান বলছে, সে দেশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিসরে গত ১৫ মাসে হামলা বা বাধাদানের ১৩৫টি ঘটনা ঘটেছে। শুধু এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্তই এমন ঘটনার সংখ্যা ১৬। এই হামলা-সংস্কৃতিতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বহু প্রাচীন উৎসব। গত ২২ মার্চ রাতে সিলেটের বিশ্বনাথের ইব্রাহিম শাহের মাজারের পাশে বাউলগানের আসরে শ’খানেক লোক এসে ভাঙচুর চালিয়েছে।
গত ডিসেম্বরে ছায়ানট ভবন, ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেলি স্টার’ সংবাদপত্রের দফতরে হামলার পরের দিনই হামলা হয়েছিল ঢাকার তোপখানা রোডে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। চাঁদা তুলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে উদীচীও। তবে আজ সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য জাদুঘর প্রাঙ্গণে উদীচীকে অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এই শিল্পীগোষ্ঠীর অভিযোগ, প্রশাসনের তরফে তাদের কাছে গানের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। তারা তালিকা দিতে রাজি হয়নি। রিভার ভিউয়ের বটতলায় বিকল্প অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছিল উদীচী। তারও অনুমতি দেওয়া হয়নি। শেষে হুসেন বখত চত্বরে প্রতিবাদ সভা ও সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকরা হয়েছে।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, পরপর দু’বছর নতুন নাম পাওয়া ঢাকার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’টিতে আজ অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে ছিল দোতারা। বাউলশিল্পীদের অবমূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে সঙ্গীতের মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতীকে। দোতারা ছাড়াও ছিল মোরগ, হাতি, ঘোড়া ও পায়রার মডেল। কোনওটি নতুন সূচনার প্রতীক, কোনওটি শক্তি ও আভিজাত্যের, কোনওটি সরল জীবন ও শৈশবের, কোনওটি শান্তির। গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের বার্তা দিয়ে সকাল ৯টা ৬ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে ১০টা ৫ মিনিটে আবার সেখানেই শেষ হয় কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা বৈশাখী শোভাযাত্রা। নেতৃত্ব দেন উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরী। পড়ুয়াদের হাতে হাতে উড়ছিল জাতীয় পতাকা।
শোভাযাত্রা থেকে রমনার বটমূল, বাঙালির নিজস্ব শিকড়ের কথা বলছিলেন অনেকেই। বলছিলেন ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলীও। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই তিনি বার্তা দিলেন, ‘‘যেন সংবাদকর্মীরা নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারে, সকলে যেন নির্ভয়ে গাইতে পারে, যেন মানুষের শুভবোধ এবং সংস্কৃতির সকলপ্রকাশ নির্বিঘ্ন হয়।’’
এই আশাটুকু আঁকড়েই নতুন বছর শুরু বাংলাদেশের।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে