(বাঁ দিকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
আলোচনাই কি সার? সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনেভায় পরমাণু চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পরে ইরানের তরফে ইতিবাচক ইঙ্গিত এলেও আমেরিকার মুখে উল্টো সুর। মঙ্গলবারের বৈঠকের পর আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভি ভান্স জানান, তাঁদের মূল দাবিগুলি মানতে ব্যর্থ ইরান। অর্থাৎ, তেহরান এখনই আমেরিকার শর্তে রাজি নয়। তবে ওয়াশিংটনের তরফে জানানো হয়েছে, তারা তেহরানকে আরও দু’সপ্তাহ সময় দিতে রাজি।
জেনেভার বৈঠকের দিকে নজর ছিল বিশ্বের কূটনৈতিক মহলের। আমেরিকা-ইরান পরমাণু চুক্তির পথে কতটা অগ্রসর হয়, সে দিকে তাকিয়ে ছিলেন অনেকেই। তবে বৈঠক নিয়ে ভান্স জানান, পরমাণু চুক্তি নিয়ে এখনও কোনও অগ্রগতি হয়নি। একই সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট করে দেন, সামরিক পদক্ষেপ করা নিয়ে যে চিন্তাভাবনা চলছে আমেরিকার অন্দরে, সেই বিকল্প পরিকল্পনা থেকে এখনই সরে আসছেন না তাঁরা।
তবে সত্যিই কি জেনেভার বৈঠকে কোনও ইতিবাচক আলোচনা হয়নি? ভান্সের কথায়, ‘‘আমি বলব এটা ভাল যে তারা (ইরান) বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট (ডোনাল্ড ট্রাম্প) কিছু বিষয় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, যা ইরানিরা প্রকৃতপক্ষে স্বীকার করতে বা তা নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক নন।’’
জেনেভায় বৈঠক শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই হরমুজ প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে শক্তি জানান দিয়েছিল ইরান। আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের দেশের সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ় এজেন্সি’ (ইরনা) জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক ভাবে ছোড়া হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র। ঘটনাচক্রে, হরমুজ প্রণালীর অদূরেই মোতায়েন রয়েছে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন-সহ একাধিক রণতরী। শুধু তা-ই নয়, বৈঠকের আগে আমেরিকার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছিলেন খামেনেই। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন, আমেরিকার হামলার প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত ইরান।
গত সপ্তাহে পশ্চিম এশিয়ার দেশ ওমানে পরমাণু চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন-তেহরান বৈঠক হয়। সেই বৈঠক থেকে কোনও ইতিবাচক ইঙ্গিত মেলেনি। তার পরে মঙ্গলবার আবার দুই দেশের প্রতিনিধিরা জেনেভায় বৈঠকে বসেছিলেন। তবে সেই বৈঠক যে খুব একটা ফলপ্রসূ হয়েছে, তা মনে করছেন না কেউই। যদিও বৈঠকের পরে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘‘আমেরিকার সঙ্গে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে ভবিষ্যতের আলোচনার দিশানির্দেশ সংক্রান্ত একটি সাধারণ সমঝোতা হয়েছে।’’ কী সেই সমঝোতা, তা স্পষ্ট করেনি কোনও পক্ষই। আরাঘচি আরও জানান, পরের বৈঠকের দিন নির্ধারণের আগে ইরান এবং আমেরিকা চুক্তির কাঠামো তৈরির নিজের মত বিনিময় করতে রাজি হয়েছে। তার পরেই ইরানের বিদেশমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, ‘‘এর অর্থ এই নয় যে আমরা দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছে যাব। তবে অন্তত একটা পথ খুলেছে।’’
দিন দুয়েক আগে ইরানের উপবিদেশমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, তাঁরা আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি নিয়ে সমঝোতা করতে রাজি, কিন্তু একটি শর্তে। তাঁর মতে, আমেরিকা যদি ইরানের উপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়, তবে এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তা চলতে পারে। যদিও আমেরিকা যে নিষেধাজ্ঞা তোলার ব্যাপারে নরম হবে না, তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং ট্রাম্পই। মঙ্গলবারের বৈঠকের আগে ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘তেহরান কোনও চুক্তিতে পৌঁছোতে ব্যর্থ হলে পরিণাম ভয়াবহ হবে।’’ সেই হুঁশিয়ারি ভাল ভাবে নেয়নি ইরান প্রশাসন। খামেনেইও একই সুরে আমেরিকার বিরুদ্ধে হুঙ্কার দেন। এক দিকে, আলোচনা, অন্য দিকে, সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি— দুই মিলে তপ্ত ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জমানায় ইরানের সঙ্গে তিন বছরের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি করেছিল ছয় শক্তিধর রাষ্ট্র— ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি, চিন এবং আমেরিকা। অথচ ২০১৮-য় সেই চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর থেকে পরমাণু চুক্তি নিয়ে নতুন করে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি শুরু করেন তিনি। এ-ও বার বার বলেছেন, ‘‘ইরানকে কখনও পারমাণু অস্ত্র নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।’’ যে কোনও মূল্যে তা আটকাতে প্রস্তুত আমেরিকা। তবে ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তারা কোনও পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে না। অনেকের মতে, বৈঠকে ইরানকে পারমাণিবক কর্মসূচি বন্ধের যে দাবি জানানো হয় আমেরিকার তরফে, সেই শর্তে রাজি নয় তেহরান।