(বাঁদিক থেকে) কেপি শর্মা ওলি, গগন থাপা, পুষ্পকমল দহাল, বলেন্দ্র শাহ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বাংলাদেশের পরে এ বার নেপাল। ঘটনাচক্রে, গণবিক্ষোভে সরকার পতনের পর ভারতের আর এক পড়শি দেশ গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করতে চলেছে সেই বৃহস্পতিবারেই।
২০২৪ সালের ৫ অগস্ট আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের ১৮ মাস পরে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন (এবং জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট) হয়েছিল। সে দিন ছিল বৃহস্পতিবার। জেন জ়ির আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভের জেরে গত ৯ সেপ্টেম্বের নেপালে পতন হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির সরকারের। বৃহস্পতিবার (৫ অগস্ট) নতুন করে সাধারণ নির্বাচন হতে চলেছে হিমালয় ঘেরা পাহাড়ি দেশে।
মিল রয়েছে আরও একটি বিষয়ে— বাংলাদেশের মতোই জোড়া ব্যালটে ভোট দেবেন নেপালবাসী। নেপাল পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস’-এর ২৭৫ আসনের সদস্যদের বাছতে বৃহস্পতিবার জোড়া ব্যালটে ভোট দেবে নেপাল। এর মধ্যে ১৬৫টিতে প্রত্যক্ষ এবং ১১০টিতে পরোক্ষ নির্বাচন হবে। ভোটগ্রহণ পর্ব চলবে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। মোট ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৯০ লক্ষেরও বেশি। প্রার্থীর সংখ্যা ৬৫৪১। তাঁদের মধ্যে ৪০ বছরের কমবয়সি প্রার্থী হাজারেরও বেশি! বুথের সংখ্যা ২৩ হাজার।
কেন জোড়া ব্যালটে ভোট
২০১৫ সালের নতুন সংবিধান অনুযায়ী নেপালে একটি মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথম পদ্ধতিটি প্রত্যক্ষ নির্বাচন। একে বলা হয় ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ (এফপিটিপি), যেখানে যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান— তিনিই আসনটিতে জয়ী হন। দ্বিতীয়টি হল পরোক্ষ নির্বাচন অর্থাৎ, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (পিআর)। এতে একটি রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত হিসাব করে সংশ্লিষ্ট দলের মনোনীত প্রার্থীদের ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস’-এর সদস্যপদ দেওয়া হয়।
মোট ১৬৫টি আসন এফপিটিপি পদ্ধতিতে এবং বাকি ১১০টি আসন পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবে। এফপিটিপি-র জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ৩৪০৬ জন প্রার্থী। পিআর-এর জন্য ৩১৩৫ জন। নেপালের সংবিধান প্রণেতাদের ব্যাখ্যা ছিল— দু’টি পদ্ধতি রাখার উদ্দেশ্য হল, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং সমাজে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখা। এ ব্যবস্থায় কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে একক ভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হয়। বাড়ে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ফিরে দেখা ইতিহাস
সরকার পতনের তিন দিন পরে, ১২ সেপ্টেম্বর সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছিলেন। ওই সময়েই নেপালের প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল, আগামী ৫ মার্চ নির্বাচন হবে। ১৬ নভেম্বর নেপাল নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক ভাবে ভোটের দিন ঘোষণা করেছিল।
নভেম্বরের গোড়া থেকেই ভোটের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে নেপালের সব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে প্রস্তুতি বৈঠক সেরেছেন কার্কী। আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির মতামত জানতে চেয়েছে কমিশন। তার ভিত্তিতে গত ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়ন জমা নেওয়া হয়েছিল। ওই দিনই রাতে প্রার্থীদের নামের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে দিয়েছিল কমিশন। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ছিল ২৩ জানুয়ারি। ওই দিনই বিকেলে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল।
নির্বাচনের প্রধান মুখ
নেপালের জেন জ়ির বড় অংশের পছন্দ প্রাক্তন গায়ক তথা রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বলেন্দ্র শাহ। গত সেপ্টেম্বরে জেন জ়ির আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। এ বার ঝাপা-৫ আসনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী তথা কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল)-এর প্রধান কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে লড়ছেন বলেন্দ্র। তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে ছিল। সাধারণ নির্বাচনের আগেই সে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসের অন্দরে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে প্রবীণ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবাকে সভাপতি পদ থেকে সরিয়েছিলেন ৪৯ বছরের গগন থাপা। তিনিও এ বার প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ের অন্যতম মুখ। লড়াইয়ে রয়েছেন প্রাক্তন মাওবাদী গেরিলা নেতা তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহাল ওরফে প্রচণ্ডও। নেপালি কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান পূর্ব রুকুম আসন থেকে ভোটে লড়ছেন। জেন জ়ির আন্দোলনে ওলি সরকারের পতনের পর দফায় দফায় রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের দাবিতে নেপালে আন্দোলন করেছে রাজেন্দ্র লিংডেনের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি। এ বার তাঁর দিকেও নজর রয়েছে ভোট-পণ্ডিতদের।